গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপপ্রবাহের এক দিন পশ্চিম তীরের একটি পুলে সাঁতার কাটছিল ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। স্থানীয়ভাবে বলা হচ্ছে, ফিলিস্তিনিদের ফসলি জমিতে সেচ দেওয়ার পানি অন্যদিকে ঘুরিয়ে এই পুল তৈরি করা হয়েছে; আর অধিকৃত অঞ্চলজুড়ে পানিসম্পদ দখলের ধারায় এটি একটি নমুনামাত্র।

উর্বর জর্দান উপত্যকার নিকটবর্তী ফাসায়েল গ্রামের ফিলিস্তিনিদের জীবনে পানির ফোয়ারা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। খাবার, কর্মসংস্থান ও বাসাবাড়িতে মেটানো অনিয়মিত ইসরায়েলি পানি সরবরাহের ঘাটতি সামাল দিতে বহু প্রজন্ম ধরে তারা ওই পানির ওপর নির্ভর করে আসছে।

স্থানীয় কৃষক সাদ নেমার বলেন, ‘আমাদের পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে আমরা ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং কৃষিজমির জন্য প্রয়োজনীয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’

নেমারের অভিযোগ, গত জুনে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা তাঁর সেচের পাইপলাইন দখল করে নিয়ে ওই পানি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের প্রাচীন পুলে প্রবাহিত করতে শুরু করে। এরপর বসতি স্থাপনকারীরা এটিকে ইসরায়েলি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রচার করে এবং ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী এতে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। নেমার জানান, ‘তারা এখন পুলটির চারপাশে একটি বিনোদন পার্ক তৈরির কাজ করছে।’

ফাসায়েলের ফোয়ারা দখলের ঘটনাটি দীর্ঘমেয়াদি এক প্রক্রিয়ার অংশ বলে ফিলিস্তিনিদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ফিলিস্তিনি অঞ্চলের অন্তত ১৬০টি পানি ও পয়োনিষ্কাশন কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা।

নেমারের গ্রিনহাউস ও খেতগুলো সাধারণত বেগুন, স্কোয়াশ এবং তরমুজে ভরা থাকত। তবে পানির অভাবে এই শুষ্ক ও রোদে পোড়া জমিতে তিনি কোনো ফসল ফলাতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘বসতি স্থাপনকারীরা আমাদের পানি বন্ধ করে দেওয়ায় আমরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছি। এর অর্থ হলো, অনেক পরিবার তাদের কাজ ও জীবিকা হারাবে।’

নেমার আরও বলেন, দুই বছর আগে ফোয়ারার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করায় বসতি স্থাপনকারীরা তাঁর এক কর্মচারীকে মারধর করেছিল এবং তিনি নিজেও হুমকির মুখে পড়েছিলেন।

আগস্টের এক বিকেলে ফাসায়েলের কাছের ওই পুলে সাঁতার কাটতে আসা ২১ বছর বয়সী অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ইয়েশাই শ্রাইবার বলেন, ফিলিস্তিনিরা এখন আর এখানে আসার সাহস পাবে না। তিনি বলেন, ‘এখন তারা যখন দেখছে ইহুদিদের বড় বড় দল এখানে গোসল করতে আসছে। এখন তারা এখানে আসতে ভয় পাচ্ছে।’ উগ্র ইহুদি শ্রাইবার আরও বলেন, পশ্চিম তীর ইহুদিদের নিজস্ব ভূখণ্ড এবং ফিলিস্তিনিরা যদি ইহুদিদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে না চায়, তবে তাদের চলে যাওয়া উচিত।

নেমার দাবি করছেন, ২০২৫ সালের একটি জমির মালিকানা–সংক্রান্ত দলিল রয়েছে, যা অধিকৃত অঞ্চলে বেসামরিক নীতি বাস্তবায়নকারী ইসরায়েলি সামরিক সংস্থা ‘কোগ্যাট’–এর জারি করা। তিনি এ ছাড়া ১৯৫৭ সালের একটি মানচিত্রও দেখান, যেখানে দেখা যায়, তাঁর জমিতে ফোয়ারা এবং পুল উভয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য করার অনুরোধে কোগ্যাট এবং অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ সাড়া দেননি।

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জোট সরকার ব্যাপক বসতি স্থাপনের কাজ করছে। স্মোটরিচ স্পষ্ট জানিয়েছেন, এর লক্ষ্য হলো স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে মাটিচাপা দেওয়া।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যদেশের মধ্যে ১৫০টির বেশি দেশ গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘ ও বেশির ভাগ দেশের সরকার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই বসতিগুলোকে অবৈধ বলে মনে করে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করে নেয়, তবে তারা এটিকে অধিকৃত অঞ্চল না বলে বিতর্কিত ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে।

ফিলিস্তিনিরা অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান তীব্র সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছে। ফিলিস্তিনি মাঠগবেষক ফারেস ফোকাহা বলেন, অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা এখন উত্তর জর্দান উপত্যকার ৯৫ শতাংশ ফোয়ারার দখল নিয়েছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে বাস্তুচ্যুত করছে।

পশ্চিম তীরের আরেক গ্রাম কুসরায় গত বৃহস্পতিবার তিনটি বাড়ি ঘেরাও করে রাখা অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা তাদের পানি ও বিদ্যুৎ–সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেয় বলে দাবি করা হয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আদেল ইয়াসিন বলেন, ফিলিস্তিনিদের জমি থেকে বিতাড়িত করার এক পরিকল্পিত অভিযানের অংশ হিসেবে বসতি স্থাপনকারীরা পানিসম্পদকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমি এটিকে একধরনের পানিযুদ্ধ হিসেবে দেখি। এটি এমন এক নীরব বুলেট, যা শব্দ ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের ধ্বংস করে দিচ্ছে।’

জুনের শুরুতে কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা অবৈধ ইহুতি বসতি স্থাপনকারী নেতা এলিয়াভ লিবি একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে পুলটিতে পানি ভরতে দেখা যায়। তিনি এবং অন্য ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দাবি, পুলটি বাইবেল যুগের ইহুদি রাজা হেরোডের।

তবে ইসরায়েলি অধিকার রক্ষা সংস্থা ইমেক শেভের প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যালন আরাদ জানান, পুলটির প্রকৃত উৎস বা ইতিহাস স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, পুলে পানি ভর্তি করে বসতি স্থাপনকারীরা মূলত এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের ক্ষতি করছে।

পুলের বাইরে ঝোলানো একটি বিলবোর্ডে বসতি সম্প্রসারণের অন্যতম রূপকার স্মোটরিচের পক্ষ থেকে ৩০ লাখ শেকেল বিনিয়োগের কথা প্রচার করা হয়েছে। টেলিগ্রাম পোস্টে স্মোটরিচ জানিয়েছিলেন, এই অর্থ হেরোডের পুল সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য দেওয়া হয়েছে।