দেশের শিল্প খাতে চলমান তীব্র গ্যাস সংকটে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। গ্যাসের স্থায়ী সমাধানে টেকসই উদ্যোগ, মূল্য হ্রাস এবং প্রয়োজনে রেশনিং চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা। এই সংকটের এক করুণ বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছে 'ক্লে ইমেজ' নামক একটি সিরামিক কারখানার মালিক রেহানা আক্তারের অভিজ্ঞতায়।

দীর্ঘ ২২ বছর ধরে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গড়ে তোলা তার সিরামিক পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। মাটির সিরামিক পণ্যে দেশি-বিদেশি সুনাম অর্জনের পর গত জুনে চীন থেকে প্রায় দুই বছরের বড় রপ্তানি আদেশ পেলেও গ্যাসের অভাবে তা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। রেহানা আক্তার বলেন, "আমার প্রতিষ্ঠানে হাতে তৈরি সিরামিক পণ্য বানানো হয়। সেই পণ্য পোড়ানোর জন্য গ্যাস আবশ্যক। আমি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে নিজের উদ্যোগকে টেনে এনেছি। মাটির সিরামিক পণ্য তৈরিতে আমাদের সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে। সর্বশেষ গত জুনে চীন থেকে প্রায় দুই বছরের বড় রপ্তানি আদেশ পেয়েছি। কিন্তু গ্যাসের তীব্র সংকটে আমার কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ব্যবসা পরিচালনা তো দূরের কথা, ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে গেছে।"

দৈনিক ৫০০ থেকে ৬০০ পিস পণ্য উৎপাদনকারী এই কারখানায় মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ফায়ারিং বা পোড়ানোর প্রক্রিয়া। ২০২৪ সালের পর থেকে লাইনের গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য হয়ে যাওয়ায় বিকল্প হিসেবে পাম্প থেকে গ্যাস কিনে ব্যবহারের জন্য ১০ লাখ টাকা খরচ করেছিলেন তিনি। তবে গত ছয় মাস ধরে সিএনজিও গ্যাসের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। রেহানা আক্তার জানান, "পাম্পগুলোতে প্রেশার কম থাকে। বড় শিল্প পাওয়ার পরে যদি একটু বাঁচত, সেটা আমাদের দিত। গত কিছুদিন হয় গ্যাসের সরবরাহ একেবারেই বন্ধ। এমনকি ১ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়েও আমরা গ্যাস পাচ্ছি না।"

আয় শূন্য হয়ে যাওয়ায় এবং সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়ায় সম্প্রতি কারখানাটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। এর ফলে ১৩ জন অভিজ্ঞ কর্মচারী কাজ হারিয়েছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "গত প্রায় ছয় মাস আমার কারখানায় ফায়ারিং কার্যত বন্ধ রয়েছে। যেটুকু মালামাল ছিল তা বিক্রি করে এবং ব্যাংকের ডিপোজিট ভেঙে এতদিন কর্মচারীদের বেতন দিয়েছি। কিন্তু এখন আর নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো কোনো আর্থিক সংগতি নেই। ব্যাংকঋণের কিস্তি নিয়মিত দিতে হচ্ছে, অথচ আয় শূন্য। বাধ্য হয়ে কয়েক দিন আগে কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত করা ১৩ জন অভিজ্ঞ কর্মচারীকে বিদায় দিতে হয়েছে।"

এসএমই খাতকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে অভিহিত করে তিনি নীতি সহায়তার অভাব এবং ব্যাংকঋণের সুবিধার দাবি জানান। এলপিজিতে স্থানান্তরের পরামর্শের বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন, "উদ্যোক্তাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসে (এলপিজি) স্থানান্তরিত হতে। কিন্তু একটি এসএমই শিল্পের পক্ষে হুট করে আরও ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা কীভাবে সম্ভব? নীতিনির্ধারকেরা এ বিষয়ে আদৌ কী ধারণা রাখেন?"

পরিশেষে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, "বিদেশ থেকে পণ্যের ক্রয়াদেশ হাতে থাকা সত্ত্বেও শুধু গ্যাসের অভাবে যদি কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়, তবে এর চেয়ে বড় দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না। সরকারের কাছে অনুরোধ, রাস্তাঘাটের খোঁড়াখুঁড়ির চেয়েও এখন উদ্যোক্তাদের বাঁচিয়ে রাখা এবং কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরি।"