দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে তীব্র গ্যাসের সংকটের ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন উদ্যোক্তারা। সংকটের স্থায়ী সমাধানে টেকসই উদ্যোগ, গ্যাসের দাম কমানো এবং প্রয়োজনে রেশনিং চালুর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। গ্যাসের সংকটে অনেক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোনো কোনোটি বন্ধও রয়েছে। এর প্রভাব শুধু শিল্পমালিকদের ওপর নয়, কর্মসংস্থান, সরবরাহব্যবস্থা, বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও পড়ছে।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমি নিজেও এই সংকটের ভুক্তভোগী। আমার সয়াবিন বীজ ভাঙানোর কারখানা স্বাভাবিকভাবে চলছে না। প্রিমিয়ার সিমেন্ট ও ন্যাশনাল সিমেন্টের কারখানাতেও গ্যাসের সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার শিল্পকারখানাগুলোতে একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। একটি কারখানা বন্ধ থাকা মানে শুধু উৎপাদন বন্ধ থাকা নয়। এর সঙ্গে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, কাঁচামাল সরবরাহ, পরিবহন ও ব্যাংকঋণ পরিশোধের বিষয়ও জড়িত।"
দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রামের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি জানান, এখানকার শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট হলে এর প্রভাব শুধু চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভোজ্যতেল, সিমেন্ট, কাচ কারখানা, ইস্পাতসহ বিভিন্ন শিল্পের উৎপাদন কমলে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে বাজার ও ভোক্তার ওপর। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে বয়লার চালানোর জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হয় বলে সেখানে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে।
এই সংকটের কারণ হিসেবে তিনি নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে দীর্ঘদিনের অবহেলার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ১৯৯৭-৯৮ সালের পর নতুন কূপ খননে ধারাবাহিক উদ্যোগ দেখা যায়নি, ফলে দেশি গ্যাসের উৎপাদন না বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) সিদ্ধান্ত বাতিল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির চুক্তি বাতিলের বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর মতে, ওই সিদ্ধান্ত বাতিল না হলে বর্তমান সংকটের একটি অংশ সামাল দেওয়া যেত। একই সময়ে গ্যাস আমদানির সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে তিনি দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, সম্ভাব্য সব জায়গায় দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধান শুরু করা, দ্বিতীয়ত, সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিকল্প হিসেবে কয়লা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া এবং তৃতীয়ত, এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে আমদানি ও সরবরাহ বাড়ানো।
সবশেষে তিনি সতর্ক করে বলেন, "শিল্পকারখানা আজ চালু, কাল বন্ধ; এভাবে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই গ্যাসের সংকটকে শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এটি জাতীয় অর্থনীতির সমস্যা। তাই শিল্প সচল রাখতে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ ধরে রাখতে এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।"