মুসলিমদের নিজস্ব কোনো দর্শন ছিল, নাকি প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের ধারণা অনুকরণ ও অনুবাদের মধ্যেই তাদের চিন্তার পরিসর সীমাবদ্ধ ছিল—গত শতকের পশ্চিমা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় এই প্রশ্নটি ছিল বিশেষভাবে উচ্চারিত।

বহু প্রাচ্যবিদ গবেষক দাবি করেছেন যে ইসলাম মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীন চর্চা ও দর্শনের বিরুদ্ধে। তাঁদের মতে, কোরআনের কঠোর বিধান মুসলিমদের চিন্তা করার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে।

তবে ইউরোপীয় গবেষকদের এমন একপেশে দৃষ্টিভঙ্গিকে বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও ঐতিহাসিক তথ্য দিয়ে খণ্ডন করেছেন আধুনিক মুসলিম মনীষীদের অনেকে। তাঁরা বলেছেন, ইসলাম কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাকেই উৎসাহিত করেনি; যারা বুদ্ধির ব্যবহার করেনি, কোরআনে তাদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা এসেছে। (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৭৯)

ইসলামি দর্শনের আত্মপরিচয় ও মৌলিকতা পুনরুদ্ধারে প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছিলেন মোস্তফা আবদুর রাজ্জাক (মৃ. ১৯৪৭ খ্রি.)। তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মিসরীয় দর্শন অধ্যাপক ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড শাইখ এবং দেশটির ওয়াকফ মন্ত্রী হন।

১৯৪০-এর দশকে প্রকাশিত এবং পরে পুনর্মুদ্রিত তাঁর আকরগ্রন্থ তামহিদ লি-তারিখিল ফালসাফাতিল ইসলামিয়্যাহ (ইসলামি দর্শনের ইতিহাসের ভূমিকা) ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।
.
তিনি ১৯ ও ২০ শতকে ইউরোপীয় গবেষকদের ব্যবহৃত গবেষণা পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেন। তখন ইউরোপে এক ধরনের বর্ণবাদী তত্ত্ব প্রচলিত ছিল—যেখানে দাবি করা হতো যে ‘আর্য’ জাতিই হলো সমস্ত সভ্যতা, বুদ্ধি ও দর্শনের জন্মদাতা এবং ‘সেমেটিক’ আরবদের তাত্ত্বিক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক সূত্র আবিষ্কার বা দর্শনের মতো জটিল বিষয় অনুধাবনের সক্ষমতা নেই।

প্রাচ্যবিদদের এক অংশের বক্তব্য ছিল, আরবদের দর্শন আসলে অ্যারিস্টটল বা প্লেটোর গ্রিক ভাবনারই আরবি অনুবাদ। এমনকি কেউ কেউ ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহকে রোমান আইনের অনুকরণ বলেও উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন।

শেখ আবদুর রাজ্জাকের আলোচনায় উঠে আসে—পশ্চিমা গবেষকরা ইসলামি দর্শনের মৌলিক উপাদানগুলো অস্বীকার করে সেগুলো অ-ইসলামি ও অ-আরব উৎস থেকে সংগৃহীত বলে প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু তাঁর মতে, গ্রিক দর্শন অনুবাদ হওয়ার শতবর্ষ আগে মুসলিম সমাজে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল। (পৃষ্ঠা: ৫৪)

গ্রিক দর্শনের ছাঁচে ফেলে ইসলামি দর্শনকে পরিমাপ করাটাই যে ভুল, তা তিনি প্রথম সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইউরোপীয় গবেষকেরা দর্শন বলতে প্রায়ই শুধু ‘মেটাফিজিক্স’ বা পরম সত্তা সংক্রান্ত আলোচনাকে বুঝতেন। বিপরীতে মুসলিমদের দর্শনের পরিসর ছিল অনেক বেশি ব্যাপক ও মৌলিক।

তিনি যুক্তি দেন যে মুসলিমদের প্রকৃত মৌলিক দর্শন লুকিয়ে আছে দুটি শাস্ত্রের মধ্যে—‘উসুলুল ফিকহ’ (ইসলামি আইনের মূলনীতি) এবং ‘ইলমুল কালাম’ (ইসলামি ধর্মতত্ত্ব)। তাঁর ব্যাখ্যায়, গ্রিকদের কাছে অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা (লজিক) যেমন, মুসলিমদের কাছে উসুলুল ফিকহ তেমনি। অর্থাৎ, উসুলুল ফিকহ হলো জ্ঞানার্জনের এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ইসলামি যুক্তিবিজ্ঞান।

এই ধারার কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন ইমাম শাফেয়ি—যে যুক্তি পদ্ধতি ও বিচারবিশ্লেষণের ভিত্তি তিনি গড়ে তোলেন, সেটিকে বাইরের প্রভাব ছাড়া বিশুদ্ধ ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক মেধার ফসল হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
.
লেখকের আলোচনায় দেখানো হয়েছে—পশ্চিমা গবেষকরা ইসলামি দর্শনের মৌলিক উপাদানগুলো অস্বীকার করে সেগুলো অ-আরব উৎস থেকে সংগৃহীত বলে প্রমাণ করতে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু গ্রিক দর্শন অনুবাদ হওয়ার শতবর্ষ আগে মুসলিম সমাজে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল।

তাঁর বইয়ে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, নবীজির যুগ থেকেই ইসলামে যৌক্তিক বিচার (কিয়াস) এবং স্বাধীন গবেষণার (ইজতিহাদ) চর্চা বিদ্যমান ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি সাহাবি মুআজ ইবনে জাবালের একটি ঘটনাও উল্লেখ করেন, যখন তাঁকে ইয়ামেনের বিচারক হিসেবে পাঠানো হচ্ছিল।

নবীজি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “কোরআন ও সুন্নাহতে সরাসরি কোনো সমাধান না পেলে তুমি কীভাবে বিচার করবে?” মুআজ (রা.) উত্তর দিয়েছিলেন, “আমি নিজ বুদ্ধি ও জ্ঞান দিয়ে ‘ইজতিহাদ’ করব।” মহানবী (সা.) তাঁর এই উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৯২)

একইভাবে বনু কোরাইজা অভিযানের ঘটনাকেও স্বাধীন গবেষণার উদাহরণ হিসেবে আনা হয়েছে। নবীজি নির্দেশ দিয়েছিলেন, “বনু কোরাইজায় পৌঁছে আসরের নামাজ পড়বে।”

পথিমধ্যে নামাজের সময় পার হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে সাহাবিদের একদল নবীজির নির্দেশের বাহ্যিক অর্থ ধরে রেখে বনু কোরাইজায় পৌঁছে নামাজ আদায় করেন। অন্য দলটি নির্দেশের মূল উদ্দেশ্য অনুধাবন করে পথেই নামাজ আদায় করে নেন।

মহানবী (সা.) উভয় দলের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গিকেই অনুমোদন দিয়েছিলেন এবং কারো সমালোচনা করেননি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৪৬)

বইয়ের লেখক এসব উদাহরণকে কেন্দ্র করে বলেন, বুদ্ধি প্রয়োগ ও ব্যাখ্যার স্বাধীনতা ইসলামি ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি।
.
বইটিতে গ্রন্থকার তাঁর গবেষণাকে দুটি প্রধান অংশে সাজিয়েছেন:

প্রথম অংশ: এখানে ইসলামি দর্শন সম্পর্কে প্রাচ্যবিদ ও মুসলিম বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং পদ্ধতির তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছে। এ অংশে বলা হয়েছে, কীভাবে ফকিহ ও শাস্ত্রবিদরা দর্শনকে ধর্মের কষ্টিপাথরে বিচার করেছেন; আবার কীভাবে কিছু পণ্ডিত যুক্তিশাস্ত্রকে অহেতুক বাকবিতণ্ডায় পরিণত করেছিলেন।

দ্বিতীয় অংশ: এই অংশে ইসলামি দর্শনের ইতিহাস অধ্যয়নের জন্য একটি নতুন ও মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করা হয়। সেখানে প্রাচীন আরবের প্রজ্ঞা, প্রথম যুগের আইনি মতামত এবং উসুলুল ফিকহের বিকাশ তুলে ধরা হয়েছে।
.
লেখক তাঁর আলোচনার শেষে ‘ইলমুল কালাম’ বা ধর্মতত্ত্বের ইতিহাস নিয়ে একটি বিশেষ অধ্যায় সংযোজন করেছেন। সেখানে নবীজির সময় থেকে শুরু করে উমাইয়া ও আব্বাসীয় আমল পর্যন্ত আকাইদের (ইসলামি বিশ্বাস) জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

শেখ আবদুর রাজ্জাকের প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণা পদ্ধতি পরবর্তী প্রজন্মের মুসলিম দার্শনিকদের অনেককে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে উল্লেখ করা হয়। তাঁর হাত ধরেই ড. আলি সামি আল-নাশশার ইসলামি আশআরি চিন্তাধারাকে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ড. মাহমুদ কাসিম মুতাজিলাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানকে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গিতে পুনর্পাঠের সুযোগ পান। (আলি সামি আল-নাশশার, নাশআতুল ফিকরিল ফালসাফি ফিল ইসলাম, ১/৯, দারুল মাআরিফ, কায়রো, ১৯৬২)