বিশ্ব অর্থনীতি কেবল কিছু সংখ্যা, সূচক বা নীতির সমষ্টি নয়। ইতিহাস, রাষ্ট্রীয় নীতি, বাণিজ্যব্যবস্থা, আর্থিক বাজার এবং বিভিন্ন দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা—এসব বুঝতে পারলেই তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ চিত্র। প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি বা সুদের হারের মতো সূচকগুলো অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বুঝতে সহায়তা করে। তবে বাস্তবতা ধরতে হলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা, উন্নয়নের পথ, বিশ্বায়নের বদল এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাসহ নানা বিষয় বিবেচনায় আনতে হয়।

বাণিজ্য, উন্নয়ন, বিশ্বায়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থায় যে পরিবর্তনগুলো আনা হচ্ছে—সেগুলো নিয়ে লেখা বইগুলো ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নতুন পরিস্থিতি বুঝতে সহায়ক হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে এসব বিষয়ে আলোচনামূলক ১০টি বইয়ের একটি তালিকা তুলে ধরেছে। ওই তালিকায় ডেভিড এঙ্গারম্যানের অ্যাপোস্টলস অব ডেভেলপমেন্ট: সিক্স ইকোনমিস্টস অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দে মেইডসহ একাধিক বই রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান, মাহবুব উল হকসহ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিবিদ ও নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, জগদীশ ভগবতী এবং লাল জয়বর্ধনের জীবন ও কাজের মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিন্তা ও নীতিনির্ধারণের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

এবার দেখে নেওয়া যাক, তালিকার বইগুলো কী—

১. এভরিবডি লাভস আওয়ার ডলার: হাও মানি লন্ডারিং ওন
অলিভার বুলোর এই বইয়ে অর্থ পাচার প্রতিরোধে বৈশ্বিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। লেখকের মতে, কয়েক দশকের আইন, প্রতিষ্ঠান ও বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও অর্থ পাচার যেটুকু কমেছে, তা উল্লেখ করার মতো নয়; বরং বিশ্ব অর্থনীতির সম্প্রসারণের সঙ্গে অবৈধ অর্থের প্রবাহ বেড়েছে। বুলো দেখিয়েছেন, অর্থ পাচার কেবল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য, নগদ লেনদেন, আবাসন, বিলাসপণ্য এবং ক্রিপ্টো সম্পদের মাধ্যমেও অবৈধ অর্থ বৈধ অর্থনীতিতে মিশে যায়। ফলে অর্থ পাচারবিরোধী কাঠামোর বড় দুর্বলতা হলো, যেখানে ঝুঁকি বেশি সেখানে নিয়ন্ত্রণের অভিমুখ স্পষ্টভাবে নয়।

২. হাউ টু উইন আ ট্রেড ওয়ার
বইয়ের নাম দেখে মনে হতে পারে এটি বাণিজ্যযুদ্ধে কীভাবে ‘জেতা যায়’—তার নির্দেশনামূলক কোনো গাইড। তবে সুমায়া কেইনস ও চ্যাড পি. বাউনের বইটি তেমন কোনো সহজ কৌশলপত্র নয়। লেখকেরা দেখিয়েছেন, বাণিজ্যযুদ্ধ কীভাবে শুরু হয়। পাশাপাশি বিশ্লেষণ করেছেন বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তন, সরকারি নীতি এবং বিভিন্ন কৌশলের সুবিধা-অসুবিধা কীভাবে কাজ করে। মহামারির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে আসে।

একই সময়ে ভর্তুকি, শিল্পনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বাণিজ্যনীতি বদলাচ্ছে—এসব বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি, ভর্তুকি পুনর্বিন্যাস, শুল্ক ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো নীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বইটিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখকদের মতে, বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থার পুরোনো নিয়ম বিদ্যমান উত্তেজনা সামাল দিতে আগের মতো কার্যকর নয়।

৩. দ্য ডুম লুপ, হোয়াই দ্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক অর্ডার ইজ স্পাইরালিং ইনটু ডিসঅর্ডার
বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন অনিশ্চয়তা সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি। বইটির লেখক অর্থনীতিবিদ ঈশ্বর এস প্রসাদ এই অনিশ্চয়তার পেছনের কারণ এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গভীর সংকট বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান ব্যবস্থা কেবল চীন, জনতুষ্টিবাদী নেতা বা প্রযুক্তির উত্থানের কারণেই দুর্বল হয়নি; গণতন্ত্র, মুক্তবাজার এবং বৈশ্বিক নিয়মকানুনের সীমাবদ্ধতাও এর জন্য দায়ী।

অর্থনীতি, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং ভূরাজনীতির পারস্পরিক নেতিবাচক প্রভাব একধরনের ধ্বংসের চক্র তৈরি করছে। এতে সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও ক্ষমতার ন্যায্য বণ্টন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঈশ্বর এস প্রসাদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা কিংবা শিল্পনীতির উদ্যোগ—এগুলো দিয়ে এই সংকট সমাধান হবে না। প্রয়োজন নতুন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং সংস্কার। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ন্যায্যতার সঙ্গে নিয়ম প্রয়োগ করতে হবে। আর এই পরিবর্তনে দরকার দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

৪. ব্রেকনেক: চায়নাস কোয়েস্ট টু ইঞ্জিনিয়ার দ্য ফিউচার
চীনের ‘প্রকৌশলী মানসিকতা’ নিয়ে লেখা বই হিসেবে পরিচিত ড্যান ওয়াংয়ের এই বই প্রকৃতপক্ষে আত্মজীবনী, ভ্রমণকাহিনি এবং সমাজ-রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের মিশ্র রূপ। এতে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের নানা দিকের তুলনাও উঠে আসে। লেখক পাঠকদের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যান—কখনো তাঁদের হাঁটিয়ে, কখনো সাইকেলে চড়িয়ে চীনের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্য ও শহরের মধ্য দিয়ে।

এখানে চীনের সংস্কৃতির বিভিন্ন দৃশ্য, খাবারের স্বাদ, পরিসংখ্যান, ইতিহাসের খণ্ডিত-বিখণ্ডিত রূপ এবং নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। ফলে চীনকে দেখার ক্ষেত্রে পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসে।

৫.১৯২৯: ইনসাইড দ্য গ্রেটেস্ট ক্র্যাশ ইন ওয়াল স্ট্রিট হিস্টরি
অ্যান্ড্রু রস সোরকিনের এই বইটি কেবল শেয়ারবাজার ধসের বর্ণনা নয়। কীভাবে সাধারণ মানুষের লোভ, সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগ এবং ব্যাংকারদের আগ্রাসী প্রচারণার সমন্বয়ে আর্থিক বিপর্যয়ের পথ তৈরি হয়েছিল—সেই প্রক্রিয়াটিই এখানে উঠে আসে। বইয়ের অন্যতম চরিত্র ন্যাশনাল সিটি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিচেল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, আমেরিকানদের ঋণ দিয়ে হলেও শেয়ার কিনতে উৎসাহিত করা। শেয়ার কেনা আর কিস্তিতে ওয়াশিং মেশিন কেনার মধ্যে পার্থক্য নেই—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠাই ছিল মিচেলের প্রচেষ্টার কেন্দ্রে। তিনি তাতে সফল হন। সাধারণ মানুষের বিপুল অংশগ্রহণে শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। কিন্তু সেই উন্মাদনা শেষ পর্যন্ত বাজারকে ১৯২৯ সালের ভয়াবহ ধসের দিকে নিয়ে যায়।

৬. মানি বিয়ন্ড বর্ডার্স: গ্লোবাল কারেন্সিস ফ্রম ক্রোয়েসাস টু ক্রিপ্টো
বিশ্ববাণিজ্যে চলমান অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থার বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছেন লেখক ব্যারি আইকেনগ্রিন। তাঁর মতে, এখন পর্যন্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য টিকে থাকার বড় কারণ হলো, এর কার্যকর বিকল্প এখনো নেই। নতুন বইটিতে তিনি দীর্ঘ সময়ের পরিসর বিবেচনায় নিয়েছেন। প্রাচীন রোমে মুদ্রাব্যবস্থার সূচনা থেকে শুরু করে বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থায় কী প্রভাব ফেলতে পারে—সেই সম্ভাবনাও বিশ্লেষণে আছে।

৭. অ্যাপোস্টলস অব ডেভেলপমেন্ট: সিক্স ইকোনমিস্টস অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড দে মেইড
উন্নয়ন অর্থনীতি নিয়ে আগ্রহীদের জন্য ডেভিড এঙ্গারম্যানের বইটি সুখপাঠ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে পড়াশোনা করেছেন বা কাজ করেছেন—এমন পাঠকের জন্য এটি প্রাসঙ্গিক। ছয়জন দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতিবিদ—অমর্ত্য সেন, জগদীশ ভগবতী, মনমোহন সিং, মাহবুব উল হক, রেহমান সোবহান ও লাল জয়বর্ধনের জীবন ও কাজের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চিন্তা ও নীতিনির্ধারণের ইতিহাস তুলে ধরেছেন লেখক। তাঁদের অর্জন ও চিন্তার বিবর্তনকে কেন্দ্র করে বইটি একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস এবং নীতি প্রণয়নের ইতিহাসের একটি দলিল হিসেবেও উঠে আসে।

৮. প্রাইভেট ফাইন্যান্স, পাবলিক পাওয়ার: আ হিস্টরি অব ব্যাংক সুপারভিশন ইন আমেরিকা
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংক তদারকি ব্যবস্থার পথ রাতারাতি তৈরি হয়নি, কিংবা কোনো একক নীতির ভিত্তিতেও গড়ে ওঠেনি। প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং সময়ের সঙ্গে নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রয়োজন—এই দুইয়ের সমন্বয়ে ব্যবস্থা এগিয়েছে। কঠোর নিয়ম বা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়; বরং প্রতিটি আর্থিক সংকট, সংস্কার এবং রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়ে তদারকি ব্যবস্থায় নতুন ক্ষমতা ও দায়িত্ব যোগ হয়েছে।

ফলে এমন এক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে সরকারি ক্ষমতার সঙ্গে বেসরকারি আর্থিক খাতের সমঝোতা ও টানাপোড়েন—দুই ধারাই চলতে থাকে। পিটার কন্টি-ব্রাউন ও শন এইচ ভানাট্টা এই বইয়ে গত দুই শতকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক তদারকি ব্যবস্থার বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন।

৯. শেয়ার্ড প্রসপারিটি ইন আ ফ্র্যাকচার্ড ওয়ার্ল্ড
বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। গত ৮০ বছরের পরিচিত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থা কমছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। মুক্তবাজারভিত্তিক ওয়াশিংটন কনসেনসাস, রাষ্ট্রনির্ভর কেইনসীয় কল্যাণরাষ্ট্র, কিংবা নিয়মভিত্তিক উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও আগের মতো গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পারছে না। দানি রডরিক এই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করেছেন বইটিতে। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতা বোঝার জন্য চিন্তার নতুন কাঠামো তুলে ধরেছেন তিনি।

১০. সারভাইভিং রোম: দ্য ইকোনমিক লাইভস অব দ্য নাইনটি পার্সেন্ট
মার্কিন প্রত্নতাত্ত্বিক কিম বোয়েস লিখেছেন, রোমের ইতিহাস মূলত ধনীদের ইতিহাস। সিসেরো, লিভি, ট্যাসিটাস প্রমুখ নিজেদের লেখায় কনসাল ও সম্রাটদের জীবন তুলে ধরেছেন। কিন্তু সাধারণ কর্মজীবী রোমানদের জীবন নিয়ে এসব খ্যাতিমান ইতিহাসবিদের আগ্রহ ছিল না। ফলে রোমের ইতিহাসের বড় একটি অংশ আড়ালেই থেকে গেছে। কিম বোয়েস তথ্যসমৃদ্ধ ও গভীর গবেষণাভিত্তিক বইয়ে সেই অনুপস্থিত অংশটি সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। তাঁর বইয়ে প্রাচীন রোমের সাধারণ মানুষের জীবন ও ভূমিকার নতুন চিত্র উঠে আসে।