দেশের বাজারে দুই মাস ধরে সোনার ভরি সোয়া দুই লাখ টাকার নিচেই ওঠানামা করছে। এ সময়ে ভরিপ্রতি ২৯ বার দাম ওঠা-নামার তথ্য পাওয়া গেলেও প্রায় একই সীমার মধ্যেই অবস্থান করতে দেখা গেছে।
তবে বৃহস্পতিবার হঠাৎ করে (২২ ক্যারেট) সোনার দাম ভরিতে একলাফে প্রায় ১০ হাজার টাকা বেড়ে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকায় ওঠে। পরের দিন শুক্রবার একই পাকা বাজারে আবার দাম কমে ৩ হাজার ২৬৬ টাকা। এতে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার টাকায় নেমে আসে।
দুই দিনের ব্যবধানে ভরিতে সোনার দাম ৬ হাজার ৫৯০ টাকা বাড়া-কমার পেছনে কী কাজ করেছে—তা বুঝতে কিছু প্রাসঙ্গিক বিষয় দেখা দরকার। সোনার দামের সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির যোগসূত্র গভীর। বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত উত্তর হিসেবে বলা যায়—‘অনিশ্চয়তা’।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ–ঘিরে ছয় মাস ধরে অনিশ্চয়তা চলমান। অর্থনীতির জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সোনার বাজারে এর প্রভাব বরং সহায়ক হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আশঙ্কা বাড়ে। ফলে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত সোনার চাহিদাও বাড়ে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়লে সোনার দাম বেশি বাড়ার প্রবণতা থাকে। আবার অর্থনৈতিক সংকট কাটার ইঙ্গিত মিললে সোনার দাম তুলনামূলকভাবে কমে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে জানুয়ারিতে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার জেরে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স সোনার দাম পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এরপর দাম কিছুটা কমলেও ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হলে ফের পাঁচ হাজার ডলারের ওপরে উঠে। পরে যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর দাম আবার চার হাজার ডলারের নিচে নামে। ফলে কয়েক মাস ধরে সোনার দাম চার হাজার ডলারের আশপাশেই অবস্থান করে।
বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথের পাশাপাশি সরবরাহ ও চাহিদাও দাম নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। সরবরাহ আসে দুইভাবে—নতুন উত্তোলন এবং পুরোনো সোনা বিক্রি। স্বর্ণখনি থেকে সোনা উত্তোলন একটি চলমান প্রক্রিয়া। তবে সোনার সরবরাহ বাড়ে সাধারণত মূল্যবৃদ্ধির সময়েই। গত বছর প্রতি আউন্স সোনার দাম বেড়ে ৪ হাজার ৩০০ ডলারে উঠেছিল, যা সে সময় পর্যন্ত ইতিহাসের সর্বোচ্চ দাম ছিল। গত বছর খনি থেকে ৩ হাজার ৬৭১ টন সোনা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায়; যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২১ টন বেশি।
সোনার দামের ওঠানামা তাই দেশের বাজারে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সরাসরি প্রভাব হিসেবে দেখা হয়। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দেশেও বাড়ে; কমলে দেশেও কমে। বছরের পর বছর ধরে এ দামের ওঠানামা সমন্বয় করে থাকে দেশের জুয়েলারি খাতের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)।
এর আগে ৩১ জুলাই সোনার দাম ভরিতে ২ হাজার ২১৬ টাকা বেড়েছিল। সে সময় বৈশ্বিক বাজারের স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম) সোনার দাম ছিল ৪ হাজার ৬২ ডলার। কয়েক দিন ধরে দাম টানা বাড়ায় গতকাল একপর্যায়ে তা ৪ হাজার ২৮২ ডলারে ওঠে। বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্সে দাম ২২০ ডলার বেড়ে যাওয়ার হিসাবেই বাংলাদেশে ভরিপ্রতি একবারে ৯ হাজার ৮৫৬ টাকা বাড়ানো হয়। ফলাফলে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম বেড়ে ২ লাখ ৩২ হাজার ৯৩০ টাকায় দাঁড়ায়।
তবে গতকাল বিশ্ববাজারে সোনার দামে কিছুটা নিম্মমুখী প্রবণতা দেখা যায়। আজ সকালে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ২৩০ ডলারে নেমে এলে বাজুস ভরিপ্রতি ৩ হাজার ২৬৬ টাকা কমায়। এতে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম কমে ২ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৪ টাকায় দাঁড়ায়। যদিও আজ সকালে পর বিশ্ববাজারে সোনার দাম আবার বাড়ে। রাত দশটার দিকে স্পট মার্কেটে এক আউন্স সোনার দাম বেড়ে ৪ হাজার ৩৫০ ডলারে দাঁড়ায়।
রয়টার্স ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি আবার চালু হওয়ার বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হওয়ায় জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। জ্বালানি তেলের দাম কমায় মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেড) সুদহার বাড়ানোর পথে না–ও যেতে পারে—এমন ধারণা জোরালো হয়েছে। সুদের হার স্থিতিশীল বা কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে সোনার মতো সুদবিহীন সম্পদের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়তে পারে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সোনার এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। বাজার বিশ্লেষক নিকোস জাবোরাস রয়টার্সকে বলেন, সোনার দাম আবারও চাপের মুখে পড়তে পারে। এমনকি ২০২৬ সালের নতুন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। মূল্যস্ফীতির চাপ পুরোপুরি না কমায় সুদহার বাড়ানোর পক্ষে থাকা নীতিনির্ধারকেরা এখনো সক্রিয়। একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিও সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্যে রয়েছে। ফলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে সোনার দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ দ্রুত ফিরে আসতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আমিনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বৈশ্বিক বাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ২০০ ডলার বেড়ে যাওয়ার কারণে গতকাল ভরিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা বাড়াতে হয়েছে। তবে বৈশ্বিক বাজারে দাম সামান্য কমে যাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে পাকা সোনার দাম হ্রাস পাওয়ায় আমরা আজ দর সমন্বয় করেছি।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে দেওয়ান আমিনুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৩৫০ ডলারে পৌঁছে গেছে। এমন ধারা বজায় থাকলে আগামীকাল শনিবার আবার দাম বাড়াতে হবে। বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারের যে পরিস্থিতি, তাতে প্রতি আউন্স সোনার দাম সাড়ে ৪ হাজার ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।