মুসলিম স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার ইতিহাস আলোচনায় প্রাসাদ, দুর্গ, ঐতিহ্যবাহী মসজিদ কিংবা প্রতিষ্ঠিত স্থাপনার কথাই বেশি উঠে আসে। কিন্তু সভ্যতার দৈনন্দিন গতি-প্রবাহের মূল জায়গাটি ছিল সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি এবং তাদের প্রতিদিনের আবাসনের বিন্যাসে।
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার প্রাচীন শহরগুলোর গলিপথ ধরে হাঁটলে যে বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে, সেটি মূলত গড়ে উঠেছিল সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রয়োজন, পারিবারিক গোপনীয়তা, আবহাওয়া মোকাবেলা এবং সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে। এসব নকশা ছিল ব্যবহারিক চিন্তার ফল—যেখানে ঘর নির্মাণ কেবল নির্মাণকর্ম নয়, বরং জীবনধারা এবং প্রতিবেশীদের অধিকার রক্ষারও বিষয় হয়ে উঠেছিল।
ইসলামি সংস্কৃতিতে প্রধান স্থপতিদের ‘উস্তাদ’ উপাধি দেওয়া হতো, যা স্থাপত্যশিল্পের উচ্চ মর্যাদাকেই ইঙ্গিত করে। একজন সাধারণ নাগরিকের বাড়ি কেমন হবে, নকশা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং আলো-বাতাসের ব্যবস্থা কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব সিদ্ধান্ত কেবল ভৌত কাঠামো দাঁড় করানো নয়; ইসলামি জীবনধারা ও প্রতিবেশীদের পারস্পরিক অধিকারের বাস্তব প্রতিফলনও ছিল বলে আলোচনায় এসেছে।
মক্কা ও মদিনায় স্থায়ী জনবসতি গড়ে উঠলেও নবীযুগে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির রূপ ছিল খুবই সাধারণ। নবীজির মদিনার হুজরাগুলো ছিল খেজুরের ডাল, পাতা ও কাঁচা মাটির তৈরি।
ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে এবং মরু অঞ্চলের জীবনধারায় স্থায়ী বাড়িঘরের চেয়ে তাঁবু বা চামড়া ও পশমের তৈরি সাময়িক বাসস্থানের ব্যবহারই বেশি ছিল। পবিত্র কোরআনে সেই সরল ব্যবস্থার কথাই স্মরণ করিয়ে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলো তোমাদের জন্য স্থায়ী বসবাসের স্থান করেছেন এবং তিনি পশুর চামড়া দিয়ে তোমাদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।” (সুরা নাহল, আয়াত: ৮০)
পরবর্তী সময়ে মক্কা ও মদিনায় স্থায়ী জনবসতি গড়ে উঠলেও নবীযুগে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির রূপ ছিল খুবই সাধারণ। নবীজির মদিনার হুজরাগুলো ছিল খেজুরের ডাল, পাতা ও কাঁচা মাটির তৈরি।
ঐতিহাসিক রূপকার ইবনে সাদ বর্ণনা করেছেন, নববী হুজরার কয়েকটি ছিল কাঁচা-ইটের এবং কয়েকটি খেজুরগাছের ডালের তৈরি, যার দরজায় পশমের পর্দা ঝুলত। (মুহাম্মদ ইবনে সাদ, আল-তাবাকাতুল কুবরা, ১/৩৮৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত, ১৯৯০)
মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সঙ্গে সঙ্গে নগর গড়ে তোলার প্রয়োজনও সামনে আসে। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন ইমারত নির্মাণকে মানব সভ্যতার প্রথম ও প্রাচীনতম মৌলিক শিল্প হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা মানুষকে প্রাকৃতিকভাবে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেয়। (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১/৫৪৩, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)
মুসলিম সভ্যতায় ঘরবাড়ি নির্মাণের পেছনে কাজ করতেন পেশাদার কারিগরদের একটি বিশাল দল। এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, নকশাকার, প্লাস্টারশিল্পী এবং সাধারণ শ্রমিক বা ‘রুজগারি’ (দৈনিক ভিত্তিক কারিগর)। ইরাক ও মিসরে প্রধান প্রকৌশলীকে বলা হতো ‘উস্তাদ’ বা ‘রইসুল মুহান্দিসিন’।
নির্মাণকাজে আধুনিক স্কেল বা থ্রি-ডি মডেলিংয়ের মতো প্রাথমিক রূপও তখন ব্যবহৃত হতো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খলিফা আল-মানসুর বাগদাদ শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। তিনি প্রকৌশলীদের ডেকে মাটিতে তুলার বীজের ওপর তেলের ফোঁটা ফেলে আগুন জ্বালিয়ে পুরো শহরের একটি দৃশ্যমান প্রাথমিক রেখাচিত্র বা থ্রি-ডি মডেল তৈরি করে দেখে নিয়েছিলেন। (তাবারি, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ৪/৪২১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, বৈরুত: ১৯৮৭)
বাড়ি নির্মাণের খরচ মালিকের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারণ হতো। মিসর বা দামেস্কে সাধারণ একটি দোতলা বাড়ির গড় খরচ ছিল তিন শত থেকে এক হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা)।
তবে প্রতিবেশীর আলো-বাতাস বা গোপনীয়তা বিনষ্ট না হয়—এমন বিষয় বিবেচনায় কাজিরা (বিচারক) প্রকৌশলীদের মতামত গ্রহণ করতেন। (ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ১/৫৪৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৮)
উঠানের চারপাশে ঘরের দরজাগুলো খুলত। উঠানে ফোয়ারা, ছোট পানির হাউজ বা গাছপালা থাকত যা পুরো বাড়িরে ঠান্ডা রাখত।
মুসলিম ঘরবাড়ির নকশা মূলত দুটি মূল নীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা এবং ভেতরের পরিবেশ ঠান্ডা রাখা।
প্রবেশপথে বাইরের দরজা খুললেই ভেতরের ঘর দেখা যেত না। মাঝখানে থাকত একটি বাঁকানো গলি বা প্রবেশপথ, যাকে বলা হতো ‘দেহলিজ’। অতিথিদের অপেক্ষার জায়গা হিসেবেও এটিকে ব্যবহার করা হতো।
দেহলিজ পার হলেই পাওয়া যেত বাড়ির কেন্দ্রস্থল—খোলা উঠান, যাকে বলে ‘সাহন’। উঠানের চারপাশে ঘরের দরজাগুলো খুলত। উঠানে ফোয়ারা, ছোট পানির হাউজ বা গাছপালা থাকত যা পুরো বাড়িকে ঠান্ডা রাখত।
অতিথিদের অভ্যর্থনায় ব্যবহৃত হতো ‘মজলিস’। শোবার ঘরকে বলা হতো ‘মারকাদ’। উচ্চবিত্ত ও আলেমদের বাড়িতে থাকত ‘বাইতুল কুতুব’ বা নিজস্ব লাইব্রেরি।
বাড়ির ওপরের অংশে কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো ছোট ঘর বা চিলেকোঠা—যাকে বলা হতো উম্মু আল-গুরফ বা আলিয়্যাহ। ছাদে ওঠার সিঁড়িকে বলা হতো ‘মামরাক’।
মুসলিম সভ্যতায় গরম প্রধান অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ঘর ঠান্ডা রাখার প্রযুক্তিও উদ্ভাবিত হয়েছিল বলে উল্লেখ রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে হাওয়াদান ব্যবস্থা নিয়ে বলা হয়—বাড়ির ছাদের ওপর বিশেষ ধরনের টাওয়ার বা উইন্ডক্যাচার তৈরি করা হতো, যা ওপরের ঠান্ডা বাতাসকে টেনে নিচে নামিয়ে আনত; যাকে বলা হত বাদাহাঞ্জ।
গ্রীষ্মকালে জানালা ও উইন্ডক্যাচারের মুখে সুতি বা পাটের ভিজা পর্দা (খাইশ) ঝুলিয়ে দেওয়া হতো, যার মধ্য দিয়ে বাতাস ঘরে ঢোকার সময় প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশ শীতল হয়ে যেত। (আল-তানুখি, আল-ফারাজু বাদাশ-শিদদাহ, ২/১২৫, দার সাদির, বৈরুত, ১৯৭৮)
এ ছাড়া ঘরের সাহনে ছোট ফোয়ারা (ফাসকিয়া) নির্মাণ করা হতো। দামেস্কের কিছু বাড়িতে দেখা যেত পানির নালা রান্নাঘর থেকে সরাসরি খাবার ঘরে খাবার ভর্তি পাত্র ভাসিয়ে নিয়ে আসত। একই সঙ্গে প্রতিটা বাড়ির নিচে বৃষ্টির পানি জমা রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট আধার (মাওয়াজিল) নির্মাণ করা হতো।
মদিনায় সাহাবি সাদ ইবনে খাইসামার বাড়িটি ‘বাইতুল উজ্জাব’ বা ব্যাচেলরদের বাড়ি নামে পরিচিত ছিল, কারণ সেখানে হিজরত করে আসা অবিবাহিত সাহাবিরা থাকতেন।
মুসলিম সভ্যতায় বহুতল ভবন ও যৌথ আবাসনের ধারণা বেশ প্রাচীন। মদিনায় সাহাবি সাদ ইবনে খাইসামার বাড়িটি ‘বাইতুল উজ্জাব’ বা ব্যাচেলরদের বাড়ি নামে পরিচিত ছিল, কারণ সেখানে হিজরত করে আসা অবিবাহিত সাহাবিরা থাকতেন। (আবু আর-রাবি আল-কালাই, আল-ইকতিফা বিমা তাশামমালুহু মিন মাগাজি রাসুলিল্লাহ, ১/৩২৪, আলমুল কুতুব, বৈরুত, ১৯৯৭)
পরবর্তী সময়ে কায়রো, ত্রিপোলি ও জেদ্দায় ৫ থেকে ৭ তলা পর্যন্ত উঁচু আবাসিক ভবন নির্মিত হয়েছিল। কায়রোতে এক একটি বহুতল ভবনে ছোট ছোট ফ্ল্যাট বা ‘মাসরিয়্যাত’ থাকত, যেখানে এক একটি ভবনে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ বাস করতেন বলে ভ্রমণকারী নাসের খসরু উল্লেখ করেছেন। (নাসের খসরু, সফরনামাহ, পৃষ্ঠা: ১১২, আল-হাইআতু মিসরিয়্যাতুল আম্মাহ, কায়রো, ১৯৯৩)
সব মিলিয়ে মুসলিম সভ্যতায় মানুষের বাসস্থান কেবল ইট-পাথরের দেওয়াল ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল আত্মিক প্রশান্তি, সৌন্দর্য এবং সামাজিক নিরাপত্তার এক আশ্রয়। প্রযুক্তি ও প্রকৃতির এমন সমন্বয় যেখানে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি নির্মাণে দেখা যায়—বর্তমান যুগের পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আবাসন ব্যবস্থার জন্য তা হতে পারে এক ধরনের অনুপ্রেরণা।