উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেই সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে। প্রচলিত অর্থনৈতিক ব্যাখ্যায় বলা হয়, সুদহার কমার ফলে অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে, মানুষের হাতে ব্যয়ের সক্ষমতাও বাড়তে পারে—যাতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিকল্প সীমিত ছিল বলেও আলোচনা রয়েছে। কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা কারণে অর্থনীতিতে যে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে, তা নতুন সরকারের জন্যও স্বস্তিদায়ক নয়।
গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ১৬ মাসের সর্বোচ্চ; ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। জুনে তা কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। এদিকে সাম্প্রতিক বন্যার প্রভাবে খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। চলতি বাজেটে সরকারের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।
অর্থনীতিতে এখন মূল্যস্ফীতির একাধিক উৎস থেকে চাপ আসছে বলে বিশ্লেষণ উঠে এসেছে—কিছু নীতিগত, কিছু আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট, আবার কিছু সরবরাহজনিত। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক এতদিন সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি দিয়ে আসলেও কার্যত এবার নীতি সুদহার বাড়ানো না হয়ে কমানোর সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা বদলানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে। পাশাপাশি স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে সরকার ব্যাংকঋণের সুদের স্প্রেড ৪ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য ঘোষণা করলেও বাস্তবে গড় স্প্রেড এখনো সাড়ে ৫ শতাংশের ওপরে—বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই সীমার বাইরে। কীভাবে, কত সময়ের মধ্যে এবং কোন নীতিগত কাঠামোর মাধ্যমে ওই লক্ষ্য পূরণ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ায় মানুষের মধ্যে নগদ অর্থ ধরে রাখার প্রবণতাও বাড়ছে। এতে ব্যাংকের আমানত প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে মানুষের হাতে নগদ অর্থ থাকলেই যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে—এমন একটি সিদ্ধান্তমূলক ব্যাখ্যা টেকসই নয়। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন রিজার্ভ মানি সৃষ্টি করে তা ঋণ বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হলে ভবিষ্যতে ব্রড মানি ও মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে সরকার বন্ধ শিল্পকারখানা আবার চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে। যদি এই অর্থ নতুন রিজার্ভ মানি হিসেবে অর্থনীতিতে প্রবেশ করে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ আকারে ব্যবহার হয়, তবে প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে—যদিও প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে ঋণ বিতরণ বা চাহিদার ওপর।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রিজার্ভ মানি ও ব্রড মানি—দুটিই বাড়তির দিকে থাকতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ সালের মে মাসের তুলনায় চলতি বছরের মে মাসে রিজার্ভ মানি বৃদ্ধির হার ছিল ২১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। একই সময়ে ব্রড মানি বৃদ্ধির হার ছিল ১২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ মানি বাড়ালে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ বাড়লে সেটি ব্রড মানিতে রূপ নেয়। ফলে অতিরিক্ত রিজার্ভ মানির কারণে ভবিষ্যতে মুদ্রা সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়তে পারে—বাকি সবকিছু অপরিবর্তিত থাকলেও।
উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো আমানতের প্রকৃত সুদহার। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে দেখা যায় আমানতের প্রকৃত সুদহার ঋণাত্মক—অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা রাখলেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের সঞ্চয়ে আগ্রহ কমার আশঙ্কাও উঠে আসে।
এদিকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাজেটে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে সরকার। মূল বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা তো বটেই, পরে সংশোধিত বাজেটে যে ব্যাংকঋণের সীমা বাড়ানো হয়েছিল, সেটিও ছাড়িয়ে গেছে সরকার। অর্থবছর শেষে ব্যাংক থেকে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ১২৯ কোটি টাকা, দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে যা সর্বোচ্চ।
আরেকটি তথ্য বলছে, গত জুনে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে—ইতিহাসে সর্বনিম্ন। মে মাসে তা ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এর আগে এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। ২০২০ সালে করোনা মহামারির চরম সংকটের সময়ও এই প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে ছিল।
এই প্রবণতায় ‘ক্রাউডিং আউট’ ধরনের প্রভাব পড়ছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে—সরকারি ঋণের কারণে বেসরকারি খাতের ঋণ ও বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকার ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিচ্ছে এবং বেসরকারি খাত পিছিয়ে পড়ছে। সে ক্ষেত্রে শুধু ঋণের সুদহার কমালেই যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে, এমন সম্ভাবনা কম—কারণ প্রবৃদ্ধির গতি আগেই ধীর, সরকারের রাজস্ব আয় কম, এবং বিভিন্ন শুল্ক ছাড় দেওয়ার কারণে সরকারের আয় আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থায়নের অন্যান্য উৎস প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, আধুনিক অর্থব্যবস্থায় শেয়ারবাজার ও বন্ড বাজারসহ নানা উৎসে অর্থায়ন সম্ভব হলেও বাস্তবে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাংকঋণনির্ভরতা বেশি। দেশের শেয়ারবাজার এখনো পর্যাপ্ত আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে পারেনি বলেও উল্লেখ আছে। একই সঙ্গে বন্ড বাজারকে বিকল্প হিসেবে সীমিত বলা হয়েছে। খেলাপি ঋণের বড় একটি কারণ হিসেবেও এই কাঠামোগত দুর্বলতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের মতো দেশে কেবল নীতি সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। বাজারব্যবস্থার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকা, টানা তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারাবাহিক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পরও কাঙ্ক্ষিত হারে মূল্যস্ফীতি কমার নজির না থাকায় বোঝা যায়—মূল সমস্যার পেছনে কেবল অতিরিক্ত চাহিদা নয়, আরও গভীর কাঠামোগত কারণ রয়েছে।
সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, টাকার অবমূল্যায়নের ফলে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানিসংকট, পণ্য পরিবহন ও বিতরণে প্রতিবন্ধকতা এবং বাজারে প্রতিযোগিতামূলক কাঠামোর ঘাটতি—এসব কারণে মূল্যস্ফীতির চক্র দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। দুর্বল বাজার তদারকি এবং কারসাজির সুযোগ থাকায় স্বাভাবিকভাবে মূল্য সমন্বয়ও বাধাগ্রস্ত হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাই কেবল সুদহার বাড়ানো বা কমানোর মতো মুদ্রানীতিগত পদক্ষেপ দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়—এ কথাই বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি।
তবে এই আলোচনার বাইরে ‘চাহিদা’ প্রসঙ্গও গুরুত্ব পেয়েছে। বলা হয়েছে, পণ্যের চাহিদা না থাকলে সুদের হার কমিয়ে লাভ হয় না; বিনিয়োগে আগ্রহও তৈরি নাও হতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাবে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়লে ব্যক্তি পর্যায়েও ধার করে ক্রয়ে উৎসাহ কমতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো চাহিদা এবং সেই চাহিদা আসে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থেকে। মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হলে চাহিদা বাড়বে না। তখন আর্থিক কর্তৃপক্ষ উদারহস্তে সহায়তা করলেও লাভ নাও হতে পারে; বেসরকারি খাত চাহিদা তৈরি করতে পারে না। রাজস্ব নীতি এখানে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে নানা শুল্ক ছাড় দেওয়াকে ইতিবাচক বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ আছে, বন্ধ কলকারখানা দ্রুত চালু করা, মানুষকে কাজে ফিরিয়ে আনা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা দরকার—এসব থাকলে মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারে। তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিপজ্জনকভাবে কমে যায় এবং তখন অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ে না বলেও বলা হয়েছে।
অবকাঠামো প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো দেশে অবকাঠামোর চাহিদা এখনো পূরণ হয়নি। চীন একসময় অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়িয়েছিল এবং ভারতও সেই পথে হাঁটছে। তবে গত ১৭ বছরে দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিপুল দুর্নীতি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে। তবু অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য রয়েছে; এই খাতে সরকারের বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়তে পারে এবং চাহিদাও বাড়তে পারে।
শেষদিকে নীতি সুদহারকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখলেও সেটিকে জাদুর কাঠি বলা হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, পুঁজিবাজারের বিকাশ ও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির কথাও বলা হয়েছে। অর্থনীতির চালিকা শক্তি শেষ পর্যন্ত সুদের হার নয়—আস্থা ও চাহিদা—এই সমন্বয় না ঘটলে কেবল মুদ্রানীতিগত সিদ্ধান্তে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না বলেই প্রতিবেদনে উপসংহার টানা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম কাজ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ হলেও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে অনেক বিষয় জড়িত—মুদ্রানীতি, রাজস্ব নীতি, চাহিদা-সরবরাহ, বিনিময় হার, উৎপাদন ব্যয়, বিনিয়োগ ইত্যাদি। ফলে মূল্যস্ফীতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে অন্যান্য নীতির প্রভাবও পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।