গাজীপুরের কোনাবাড়ী জেলখানা রোড এলাকার শামসুল আল আমিন গ্রুপের ফুয়াদ স্পিনিং মিলসে গত শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার মূল ফটক বন্ধ রয়েছে। নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ আছে।
কারখানাটির মহাব্যবস্থাপক হাবিবুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, “১০ শতাংশ উৎপাদনও যদি না করতে পারি, তাহলে শুধু লোকসানই হবে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আবার কারখানা চালু করা হবে।”
দুই সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র গ্যাস-সংকটের প্রভাবে ফুয়াদ স্পিনিং মিলস ছাড়াও গাজীপুরের ১৭টি তৈরি পোশাক ও বস্ত্র কারখানার ডাইং (রং) সেকশন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর বাইরে কিছু কারখানা উৎপাদন আংশিক বন্ধ রেখেছে। একই ধারায় অধিকাংশ কারখানার উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানা গেছে। নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের শিল্পকারখানাতেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
গতকাল গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্রই পাওয়া যায়। এসব এলাকায় অনেক কারখানা গ্যাস–সংকটের কারণে আজ ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবসের ছুটির সঙ্গে বাড়তি এক-দুই দিনের বাড়তি ছুটি দিয়েছে। গতকাল রাতে শ্রমিকেরা বাড়ি যেতে এলাকার বাসস্টপগুলোতে ভিড় করেন।
শিল্পে গ্যাস–সংযোগ আপাতত বন্ধ। বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস–সংকটের কারণে অধিকাংশ শিল্পকারখানার উৎপাদন কমে গেছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে শিল্পে ছাঁটাইয়ের ঘটনা ঘটবে।
আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট ও সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকট বেড়েছে।
তবে শুরুতে টানা চার দিন সক্ষমতার বেশি এলএনজি সরবরাহ করেছে সামিটের টার্মিনাল। দিনে প্রায় ৫৭ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করেছে তারা। এরপরও প্রতিদিন পূর্ণ সক্ষমতায় সরবরাহ করছে। এখনো প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটো বয়লার আছে। প্রতিটির সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট করে। আগুনে একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যটি অক্ষত ছিল; কিন্তু বৈদ্যুতিক তারসহ কিছু যন্ত্রাংশ পুড়ে যাওয়ায় মেরামতে সময় লাগছে। ইতিমধ্যে অক্ষত বয়লার থেকে গ্যাস সরবরাহ চালু করতে টার্মিনাল তৈরি করা হয়েছে। শেষ মুহূর্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। খুব শিগগির গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হবে। তবে নির্দিষ্ট করে সময় জানায়নি এক্সিলারেট; আর ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনাল থেকে সরবরাহ শুরু করতে কিছুদিন সময় লাগতে পারে। ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় নিয়ে রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরেজমিন যা পাওয়া গেল
গাজীপুরে কারখানার সংখ্যা ২ হাজার ১৭৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ১৮৭টি পোশাক কারখানা। এ ছাড়া অনিবন্ধিত ছোট-বড় কারখানাসহ জেলায় প্রায় পাঁচ হাজার ছোট-বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই গ্যাসনির্ভর।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, গ্যাস–সংকটে অন্তত ১৭টি কারখানার ডাইং সেকশন বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাবের অ্যান্ড জোবায়ের ফেব্রিক, শিশির নিটিংড, টিএমএসএস অ্যাপারেলস ও তালাশ ফ্যাশন। এ ছাড়া মীর সিরামিকস ও আরএকে সিরামিকসের কিছু উৎপাদন ইউনিটও আংশিকভাবে বন্ধ।
গাজীপুরের লোহাকৈর এলাকার খান গ্রুপের কারখানায় সাধারণত প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজারটি তৈরি পোশাক উৎপাদিত হয়। বর্তমানে কারখানায় গ্যাস–সংকট ও বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে দিনে উৎপাদন নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজারটিতে।
কারখানাটির কর্মকর্তা খন্দকার হাবিব জানান, গ্যাসের সংকটে কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে এখন ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে মাসিক জ্বালানি খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ডিজেল বাবদ ব্যয় ১২ লাখ টাকা।
কারখানা বন্ধ নয়, গ্যাস–বিদ্যুতের সংকটে ছুটি সমন্বয় হচ্ছে: বিজিএমইএ
সারা দেশের কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে নরসিংদীর বস্ত্রকল। এ জেলায় টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিলের সংখ্যা তিন হাজারের বেশি। গ্যাস–সংকটের কারণে বেশ কিছু কারখানা উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলসের কারখানায় কাপড় ফিনিশিংয়ের কাজ হয়। প্রতিদিন প্রায় লক্ষাধিক গজ কাপড় ফিনিশিং করে তারা। তবে গ্যাস–সংকটে দুই সপ্তাহ ধরে কারখানার উৎপাদন প্রায় বন্ধ রয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালন্ডার মিলসের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কারখানা চালাতে গ্যাসের ন্যূনতম ১০ পিএসআই চাপ প্রয়োজন। তিনি বলেন, “তবে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ পিএসআই। এত কম চাপে উৎপাদন রাখা যায় না। রাতের সিলিন্ডার গ্যাসের সাহায্যে এক-দুই ঘণ্টা কারখানা চালু থাকে।”
তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত ছাড়াও অন্যান্য শিল্পেও উৎপাদন কমেছে। ১৫ দিন ধরে নারায়ণগঞ্জ বন্দর উপজেলার কামতাল এলাকার বাসার পেপার মিলের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে উৎপাদন কমে গেছে। মিলটির প্রতিদিন উৎপাদন ২৫ টন থেকে ৫ টনে নেমেছে।
বাসার পেপার মিলের ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, পাইপলাইনে গ্যাস নেই। আবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। তিনি জানান, “এভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি টন পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে।”
গ্যাস–সংকটে অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এরপরও উৎপাদন কমেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ—এমন তথ্য দিয়ে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সহসভাপতি মোরশেদ সারোয়ার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “সময়মতো পণ্য পাঠানো না গেলে মূল্যছাড় (ডিসকাউন্ট) দিতে হবে। আবার আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হলে ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে। দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানান তিনি।”
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন মুক্তকণ্ঠের গাজীপুর প্রতিনিধি মাসুদ রানা, নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি মুজিবুল হক ও নরসিংদী প্রতিনিধি প্রণব কুমার দেবনাথ]