দীর্ঘ ২১ মাস উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর নীতি সুদহারের বাঁধন কিছুটা আলগা করল বাংলাদেশ ব্যাংক। রেপো রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমতে পারে এবং ধীরে ধীরে ঋণের সুদ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ঋণের সুদ কমলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে নীতি সুদহার কমানোর মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব নিয়ে সতর্কতা আছে। তাঁরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না এলে মানুষের প্রকৃত আয় কমতে পারে। এতে ভোগব্যয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—সবকিছুর ওপর চাপ পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটারি পলিসি কমিটির (এমপিসি) ১৩তম সভায় নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর সিদ্ধান্ত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। আগামী রোববার থেকে নতুন নীতি সুদহার কার্যকর হবে। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, দেশি বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকার ও উদ্যোক্তাদের আশা—বেসরকারি খাতে ঋণের সুদের হার কমলে ঋণের প্রবাহ বাড়তে পারে। এতে অর্থের সরবরাহ বাড়লে নতুন করে মূল্যস্ফীতিও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করে দেন অর্থনীতিবিদরা। বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণের সুদ কমানোর লক্ষ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও, নতুন ও সম্প্রসারণের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদহারই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও স্থিতিশীলতা, করনীতি, ঘুষ-দুর্নীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি—এসব বিষয়ও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়। এই লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগবান্ধব নীতির অংশ হিসেবে সুদহার কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় ছিল।

মো. মোস্তাকুর রহমান গভর্নর হিসেবে যোগ দিয়ে নীতি সুদহার কমানোর উদ্যোগ নেন। তবে সে সময় ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সেখান থেকে সরে আসেন। এরপর গত ৩০ জুন চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নীতি সুদহার হচ্ছে সেই সুদহারের নাম, যে সুদহারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে স্বল্প সময়ের জন্য ঋণ দেয়। ইংরেজিতে এটি রেপো রেট নামে পরিচিত, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য মুদ্রানীতির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এমনিতেই সুদহার কমে আসছিল। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদ কমানোর ফলে আরও কমে আসবে। সামষ্টিক অর্থনীতির সঙ্গে এটা কমানো হয়েছে। ফলে আমানতের সুদও কমবে। কোনো ব্যাংকের ঋণের সুদহার দশমিক ৫ শতাংশ, কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।

উল্লেখ করা হচ্ছে, উচ্চ সুদহার, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, ডলারের অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে শ্লথগতি রয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এমন প্রেক্ষাপটে নীতি সুদহার কমানো বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে মনে করছেন একাধিক উদ্যোক্তা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার ১৪ থেকে ১৫ শতাংশে উঠে গেছে। এই উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় মুনাফা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া নতুন বিনিয়োগ ব্যাংক ঋণের সুদহার ছাড়াও গ্যাস-বিদ্যুৎ প্রাপ্তি, রাজনীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তবু ব্যবসা সহজ করার বিভিন্ন পদক্ষেপের সঙ্গে ব্যাংকঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ কাজে দেবে বলে তাদের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, উচ্চ সুদের প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমেছে। গত মে মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

তবে নতুন বিনিয়োগের চিত্রও এখনো আশাব্যঞ্জক নয়। বিদায়ী অর্থবছরে ১ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ২ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে। জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৪ শতাংশ কম।

জানতে চাইলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নীতি সুদহার কমানোর সুফল সামনের দিনগুলোতে পাওয়া যাবে। আমাদের প্রত্যাশা, ধাপে ধাপে নীতি সুদহার আরও কমে আসবে। ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে হলে সুদ কমানোর পাশাপাশি ব্যবসা সহজ করতে হবে। ইতিমধ্যে ব্যবসা সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থ ও বাণিজ্যমন্ত্রী। আমরা সেগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন দেখতে চাই।’

মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগও আছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছরের জুলাইয়ের মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ১২ শতাংশ; এ সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংকোচন মুদ্রানীতি, সুদের হার বাড়ানো, কিছু নিত্যপণ্যে শুল্ক কমানোসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে হয় সাড়ে ৮ শতাংশে নেমে আসে। গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপর রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ইসরায়েল–ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সরবরাহ সংকট দেখা দেওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে। এর প্রভাবে গত এপ্রিল ও মে মাসে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। মে মাসের শেষ সপ্তাহে বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ কমার বদলে বেড়েছে বলে পর্যবেক্ষণ আছে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সিপিডির এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ৬০ শতাংশ পরিবারকে তাদের আয়ের অর্ধেক খাবার কিনতে ব্যয় করতে হয়। এই প্রভাব নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর আরও বেশি।

সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নীতি সুদহার কমানোর কারণে মূল্যস্ফীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়বে না। কারণ, মূল্যস্ফীতির বড় কারণ বাজার ব্যবস্থাপনা। উল্টো কঠোর মুদ্রানীতির কারণে ঋণের সুদহার বেড়ে গিয়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে। তাই নীতি সুদহার আরেকটু কমানো যায় কি না, সেটি দেখতে হবে।

তবে ঝুঁকি কোথায়—তা নিয়ে মতভেদও রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, সুদ বেশি হলে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমে, ফলে বাজারে অর্থের প্রবাহও কমে যায়। এতে চাহিদা কমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু তাঁদের আশঙ্কা, নীতি সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে উল্টো ঘটনা ঘটতে পারে; অর্থাৎ নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।

বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নীতি সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত এমন একটি বার্তা দিতে পারে যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনের মৌলিক কারণগুলোর খুব কমই পরিবর্তন হয়েছে। যদি খাদ্য সরবরাহের দুর্বলতা, আমদানি ব্যয়ের চাপ, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং বাজারের বিকৃতি বহাল থাকে, তাহলে কম সুদহার কেবল চাহিদা বাড়াবে। তার বিপরীতে সরবরাহ না বাড়লে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও জোরালো হতে পারে।

সেলিম রায়হান আরও বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনসক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে শক্তিশালী বেসরকারি বিনিয়োগ অপরিহার্য। আর বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসার ব্যয় কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা, অবকাঠামো ও জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো এবং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে এনে উদ্যোক্তাদের আস্থা পুনর্গঠন করতে হবে।