মক্কার কোরাইশ নেতা সোহাইল ইবনে আমরের ঘরটি কেবল সাধারণ পারিবারিক জীবনেই সীমিত ছিল না; নবুয়তের প্রথম যুগে মক্কার সামাজিক টানাপোড়েনের এক প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল। সোহাইল ইবনে আমরকে মক্কার শ্রেষ্ঠ বক্তা, প্রজ্ঞাবান বিচারক এবং সামাজিক প্রভাবের বড় প্রতীক হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। তাঁর দুই তরুণ সন্তান আবদুল্লাহ ইবনে সোহাইল ও আবু জান্দাল—দুই ভাই আলাদা পথে ধর্মীয় দ্বিধা ও বিশ্বাসের টানাপোড়েনে জড়ান।

পিতা ও গোত্রের দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্যের সঙ্গে অন্যদিকে হৃদয়ের গভীরে জেগে ওঠা আসমানি বিশ্বাসের সংঘাত শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আবদুল্লাহ ইবনে সোহাইল বদরের যুদ্ধে মুসলিমদের পক্ষে অংশ নেন এবং ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। অন্যদিকে আবু জান্দাল হোদাইবিয়ার ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহে সম্পৃক্ত হন।

যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবদুল্লাহ পুরো বদলে যান এবং চরম এক সাহসী পদক্ষেপ নেন। যেন তিনি এই অপেক্ষাতেই ছিলেন এতদিন। তিনি পিতার বাহিনী ত্যাগ করে এক লহমায় মুসলিম বাহিনীতে যোগ দেন।

বড় ভাই আবদুল্লাহ সত্যের আহ্বানে সাড়া দিতে দেরি করেননি। তাঁর পিতা সোহাইল ইবনে আমর মক্কার সামাজিক প্রভাবের একটি বড় প্রতিষ্ঠান হওয়ায়, আবদুল্লাহ যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন—তখন শুধু পারিবারিক মতাদর্শ থেকে সরে আসাই নয়, নিজের নিরাপত্তার বলয় থেকেও বেরিয়ে এসে চরম ঝুঁকির মধ্যে দাঁড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।

আবদুল্লাহ দ্বিতীয়বার আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। পরে মক্কায় ফিরে এলে পিতা তাঁকে বন্দি করে কঠোর শারীরিক নির্যাতন শুরু করেন এবং ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করার চেষ্টা চালান। এ অবস্থায় আবদুল্লাহ জীবন রক্ষার্থে ইমান ত্যাগের ভান করে যান।

বর্ণনায় এসেছে—এইভাবে পিতার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে গিয়ে শক্তি অপচয় করেননি; বরং ভেতরের বিশ্বাসকে আগলে রাখেন উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায়। হিজরি দ্বিতীয় সনে বদরের যুদ্ধে পিতা তাঁকে মক্কার কাফেরদের সঙ্গে জোর করে নিজের বাহিনীর সঙ্গী করে নেন।

বদরের সেই মুহূর্তে বন্দিদশা ও ইসলামের প্রতি গোপন ভালোবাসার ভেতরে জমে থাকা আবেগ একটিমাত্র পদক্ষেপে ‘ঐতিহাসিক স্বাধীনতায়’ রূপ নেয়। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ৩/৪০২, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৬৮)

বদরে আবদুল্লাহ নিজের স্বাধীন পরিচয় প্রকাশ করার সময় ছোট ভাই আবু জান্দাল তখনও মক্কায় পিতার শিকলে বন্দি ছিলেন। আবু জান্দালের সংগ্রাম ছিল আরও বেদনাদায়ক; যে ব্যক্তিকে তিনি পিতা হিসেবেই জানতেন, সেই একই ব্যক্তি তাঁর ওপর নির্মম অত্যাচারী হয়ে ওঠেন।

হিজরি ষষ্ঠ সনে হোদাইবিয়ায় মহানবী (সা.) ও কোরাইশদের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় কোরাইশদের পক্ষে প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন সোহাইল ইবনে আমর। এ সময় বন্দিশালা থেকে শিকল টেনে টেনে রক্তাক্ত অবস্থায় হোদাইবিয়ার ময়দানে উপস্থিত হন আবু জান্দাল—বর্ণনায় এমনটাই উঠে আসে।

তিনি মুসলিম ভাইদের কাছে সাহায্য ও মুক্তির জন্য আকুতি জানান। চুক্তির শর্তে ছিল মক্কা থেকে পালিয়ে আসা মুসলিমদের ফিরিয়ে দিতে হবে। পিতা সুহাইল জেদ ধরলেন—আবু জান্দালকে মক্কায় ফিরিয়ে না দিলে চুক্তি হবে না।

এ বর্ণনায় বলা হয়, আবু জান্দাল মুসলিম ভাইদের কাছে সাহায্য ও মুক্তির জন্য আকুতি জানান। অন্যদিকে চুক্তির শর্ত ছিল মক্কা থেকে পালিয়ে আসা মুসলিমদের ফিরিয়ে দিতে হবে। পিতা সুহাইল জেদ ধরেন—আবু জান্দালকে মক্কায় ফিরিয়ে না দিলে চুক্তি হবে না। যদিও তখনো চুক্তি সম্পন্ন হয়নি।

এ অবস্থায় মহানবী (সা.) চুক্তি রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেন। আবু জান্দালকে বলা হয়, “ধৈর্য ধারণ করো এবং সওয়াবের আশা রাখো। আল্লাহ তোমার ও তোমার মতো অসহায়দের জন্য অতি শীঘ্রই মুক্তির কোনো পথ খুলে দেবেন।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৩১)

নির্দেশ পাওয়ার পর ব্যাকুল আবু জান্দাল চোখের জলে পুনরায় শিকল পরে পিতার সঙ্গে মক্কায় ফিরে যান। এই দৃশ্যটি হোদাইবিয়ার ময়দানে পুরো মুসলিম কাফেলার জন্য হৃদয়বিদারক পরীক্ষা হিসেবে বর্ণিত। তবে আবু জান্দাল ভেঙে পড়েননি; নবীজির আদেশকে তিনি আত্মিক শক্তিতে রূপান্তর করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ৩/৩১৮, মুস্তফা আল-বাবি আল-হালাবি, কায়রো, ১৯৫৫)

পরবর্তী সময়ে আবু জান্দাল মক্কা থেকে পালিয়ে গিয়ে লোহিত সাগরের উপকূলে আবু বাসিরের মুক্ত দলে যুক্ত হন। বর্ণিত আছে, সেখানে তারা কোরাইশদের বাণিজ্য কাফেলার ওপর এমন কৌশলগত চাপ তৈরি করেন যে শেষ পর্যন্ত কোরাইশরাই নবীজিকে অনুরোধ করেন চুক্তির ওই শর্তটি বাতিল করতে।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়—সাহাবিরা আবু জান্দালসহ অন্য মুসলিমদের মদিনায় ডেকে নিতে চেয়েছিলেন। আবু জান্দালের ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা সংকটময় সময়ে শুধু আবেগের ওপর ভর করে নয়, প্রজ্ঞার মাধ্যমে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনার কথাও বর্ণনায় উঠে আসে। (আল-আসকালানি, আল-ইসাবাহ ফি তাময়িজিস সাহাবাহ, ৪/৯৮, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৫)

৮ হিজরিতে ক্ষমতার চিত্র বদলে যায়। পিতা সোহাইল একসময় নিজের সন্তানদের নিপীড়ন করেছেন এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েছেন—এর প্রেক্ষাপটে মক্কা বিজয়ের পর তিনি প্রাণের ভয়ে নিজের ঘরে আত্মগোপন করেন। এরপর তিনি বড় ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে সোহাইলের কাছে বার্তা পাঠান—নবীজির কাছ থেকে প্রাণভিক্ষা এনে দেওয়ার জন্য।

এমন দাবি বা সিদ্ধান্তের পর আবদুল্লাহ বা আবু জান্দাল—দুইজনই অতীত নির্যাতনের প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা করেননি। বর্ণনায় বলা হয়, আবদুল্লাহ তৎক্ষণাৎ নবীজির দরবারে হাজির হয়ে পিতার জন্য সাধারণ ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং মহানবী (সা.) আবেদন মঞ্জুর করেন।

পিতার কাছে এই অভয়বার্তা নিয়ে যখন আবদুল্লাহ উপস্থিত হলেন, তখন প্রতাপশালী কোরাইশ নেতা সুহাইলের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সুহাইল প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন যে তাঁর সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতি সৎ ও অনুগত ছিল।

বর্ণনায় আরও বলা হয়, পিতার কাছে এই অভয়বার্তা নিয়ে যখন আবদুল্লাহ উপস্থিত হলেন, তখন প্রতাপশালী কোরাইশ নেতা সুহাইলের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। সুহাইল প্রকাশ্যে স্বীকার করলেন যে তাঁর সন্তানরা ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতি সৎ ও অনুগত ছিল।

পারিবারিক ও ধর্মীয় বিরোধ থাকা সত্ত্বেও সন্তানরা পিতার জীবন রক্ষায় এগিয়ে এসেছিল—এই বিষয়টি মুহূর্তের মধ্যে সোহাইলের কঠোরতাকে নরম করে দেয়। এরপর তিনি স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে একনিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। (আত-তাবারি, তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক, ৩/৩৩০, দারুত তুরাস, বৈরুত, ১৯৬৭)

নবীজির ইন্তেকালের পর যখন পুরো আরব উপদ্বীপে ধর্মত্যাগের কঠিন সংকট তৈরি হয়েছিল, তখনও এই সোহাইলকে মক্কার জনগণকে ইসলামে অবিচল রাখতে কাবার প্রাঙ্গণে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিতে দেখা যায়—বর্ণনায় এমনটাই উল্লেখ আছে। দুই ছেলের ত্যাগ ও সুমহান আচরণের মাধ্যমে ধর্মবিরোধী থেকে তিনি মুসলমানদের দিশারীতে পরিণত হন বলে বর্ণিত। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৪/১৬৫, দারু হাজার, কায়রো, ১৯৯৭)

ছেলে আবদুল্লাহ পরে খলিফা আবু বকর (রা.)-এর যুগে ভণ্ড নবীর বিরুদ্ধে সংঘটিত ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। আর আবু জান্দাল পিতার সঙ্গে সিরিয়ার সীমান্তে ইসলাম প্রচারে অংশ নেন।