একটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রের আসল শক্তি শুধু আইন প্রয়োগের ক্ষমতায় নয়, ভিন্নমতকে কতটা নম্রতা ও সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা হয়, তার মধ্যেও নিহিত।

একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে ভয় পায় না, বরং সেটিকে নাগরিকদের উদ্বেগ ও আশঙ্কার আয়না হিসেবে দেখে। কিন্তু দুর্বল শাসনব্যবস্থা সেই আয়নাকে শত্রু ভেবে লাঠিপেটা আর দমন-পীড়নের মাধ্যমে ভেঙে ফেলতে চায়। আর সেই ভাঙা কাচের টুকরাই শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের রক্তাক্ত করে।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের রাজধানীর রাস্তায় যা দেখা গেছে, তা গণতন্ত্রের দুর্বল হয়ে পড়ার এক উদ্বেগজনক চিত্র। অনশনরত সোনম ওয়াংচুকের প্রতীকী নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রধানত তরুণ ছাত্রছাত্রী ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীরা তাঁদের ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত নানা প্রশ্নে জবাবদিহি চেয়ে গতকাল মঙ্গলবার রাস্তায় নেমেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল সংলাপ নয়, বরং দমন। সহিংসতা ও গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাঁদের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছে।

.
যখন সরকার সংসদের দরজা বন্ধ করে দেয় এবং রাস্তায় লাঠিপেটা করে, তখন একটি বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি হয়। ভিন্নমত চিরতরে চাপা পড়ে না, বরং মানুষের ভেতরে জমতে থাকে ক্ষোভ, হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা। যন্তর মন্তরে যেসব ছাত্রী আমাকে বলছিলেন, কীভাবে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে নির্দয়ভাবে আঘাত করা হয়েছে, তাঁদের কথায় সেই হতাশা স্পষ্ট।
.

এ সময় লাঠিচার্জে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় নিরস্ত্র মানুষের ভিড়। প্রায় ১০০ তরুণ-তরুণীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। তাঁদের কারও হাড় ভেঙেছে, কারও শরীরে গভীর আঘাত লেগেছে, কারও মনে ভয়াবহ ধাক্কা লেগেছে। নিরস্ত্র যুবকদের ওপর পুলিশের লাঠি চালানোর দৃশ্য এবং তার সঙ্গে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া দেখে মনে হয়েছে যেন একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র নয়, বরং কঠোর পুলিশি শাসন চলছে।

জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে আমি এক তরুণের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তাঁর মাথা ও চোখের নিচে লাঠির আঘাত লেগেছিল। রক্ত থামাতে বড় ব্যান্ডেজ বাঁধা হয়েছিল। তিনি তখনো আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি বিলি করছিলেন। এমন দৃশ্য দেখে হৃদয় ভেঙে যায়। যারা আইন রক্ষার দায়িত্বে, তারা কীভাবে এমন আচরণ করতে পারে?

বিরোধী দলের নেতার প্রতি এবং পরিবেশকর্মী-শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের অনশনকে কেন্দ্র করে সরকারের আচরণ সমানভাবে উদ্বেগজনক ছিল। তিন সপ্তাহ ধরে ওয়াংচুক যন্তর মন্তরে শান্তভাবে অনশন করছিলেন। ওয়াংচুকের প্রতিবাদের পদ্ধতি একেবারে গান্ধীর মতো। তিনি গান্ধীর মতোই নিজেকে কষ্ট দিয়ে রাষ্ট্রের বিবেককে জাগ্রত করতে চেয়েছেন।

.ভারতের ককরোচ আন্দোলন বাংলাদেশকে যে বার্তা দিচ্ছে.

সরকারের উচিত ছিল সংলাপের পথ বেছে নেওয়া। তাদের উচিত ছিল একজন মন্ত্রীকে সেখানে পাঠানো, লেবুপানি দিয়ে তাঁর অনশন ভাঙানোর অনুরোধ করা এবং সংসদে আলোচনা করার আশ্বাস দেওয়া। কিন্তু তার বদলে যা ঘটল, তা হলো বলপ্রয়োগ। চিকিৎসার অজুহাতে পুলিশ গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়া এই উনসত্তর বছর বয়সী আন্দোলনকারীকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পুলিশের আচরণে চিকিৎসা আর আটক—এই দুইয়ের সীমারেখা যেন মুছে গেল। এখানেও মানবিকতার বড় অভাব দেখা গেছে। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীকে যেভাবে টেনেহিঁচড়ে আটক করা হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

যে রাষ্ট্র একজন নিরস্ত্র আন্দোলনকারীর নৈতিক শক্তিকেই ভয় পায়, বুঝতে হবে সে নিজের অবস্থানেই আত্মবিশ্বাসী নয়। ছাত্রনেতাদের গ্রেপ্তার, সংগঠকদের ভয় দেখানো—সব মিলিয়ে স্পষ্ট বোঝা যায়, আন্দোলনকে দুর্বল করারই চেষ্টা চলছে। নেতৃত্ব ভেঙে দেওয়া, আন্দোলনকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা আর ধীরে ধীরে মানুষের ক্ষোভকে স্তিমিত করে দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

.

রাস্তায় যা ঘটছে, তা যেমন শাসনের ব্যর্থতা, তেমনি সংসদের ভেতরের প্রতিক্রিয়াও আরেক ধরনের ব্যর্থতা। রাজধানীর রাস্তায় যখন ক্ষোভ আর অশ্রু দেখা যাচ্ছিল, তখন সংসদে জরুরি আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। বিরোধী দল বারবার নোটিশ দিয়ে সংসদের কাজ স্থগিত করে এই পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা চেয়েছিল। কিন্তু সেসব নোটিশ খারিজ করা হয়েছে এবং নানা প্রক্রিয়াগত অজুহাত দেখিয়ে আলোচনা আটকে দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে একটি স্পষ্ট বার্তা গেছে। সেটি হলো রাস্তায় মানুষের যে কণ্ঠস্বর, তা সংসদের ভেতরে নেওয়ার বিষয়ে সরকারের আগ্রহ নেই। যখন সরকার সংসদীয় আলোচনার বাইরে নিজেকে সরিয়ে নেয়, তখন সে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কাঠামোকেই দুর্বল করে দেয়। কারণ, এই ব্যবস্থায় সরকার সংসদের কাছে দায়বদ্ধ।

যদি সংসদে জনগণের প্রতিনিধি তাঁদের সমস্যা তুলে ধরতে না পারেন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারেন, তাহলে সংসদের প্রয়োজন কী? সেটি কি শুধু সরকারি ঘোষণার বোর্ড হয়ে থাকবে, নাকি আইন পাসের যন্ত্রমাত্র?

.ভারতে মাঠ দখলের পরীক্ষায় পাস করবে কি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’.

যখন সরকার সংসদের দরজা বন্ধ করে দেয় এবং রাস্তায় লাঠিপেটা করে, তখন একটি বিপজ্জনক শূন্যতা তৈরি হয়। ভিন্নমত চিরতরে চাপা পড়ে না, বরং মানুষের ভেতরে জমতে থাকে ক্ষোভ, হতাশা ও বিচ্ছিন্নতা। যন্তর মন্তরে যেসব ছাত্রী আমাকে বলছিলেন, কীভাবে তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, কীভাবে নির্দয়ভাবে আঘাত করা হয়েছে, তাঁদের কথায় সেই হতাশা স্পষ্ট।

নীরবতা চাপিয়ে দিয়ে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা যায় না, বরং খোলামেলা বিতর্কের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সজীব রাখা যায়। সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদের ১ নম্বর খণ্ডের ‘বি’ উপধারায় শান্তিপূর্ণভাবে জমায়েত হওয়ার অধিকার মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত।

এটি রাষ্ট্রের দেওয়া কোনো দয়া নয়, স্বাধীনতাসংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত অধিকার। সেই ইতিহাস ভুলে গিয়ে যদি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের হুমকি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তা আমাদের গণতন্ত্রের মূল চেতনাকেই অস্বীকার করা হয়।

.আন্না হাজারে ও সোনম ওয়াংচুকের অনশন যে কারণে এক নয়.

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে এখনই সংশোধনের পথ নিতে হবে। নিরস্ত্র প্রতিবাদকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, গুলি ও লাঠিচার্জের ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া জরুরি। যেমন পরীক্ষার অনিয়মের ক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রয়োজন, তেমনই এখানে দায় নির্ধারণ করতে হবে। সরকারের উচিত ছাত্রদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং শুধু পুলিশি দমন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা না করা।

সংসদের স্পিকার ও সরকার পক্ষের উচিত জনগণের সমস্যাগুলো নিয়ে অবাধ আলোচনা নিশ্চিত করা। সংসদকে তার মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে, এটাই তার মূল কাজ।

ভারতের তরুণ প্রজন্মকে এখন দেখাতে হবে, তাদের কথা শোনার জন্য রাস্তায় রক্ত ঝরানোর প্রয়োজন নেই। তাদের কণ্ঠস্বর সংসদের ভেতরেও সমান গুরুত্ব পাবে—এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

শশী থারুর ভারতের কংগ্রেস–দলীয় সংসদ সদস্য।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ