রাজনীতিতে দলীয় সিদ্ধান্ত আর সাংবিধানিক আইনি কাঠামোর মধ্যে ফারাক কতটা, তা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি নিজ দল থেকে পদত্যাগ করেন বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট দেন, তবে তার সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দল যদি নিজেই কোনো সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করে, তবে কি তার আসনটি শূন্য হবে?
বুধবার (২২ জুলাই) বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের পর নতুন করে সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি আবারও আলোচনা ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের খোরাক হয়েছে। যদিও জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুলের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংবিধানে নেই বহিষ্কারের স্পষ্ট বিধান
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানে ‘পদত্যাগ’ ও ‘দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া’—এই দুটি শর্ত খুব স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও দল থেকে ‘বহিষ্কার’ হলে পদের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে উল্লেখ নেই। আর এই অস্পষ্টতার সুযোগেই অতীতে বিভিন্ন সংসদ সদস্য বহিষ্কৃত হওয়ার পরও পুরো মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ পেয়েছেন।
মেয়াদ পূরণ করেন গোলাম মাওলা রনি
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন থেকে আওয়ামী লীগের সাংসদ নির্বাচিত হন। পরে আওয়ামী লীগ থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়। তবে গোলাম মাওলা রনির সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল এবং তিনি ২০০৮ থেকে ২০১৪ মেয়াদের স্বাভাবিক সমাপ্তি টানেন।
লতিফ সিদ্দিকী ও মুরাদ হাসান: বিপরীতমুখী দুই নজির
দলীয় বহিষ্কার ও সংসদ সদস্য পদের টানাপোড়েনে সাম্প্রতিক সময়ের দুটি ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত।
লতিফ সিদ্দিকীর স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
২০১৪ সালে নিউ ইয়র্কে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা ও দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) যখন আইনি শুনানির প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি সংসদে আবেগঘন বক্তব্য দিয়ে নিজেই পদত্যাগ করেন। ফলে ইসির কোনো আইনি আদেশে নয়, নিজ ইচ্ছায় পদত্যাগের মাধ্যমে তার আসন শূন্য হয়।
ডা. মুরাদ হাসানের পদে বহাল থাকা
২০২১ সালে ফোনকল কেলেঙ্কারির পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয় ডা. মুরাদ হাসানকে। জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগও তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু সংবিধানে সরাসরি বহিষ্কারে পদ বাতিলের বাধ্যবাধকতা না থাকায় এবং মুরাদ হাসান নিজে পদত্যাগ না করায় তার সংসদ সদস্য পদে কোনো প্রভাব পড়েনি।
এ কারণে ২০১৮ থেকে ২০২৪ মেয়াদের পুরোটা সময়ই একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন মুরাদ হাসান।
বিগত ঘটনাপ্রবাহ ও সংবিধানের ধারা পর্যালোচনায় দল থেকে কাউকে বহিষ্কার করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার আসন শূন্য হয় না। লতিফ সিদ্দিকীর ক্ষেত্রে পদটি খালি হয়েছিল তার নিজ থেকে পদত্যাগের কারণে। মুরাদ হাসানের ক্ষেত্রে নিজে পদত্যাগ না করায় দলীয় পদ হারিয়েও তিনি পুরো মেয়াদে সংসদ সদস্য থেকে যান।
ফলে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, দলীয় সিদ্ধান্ত যতই কঠোর হোক না কেন, কোনো সংসদ সদস্য নিজে পদত্যাগ না করলে বা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোট না দিলে কেবল বহিষ্কারের অজুহাতে তার সংসদ পদ বাতিল করা আইনত বেশ জটিল।