সম্প্রতি মুক্তকণ্ঠতে প্রকাশিত মিনহাজুল ইসলামের ‘ফুটবলে রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব ও একক শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান’ কলামটি ক্রীড়াঙ্গন ও ভূরাজনীতির এক জটিল সমীকরণকে উন্মোচিত করেছে। প্রখ্যাত সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের ১৯৪৫ সালের বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য স্পোর্টিং স্পিরিট’-এর সূত্র ধরে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে ফুটবল ক্ষেত্রবিশেষে উগ্র জাতীয়তাবাদ, রেষারেষি এবং ‘রক্তপাতহীন যুদ্ধে’ রূপ নেয়।
অরওয়েলের সেই পর্যবেক্ষণ তৎকালীন শীতল যুদ্ধের প্রাক্কালে হয়তো আংশিক সত্য ছিল, কিন্তু বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক এবং বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য অর্থনীতির লেন্স দিয়ে যদি আমরা বিষয়টিকে পুনর্মূল্যায়ন করি, তবে এই বয়ানকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে ভাবার সুযোগ রয়েছে। ফুটবল কেবলই পুঁজিবাদের আগ্রাসন বা সংঘাতের মঞ্চ নয়; বরং এটি মানবমনের অবদমিত ক্ষোভের নিষ্কাশন এবং রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ব্যয় সংকোচনের এক নীরব অনুঘটক।
.অরওয়েল যেখানে ফুটবলকে ঘৃণা ও সহিংসতার আধার হিসেবে দেখেছিলেন, নোবেলজয়ী ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক ও লেখক আলব্যের কাম্যু সেখানে দেখেছিলেন একদম উল্টো চিত্র। তরুণ বয়সে আলজেরিয়ার নামী ক্লাবের গোলকিপার কাম্যু তাঁর এক বিখ্যাত উক্তিতে বলেছিলেন, ‘নৈতিকতা এবং মানুষের দায়িত্ববোধ সম্পর্কে আমি যা কিছু নিশ্চিতভাবে জানি, তার সবকিছুই আমি শিখেছি ফুটবলের কাছে।’ কাম্যুর চোখে ফুটবল মাঠ ছিল প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির চেয়েও বিশুদ্ধ এক নৈতিকতার পাঠশালা, যেখানে দলের প্রতি একাত্মতা, সহমর্মিতা ও সততার চর্চা হয়।
একইভাবে ডাচ সংস্কৃতিবিদ ইয়োহান হুইজিংহা তাঁর আকর গ্রন্থ ‘হোমো লুডেন্স’–এ দেখিয়েছেন, খেলাধুলা কোনো আদিম ও পাশবিক সংঘাত নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার আদি সংস্কৃতি গড়ে ওঠার মূল ভিত্তি। হুইজিংহার মতে, খেলার একটি নিজস্ব নৈতিক কাঠামো এবং ‘ফেয়ার প্লে’র নিয়ম থাকে, যা মানুষ স্বেচ্ছায় মেনে নেয়। ফুটবল মাঠের এই নিয়ম মেনে চলার প্রবৃত্তি মূলত সমাজকে সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করার একটি অবচেতন মহড়া।
.মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, ফুটবল গ্যালারির বা টেলিভিশনের সামনের উন্মাদনা আসলে নতুন কোনো যুদ্ধের বারুদ তৈরি করে না; বরং তা আসল যুদ্ধকে প্রতিহত করে। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ‘ক্যাথারসিস’ বা মনস্তাত্ত্বিক রেচন তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের ভেতরের সহজাত আগ্রাসী প্রবৃত্তি বা ক্ষোভকে যদি সমাজস্বীকৃত কোনো উপায়ে নিষ্কাশন (ভেন্টিং) করতে না দেওয়া হয়, তবে তা সমাজে বড় ধরনের সহিংসতা বা অপরাধের জন্ম দেয়। ফুটবল ম্যাচগুলো মূলত কোটি কোটি মানুষের সেই অবদমিত মানসিক শক্তির একটি ‘সেফটি ভালভ’ হিসেবে কাজ করে। ৯০ মিনিটের একটি তীব্র উত্তেজনাকর ম্যাচ শেষে মানুষের ভেতরের মনস্তাত্ত্বিক আগ্রাসনের যে অবমুক্তি ঘটে, তা সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বে ফুটবলের অতি-বাণিজ্যিকীকরণ এবং বিলিয়ন ডলারের লেনদেন নিয়ে সমালোচনা হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই বিশাল বাণিজ্যের আড়ালে যে গভীর স্বাস্থ্য অর্থনৈতিক অবদান রয়েছে, তা আমরা প্রায়ই এড়িয়ে যাই। জনস্বাস্থ্য ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি বহুল আলোচিত ধারণা হলো ‘কস্ট কনটেইনমেন্ট’ বা ব্যয় নিয়ন্ত্রণ।
.ফুটবল যখন একটি বৈশ্বিক সংস্কৃতিতে রূপ নেয়, তখন তা তৃণমূল স্তরে কোটি কোটি তরুণ ও সাধারণ মানুষকে ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি বা শারীরিক পরিশ্রমে উদ্বুদ্ধ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ফুটবল বা শারীরিক চর্চা হৃদ্রোগ, স্থূলতা এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগগুলোর (নন–কমিউনিকেবল ডিজিজ) ঝুঁকি বহুগুণ কমিয়ে দেয়।
এর চেয়েও বড় প্রভাব পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে। ফুটবলের মতো দলীয় খেলা মানুষের একাকিত্ব দূর করে, সোশ্যাল ক্যাপিটাল বা সামাজিক পুঁজি বৃদ্ধি করে এবং তরুণ সমাজকে মাদকাসক্তি, অপরাধপ্রবণতা ও নেতিবাচক চিন্তা থেকে দূরে রাখে। একটি কস্ট-ইফেক্টিভনেস অ্যানালাইসিস বা ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ফুটবলের পেছনে রাষ্ট্র বা সমাজের যে অর্থ বিনিয়োগ বা বাণিজ্য হয়, তা আসলে চিকিৎসা খাতের কোটি কোটি টাকার ভবিষ্যৎ ব্যয় সাশ্রয় করে। অর্থাৎ ফুটবলের এই তথাকথিত পুঁজিবাদী বাণিজ্য মূলত জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষাকবচ এবং রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা ব্যয় সংকোচনের (কস্ট-কনটেইনমেন্ট) অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
.ক্রীড়া কূটনীতির ইতিহাসে উগ্রতার নজির যেমন আছে, তেমনি এর চেয়েও বড় সত্য হলো ম্যান্ডেলার সেই অমোঘ বাণী। নেলসন ম্যান্ডেলা ২০০০ সালে লরেয়াস অ্যাওয়ার্ডসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার এমন ক্ষমতা খেলাধুলার আছে, যা খুব কম জিনিসেরই থাকে।’ আইভরি কোস্টের কিংবদন্তি ফুটবলার দিদিয়ের দ্রগবা ও তাঁর দলের একটি মাত্র আকুল আবেদন যেভাবে দেশটির পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিল, তা অরওয়েলের তত্ত্বকে সরাসরি নাকচ করে দেয়।
তাই ফুটবলের মুখোশ পরা সমর্থকের উগ্রতার আড়ালে যে গভীর মানবিক সংযোগ, মানসিক রেচন এবং একটি সুস্থ ও সাশ্রয়ী সমাজ বিনির্মাণের নীরব অর্থনৈতিক লড়াই চলছে, তাকে অস্বীকার করা যাবে না। অরওয়েলের ১৯৪৫ সালের সেই অন্ধকার লেন্স সরিয়ে আজকের ২০২৬ সালের বাস্তবতায় দাঁড়ালে স্পষ্ট দেখা যায়—ফুটবল কেবল গুলি ছাড়া যুদ্ধ নয়; এটি হলো যুদ্ধ ও অসুস্থতার বিরুদ্ধে মানুষের এক নান্দনিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ।
ইমদাদুল হক তালুকদার মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
মতামত লেখকের নিজস্ব