চাঁদে নেমে কী এমন কাজ করেছিলেন এক নভোচারী, যা নাসা ওই সময় প্রকাশ করেনি, ফেরার পর কেন ২১ দিন কোয়ারেন্টিনে রাখা হলো তিন নভোচারীকে, উপহার পাঠানো চাঁদের শত শত পাথরই–বা আজ কোথায়? কয়েক দশক পর জানা গেছে অ্যাপোলো-১১ মিশনের এমন সব প্রশ্নের উত্তর।

.

চাঁদে অবতরণের শেষ কয়েক মিনিট। নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনকে নিয়ে লুনার মডিউল ‘ইগল’ দ্রুত নিচে নামছে। ঠিক তখন কম্পিউটারের ডিসপ্লেতে ভেসে ওঠে এক রহস্যময় সংকেত—১২০২। বুঝে ওঠার আগেই প্রশ্ন উঠল, অভিযান চালিয়ে যাওয়া যাবে, নাকি থামাতে হবে।

এদিকে লুনার মডিউলের অবতরণ ইঞ্জিনের জ্বালানিও ফুরিয়ে আসছে, রেডিওতে বারবার কেটে যাচ্ছে যোগাযোগ, হিউস্টনের তরুণ প্রকৌশলীদের হাতে সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ড। এই নাটকীয় অবতরণের আগে হোয়াইট হাউসেও তৈরি হয়ে যায় আরেক ভাষণ—যদি নভোচারীরা আর ফিরে না আসেন। জাতির উদ্দেশে যেটি দেওয়ার কথা ছিল প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের।

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণ ইতিহাসের পাতায় একটি নিটোল বিজয়গাথা হিসেবে লেখা থাকলেও এর নেপথ্যে ছিল এমন কিছু মুহূর্ত, প্রযুক্তিগত সংকট আর গোপন প্রস্তুতি, যা প্রকাশ্যে আসতে সময় লেগেছে কয়েক দশক।

.

অবতরণের সংকটাপন্ন মুহূর্ত

চাঁদে নামার শেষ ধাপে ইগলের নির্দেশক কম্পিউটারে একের পর এক সতর্কবার্তা বা ‘প্রোগ্রাম অ্যালার্ম’ বেজে ওঠে, যা পরিচিত হয় ‘১২০২’ ও ‘১২০১’ কোড নামে। পরে জানা যায়, এর অর্থ ছিল, কম্পিউটারের ওপর তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি কাজের চাপ পড়ে গিয়েছিল।

হিউস্টনের মিশন কন্ট্রোলে থাকা প্রকৌশলীদের তখন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে, নাকি বাতিল করা হবে। তবে এ অবতরণের আগে করা নাসার সিমুলেশনে (বাস্তব অভিযানের আগে অনুশীলনে/মহড়ায়) দেখা গিয়েছিল এই ধরনের অ্যালার্ম সত্ত্বেও নিরাপদে অবতরণ সম্ভব। আর সে কারণেই মিশন কন্ট্রোল অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

অবতরণের ঠিক আগে আরেকটি সমস্যা দেখা দেয়। মিশন কন্ট্রোল ও মহাকাশযানের মধ্যে রেডিও যোগাযোগ বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। কমান্ড মডিউল থেকে লুনার মডিউল আলাদা হওয়ার পরপরই মিশন কন্ট্রোল রেডিও সংযোগ নিয়ে সমস্যায় পড়ে, আর ফ্লাইট ডিরেক্টর জিন ক্রানৎস পরে স্মরণ করেছিলেন যে অবতরণের নির্দেশ দেওয়ার পরপরই আবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমন অসম্পূর্ণ তথ্যের মধ্যেও তাঁকে প্রতি মুহূর্তে ঠিক করতে হচ্ছিল, ‘যা তথ্য হাতে আছে, তা কি অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট, নাকি অভিযানটি বাতিল করা উচিত।’

.

গ্রিনিচের রাজকীয় জাদুঘর প্রকাশিত অবতরণের প্রকৃত রেডিও রেকর্ডিং অনুযায়ী, এ সময়ে সংকেত মাঝেমধ্যেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল এবং তথ্য হারিয়ে যাচ্ছিল (যাকে মিশন কন্ট্রোল বলেছিল ‘ডেটা ড্রপ-আউট’)। ‘ক্যাপসুল কমিউনিকেটর’ চার্লি ডিউক সতর্ক অ্যালার্মের জবাবে সংক্ষেপে জানিয়ে দেন যে অভিযান চালিয়ে যাওয়া যাবে।

উদ্ধার হওয়া অডিও থেকে জানা যায়, অবতরণের একেবারে শেষ পর্যায়ে ইগলের জ্বালানি বিপজ্জনকভাবে কমে আসছিল। চাঁদের উপরিভাগে তখন পাথর ও গর্তে ভরা এক বিপজ্জনক এলাকার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল মহাকাশযানটি।

এ সময় আর্মস্ট্রং জানালা দিয়ে দেখতে পান স্বয়ংক্রিয় অবতরণ ব্যবস্থা তাঁদের একটি পাথুরে এলাকার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর তখনই তিনি ম্যানুয়ালি (হাতে) নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মসৃণ একটি জায়গা খুঁজতে শুরু করেন।

হিউস্টন থেকে তখন নিয়মিত বিরতিতে জ্বালানির হিসাব ঘোষণা করা হচ্ছিল—প্রথমে ‘৬০ সেকেন্ড’, এরপর ‘৩০ সেকেন্ড’। নিয়ম অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে অবতরণ করতে না পারলে অভিযান বাতিল করে মাঝপথ থেকে ফিরে আসার প্রক্রিয়া শুরু করতে হতো, না হয় ক্র্যাশ বা দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে হতো।

এ উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্তেই আর্মস্ট্রং রেডিওতে জানান, ‘হিউস্টন, ট্রানকুইলিটি বেস হেয়ার। দ্য ইগল হ্যাজ ল্যান্ডেড’ (আমরা চাঁদের ট্রানকুইলিটি ঘাঁটি থেকে বলছি। আমাদের মহাকাশযান ইগল সফলভাবে চাঁদের মাটিতে অবতরণ করেছে)। ঘোষণা শোনার পর মিশন কন্ট্রোলে দীর্ঘ সময়ের চাপা উত্তেজনা মুহূর্তেই স্বস্তিতে বদলে যায়।

.

চাঁদে মানব ইতিহাসের প্রথম ধর্মীয় আচার

চাঁদে অবতরণের পর মডিউলের বাইরে বেরিয়ে আসার প্রস্তুতির ঠিক আগে বাজ অলড্রিন একটি ব্যক্তিগত কাজ সেরেছিলেন, যা নাসা তখন জনসমক্ষে প্রচার করেননি। অলড্রিন ছিলেন হিউস্টনের ওয়েবস্টার প্রেসবিটারিয়ান চার্চের একজন এল্ডার (গির্জার দায়িত্বশীল সদস্য) এবং তাঁর কমিউনিয়ন কিট তৈরি করে দিয়েছিলেন গির্জার যাজক ডিন উডরাফ। কিটটিতে ছিল একটি ছোট রুপার পাত্র, সিল করা বোতলে সামান্য পানীয় ও রুটির টুকরা।

তবে এ ধর্মীয় আচারের কথা প্রকাশ্যে সম্প্রচার করা যায়নি একটি আইনি জটিলতার কারণে। এর আগে অ্যাপোলো-৮ অভিযানে নভোচারীরা মহাকাশ থেকে বাইবেলের বাণী পাঠ করায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত নাস্তিক ও সমাজকর্মী ম্যাডালিন মারে ও’হেয়ার তীব্র আপত্তি তোলেন। তিনি দাবি করেন, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত একটি সংস্থায় (নাসা) চাকরিরত অবস্থায় নভোচারীদের এমন ধর্মীয় আচরণ মার্কিন সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নীতি লঙ্ঘন করে। পরে তিনি নাসার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন এবং দাবি জানান যেন মহাকাশে দায়িত্ব পালনকালে নভোচারীরা কোনো ধর্মীয় প্রচার বা আচার সম্প্রচার না করেন। মামলা তখনো চলমান থাকায় অলড্রিন সচেতনভাবে চাঁদে কমিউনিয়ন কিট নেওয়ার বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করা এড়িয়ে যান।

চাঁদের ধূসর মাটিতে অলড্রিন যখন আর্মস্ট্রংয়ের ১৯ মিনিট পর পা রাখলেন, চারপাশ দেখে তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিল দুটি শব্দ—‘ম্যাগনিফিসেন্ট ডেসোলেশন’ বা ‘অপূর্ব শূন্যতা’। নাসার সংরক্ষিত রেকর্ডে ওই তিনটি বাক্যাংশ—ইগলের অবতরণের ঘোষণা, আর্মস্ট্রংয়ের প্রথম পদক্ষেপের পর করা উক্তি, আর অলড্রিনের এ সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া আজও অ্যাপোলো-১১ অভিযানের প্রতীক হয়ে আছে।

.
উদ্ধার হওয়া অডিও থেকে জানা যায়, অবতরণের একেবারে শেষ পর্যায়ে ইগলের জ্বালানি বিপজ্জনকভাবে কমে আসছিল। তখন চাঁদের উপরিভাগে পাথর ও গর্তে ভরা এক বিপজ্জনক এলাকার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল মহাকাশযানটি।
.

হোয়াইট হাউসের প্রস্তুত রাখা ‘শোকবার্তা’

চন্দ্রাভিযানের রোমাঞ্চকর কাহিনির পেছনে মার্কিন সরকারের একটি অত্যন্ত গোপনীয় প্রস্তুতি লুকিয়ে ছিল, যা প্রায় তিন দশক পর জনসমক্ষে আসে।

ন্যাশনাল আর্কাইভের নথি অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ভাষণ-লেখক উইলিয়াম সাফায়ার ১৯৬৯ সালের ১৮ জুলাই একটি বিবৃতি তৈরি করেছিলেন, যা ব্যবহার করার কথা ছিল যদি নভোচারীরা চাঁদে আটকে পড়েন ও পৃথিবীতে ফিরতে না পারেন। সৌভাগ্যক্রমে সেই বিবৃতির আর প্রয়োজন হয়নি।

এ শঙ্কা মূলত ছিল অবতরণ নিয়ে নয়, বরং চাঁদ থেকে ফিরে আসার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ নিয়ে—লুনার মডিউলের আরোহণ ইঞ্জিন যদি চাঁদের মাটি থেকে উৎক্ষেপণে ব্যর্থ হতো, তাহলে কোনো উদ্ধার-ব্যবস্থাই ছিল না, আর মাইকেল কলিন্সকে একাই কমান্ড মডিউল নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসতে হতো।

সাফায়ার নিজেও পরবর্তী সময়ে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে অবতরণের চেয়ে চাঁদ থেকে ফিরে আসার এ ধাপটিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়েছিল।

.

সেই খসড়া বিবৃতিতে বলা ছিল, ‘নিয়তি হয়তো এটাই নির্ধারণ করে রেখেছে যে শান্তির খোঁজে যাঁরা চাঁদে গিয়েছিলেন, তাঁরা চাঁদের বুকেই চিরনিদ্রায় শায়িত থাকবেন। নীল আর্মস্ট্রং ও এডউইন অলড্রিন জানতেন তাঁদের উদ্ধারের কোনো আশা নেই, কিন্তু এটাও জানতেন যে তাঁদের এ আত্মত্যাগের মধ্যেই মানবজাতির জন্য আশার আলো লুকিয়ে আছে।’

নথিপত্র থেকে আরও জানা যায়, এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের দুই নভোচারীর স্ত্রীদের সঙ্গে ভাষণ দেওয়ার আগেই টেলিফোনে কথা বলার কথা ছিল।

এ ছাড়া যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পর একজন যাজককে সমুদ্রে সমাধিদানের রীতি অনুসরণে নভোচারীদের আত্মার জন্য প্রার্থনা পরিচালনার কথা পরিকল্পনায় ছিল। আশ্চর্যের বিষয়, নাসার এ মিশন সফল হওয়ার পর সাফায়ারের লেখা বিবৃতিটি প্রায় তিন দশক ধরে সাধারণ মানুষের অগোচরে ছিল।

ন্যাশনাল আর্কাইভের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে ইতিহাসবিদ জেমস মান যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে রিচার্ড নিক্সন প্রশাসনের আর্কাইভে দুর্ঘটনাক্রমে এ নথি খুঁজে পান, আর তখনই প্রথমবারের মতো বিষয়টি জনসমক্ষে আসে।

.

একটি ভাঙা সুইচ ও ফেল্ট-টিপ কলমের গল্প

অ্যাপোলো-১১ অভিযানের সবচেয়ে কম আলোচিত অথচ ভয়ংকর সংকটটি তৈরি হয়েছিল চাঁদের মাটি থেকে ফিরে আসার ঠিক আগে। চাঁদে হাঁটাহাঁটি শেষে আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন যখন আবার ইগলের ভেতরে ফিরছিলেন, তখন তাঁদের ভারী ব্যাকপ্যাকের ধাক্কায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার্কিট ব্রেকার সুইচের প্লাস্টিকের অংশ ভেঙে যায়।

এ সুইচ (ইঞ্জিন-আর্ম সার্কিট ব্রেকার) ছিল লুনার মডিউলের আরোহণ ইঞ্জিন চালু করার জন্য অপরিহার্য। সুইচটি কাজ না করলে দুই নভোচারীর পক্ষে চাঁদ থেকে ফিরে কলিন্সের কমান্ড মডিউলে ওঠা সম্ভব হতো না।

অলড্রিন নিজের বই ‘ম্যাগনিফিসেন্ট ডেসোলেশন: দ্য লং জার্নি হোম ফ্রম দ্য মুন’-এ লিখেছিলেন, লুনার মডিউলের মেঝেতে ধুলার মধ্যে ভাঙা সুইচটি পড়ে থাকতে দেখে তিনি প্রথমে হকচকিয়ে গিয়েছিলেন। বিষয়টি হিউস্টনকে জানানো হলেও সারা রাত চেষ্টা করেও মিশন কন্ট্রোল কোনো সমাধান বের করতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত অলড্রিন নিজেই একটি সমাধান খুঁজে বের করেন। ধাতব কিছু ব্যবহার করলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের ঝুঁকি ছিল বলে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি সাধারণ ফেল্ট-টিপ মার্কার কলম বেছে নেন এবং সেটির প্লাস্টিকের ডগা সুইচের ভাঙা অংশে ঢুকিয়ে চাপ দেন। বিস্ময়করভাবে এ কৌশল কাজ করে এবং ইঞ্জিনে বিদ্যুৎ-সংযোগ ফিরে আসে।

সেই ঐতিহাসিক কলমটি তৈরি করেছিল ডুরো কোম্পানি। এই কলম ও ভাঙা সুইচটি দীর্ঘকাল বাজ অলড্রিনের ব্যক্তিগত সংগ্রহে ছিল এবং বিভিন্ন সময় যুক্তরাষ্ট্রের নামী জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়েছে। তবে অতিসম্প্রতি নিউইয়র্কের সদবিস নিলামে এ অনন্য স্মারক দুটি প্রায় সাড়ে ৮ লাখ ডলারে বিক্রি হয়ে যায়।

এদিকে ওই দুর্ঘটনার পর ভবিষ্যতের অভিযানগুলোর জন্য সার্কিট ব্রেকারের ওপর প্রতিরক্ষামূলক আবরণ যুক্ত করার ব্যবস্থা নেয় নাসা, যাতে দুর্ঘটনাক্রমে আর কোনো সুইচ ভেঙে না যায়।

.
অভিযানের সবচেয়ে কম আলোচিত অথচ ভয়ংকর সংকটটি তৈরি হয়েছিল চাঁদের মাটি থেকে ফিরে আসার ঠিক আগে। চাঁদে হাঁটাহাঁটি শেষে আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন যখন আবার ইগলের ভেতরে ফিরছিলেন, তখন তাঁদের ভারী ব্যাকপ্যাকের ধাক্কায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার্কিট ব্রেকার সুইচের প্লাস্টিকের অংশ ভেঙে যায়। এ সুইচ ছিল লুনার মডিউলের আরোহণ ইঞ্জিন চালু করার জন্য অপরিহার্য।
.

চাঁদ থেকে ফেরা, কোয়ারেন্টিনে ২১ দিন

চাঁদের মাটিতে সাড়ে ২১ ঘণ্টার বেশি কাটানোর পর ২১ জুলাই আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন ‘ইগল’ নিয়ে মূল মহাকাশযান কলাম্বিয়ায় (কমান্ড মডিউল) ফিরে আসেন; যেখানে একাকী চাঁদ প্রদক্ষিণ করছিলেন মাইকেল কলিন্স।

২৪ জুলাই অ্যাপোলো-১১ প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। আর তখনই শুরু হয় তিন নভোচারীর জন্য এক ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা। নাসার হিস্ট্রি নথি অনুযায়ী, চাঁদ থেকে অজানা কোনো জীবাণু পৃথিবীতে বহন করে আনার আশঙ্কায় বিজ্ঞানীরা সতর্ক ছিলেন। তাই নভোচারীদের সরাসরি সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে আসতে দেওয়া হয়নি।

তিন নভোচারীকে সমুদ্র থেকেই এক বিশেষায়িত মোবাইল কোয়ারেন্টিন ফ্যাসিলিটিতে রাখা হয়, যা পরে হিউস্টনের লুনার রিসিভিং ল্যাবরেটরিতে স্থানান্তর করা হয়। চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখার দিন (২০ জুলাই) থেকে হিসাব করে ২১ দিন পূর্ণ হলে ১০ আগস্ট চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন, নভোচারীদের শরীরে কোনো অজানা জীবাণু নেই। তখনই তাঁদের কোয়ারেন্টিন থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

.

‘গুডউইল মুন রকস’ ও নেদারল্যান্ডসের রহস্য

অ্যাপোলো-১১ অভিযান থেকে নভোচারীরা প্রায় ২১ কেজি চাঁদের মাটি ও পাথরের নমুনা পৃথিবীতে নিয়ে আসেন। ১৯৭০-৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের প্রশাসন সদিচ্ছার প্রতীক হিসেবে অ্যাপোলো-১১ ও অ্যাপোলো-১৭ থেকে সংগৃহীত চাঁদের সামান্য কিছু কণা বিশ্বের ১৩৫টি দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যকে উপহার হিসেবে পাঠায়। এটি পরিচিতি পায় ‘গুডউইল মুন রকস’ নামে। প্রতিটি উপহারে দেশটির পতাকা এবং চালের দানার সমান আকারের কয়েকটি চন্দ্রকণা প্লাস্টিকে মুড়ে বসানো ছিল।

তবে এ উপহার নিয়ে বছরের পর বছর ধরে তদারকির ঘাটতি ছিল, আর অনেক দেশের উপহারের হদিস আজও পাওয়া যায়নি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের অনুসন্ধান অনুযায়ী, প্রায় ২৭০টি পাথর বিদেশি রাষ্ট্রকে উপহার দেওয়া হলেও এর একটি বড় অংশের বর্তমান অবস্থান অজানা—কিছু হয়তো ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে গেছে, কিছু জাদুঘরের গুদামে পড়ে আছে।

.
২৪ জুলাই অ্যাপোলো-১১ প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে। আর তখনই শুরু হয় তিন নভোচারীর জন্য এক ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা। চাঁদ থেকে অজানা কোনো জীবাণু পৃথিবীতে বহন করে আনার আশঙ্কায় বিজ্ঞানীরা সতর্ক ছিলেন। তাই নভোচারীদের সরাসরি সাধারণ মানুষের সংস্পর্শে আসতে দেওয়া হয়নি।
.

নেদারল্যান্ডসের ঘটনাটি অবশ্য এ সরকারি উপহার কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়, যদিও প্রায়ই ভুলভাবে জোড়া লাগানো হয়। নেদারল্যান্ডসকে দেওয়া ‘গুডউইল’ উপহার দুটি (অ্যাপোলো-১১ ও অ্যাপোলো-১৭ থেকে) আজও লেইডেনের মিউজিয়াম বোরহাভেতে সংরক্ষিত আছে। যেটি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল ভিন্ন একটি ঘটনা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিলেম ড্রিসকে ১৯৬৯ সালে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দেওয়া একটি ব্যক্তিগত উপহার, যা তাঁর মৃত্যুর পর রাইকস মিউজিয়াম সংগ্রহ করে এবং ২০০৬ সালে প্রথম জনসমক্ষে ভুলবশত চাঁদের পাথর হিসেবে প্রদর্শন করতে শুরু করে।

২০০৯ সালে বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় বেরিয়ে আসে রাইকস মিউজিয়ামের সেই ‘চাঁদের পাথর’ আসলে ছিল সম্ভবত অ্যারিজোনার একটি সাধারণ পাথরে রূপান্তরিত কাঠের জীবাশ্ম, যার প্রকৃত বাজারমূল্য মাত্র কয়েক ডলার। অথচ জাদুঘরটি এর অর্ধমিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিমা করে রেখেছিল। জাদুঘরের মুখপাত্র বিষয়টি স্বীকার করে বলেছিলেন, তাঁরা এটিকে একটি চমকপ্রদ কৌতূহলোদ্দীপক নমুনা হিসেবেই সংরক্ষণ করবেন। নাসা কখনো দাবি করেনি যে তারা সরাসরি ড্রিসকে কোনো চাঁদের পাথর দিয়েছিল। এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল জাদুঘরের যাচাই-প্রক্রিয়ার ঘাটতি থেকে, কোনো চুরি বা জালিয়াতি থেকে নয়।

.

অর্ধশতাব্দী পর নতুন করে চাঁদে ফেরার প্রস্তুতি

১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মানুষের প্রথম চন্দ্র পদার্পণ শুধু একটি প্রযুক্তিগত বিজয় ছিল না। এটি ছিল জীবনের ঝুঁকি, ভুল হিসাব এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বেঁচে ফেরার এক আখ্যান, যার পুরো চিত্র প্রকাশ্যে আসতে সময় লেগেছে কয়েক দশক।

অ্যাপোলো কর্মসূচি শেষ হয় ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো-১৭ অভিযানের মধ্য দিয়ে। এরপর অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় ধরে আর কোনো মানুষ চাঁদের মাটিতে পা রাখেননি।

এ দীর্ঘ বিরতির পর নাসার আর্টেমিস-২ অভিযান গত এপ্রিলে চার নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের চারপাশ ঘুরে ফিরে এসেছে। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম মানুষ পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথের বাইরে গেল। নাসা প্রশাসক জ্যারেড আইজ্যাকম্যান একে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার লক্ষ্যে ‘প্রথম পদক্ষেপ’ বলে বর্ণনা করেছেন। আর সংস্থাটি এখন ২০২৮ সালের গোড়ার দিকে আর্টেমিস-৪ অভিযানে সরাসরি চাঁদে অবতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এবার লক্ষ্য চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চল, যেখানে আগে কখনো মানুষ পা রাখেনি।

{তথ্যসূত্র: নাসা হিস্ট্রি, হিস্ট্রি ডটকম, এবিসি নিউজ, এনবিসি নিউজ ও স্পেস ডটকম}