একসময় ‘গরিবের মাছ’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পাঙাশ এখন আর ততটা সস্তা নয়। দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের সহজলভ্য প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল এই মাছটি। কিন্তু ধীরে ধীরে এটিও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খামারিদের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে মূল্যস্ফীতির কারণে প্রতিবছরই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে পাঙাশের দাম।

বছর দুই আগেও যেটি ১৫০-১৮০ টাকার মধ্যে কিনতে পারতেন, সেটিই এখন ২৪০-২৫০ টাকা কেজি। উৎপাদন ব্যয়, মাছের খাদ্য, পোনা, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত এসে পড়ছে ভোক্তার পাতে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষ গ্রন্থ-২০২৫-এর তথ্যও বলছে, ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছর বড় পাঙাশের গড় পাইকারি মূল্য কেজিপ্রতি ২৭ টাকা ৬০ পয়সা বা ১৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ বেড়ে যায়। দুই বছর আগে বড় আকারের পাঙাশের গড় পাইকারি বিক্রয়মূল্য ছিল ১৯১ টাকা ১৪ পয়সা কেজি। সেটি ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ২১৮ টাকা ৭৪ পয়সায়। ছোট আকারের পাঙাশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। এর প্রভাব খুচরা বাজারে আরও বেশি। চলতি বছরেও সে ধারাবাহিকতায় বেড়েছে পাঙাশের দাম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে আগামী দিনগুলোয় সাশ্রয়ী আমিষের সংকট আরও প্রকট হতে পারে।

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে এখন ২২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে পাঙাশ মাছ। সম্প্রতি কারওয়ান বাজার, নতুন বাজার, বাড্ডা কাঁচাবাজার ও বসুমতি বাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাছের উৎপাদন ও বিপণন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ার কারণেই মূলত এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মূলত মাছের খাবার (ফিড), পোনা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি তেল, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় খামারপর্যায়েই উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। পাশাপাশি সরবরাহ প্রক্রিয়ায় খরচ বাড়ায় খামার থেকে আড়ত এবং আড়ত থেকে খুচরা বাজার—প্রতিটি স্তরেই দাম বাড়ছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কম দামের কারণে দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠীর প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে সে সুবিধা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার অর্থ হলো খুচরা বাজারে এর প্রভাব আরও বেশি পড়বে। কারণ সেখানে পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাত ও বিক্রয় ব্যয়ও যুক্ত হয়।

শুধু পাঙাশেই সীমাবদ্ধ নয়, সাধারণ ও মধ্যবিত্তের আরেক জনপ্রিয় মাছ তেলাপিয়ার বাজারও সমান চড়া। ২০২৪ সালে পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি তেলাপিয়ার গড় দাম যেখানে ছিল ১৬০ টাকা, সেখানে গত বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬৭ টাকা ৭৬ পয়সায়। একই চিত্র সাশ্রয়ী হিসেবে পরিচিত সিলভার কার্পের বাজারেও; এক বছরের ব্যবধানে পাইকারিতে এ মাছের দামও কেজিতে প্রায় ৯ টাকা ১২ পয়সা বেড়েছে। ফলে সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য প্রোটিনের বিকল্প উৎসগুলো সীমিত হয়ে পড়ছে।

মৎস্য খাতের উদ্যোক্তাদের মতে, গত কয়েক বছরে মাছ চাষের প্রতিটি প্রধান উপকরণের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মৎস্যখাদ্যের কাঁচামাল বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, ডলারের দর বৃদ্ধি ও বাড়তি আমদানি খরচের সরাসরি চাপ এসে পড়েছে খামারিদের ওপর। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি, শ্রমিকের বাড়তি মজুরি এবং পরিবহন খরচ। সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় এতটাই বেড়ে গেছে যে, চাষিদের পক্ষে আর আগের দামে বাজারে মাছ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

কামাল আহমেদ নামের এক গার্মেন্টস কর্মী বলেন, ইদানীং বাড়তি দামের কারণে বাজারে এলে মাছ কিনতে পারি না। বাজারে সবচেয়ে কম দামের মাছও এখন বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। দর-দাম করে সবশেষে ছোট পাঙাশ মাছ কিনলাম... তাও ২৫০ টাকা কেজি দরে। আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষেরা কোনো মাছই এখন সেভাবে কিনতে পারছি না।