ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। টানা অষ্টম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী, যার ফলে দেশটির একটি নির্মাণাধীন পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে হামলা চালিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের ‘বিপর্যয়কর জবাব’ দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরানি সামরিক বাহিনী।

এই উত্তেজনার মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ওই স্মারকের শর্তাবলি লঙ্ঘন করেছে। তবে নিউজনেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই পদক্ষেপে তাঁর কিছু আসে যায় না। উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে ওই সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল।

স্মারকের শর্ত অনুযায়ী হামলা বন্ধ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে ইরানের ব্যবস্থাপনায় জাহাজ চলাচলের বিষয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নির্ধারিত পথের বাইরে জর্ডান উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচল করাতে চাইলে সংঘাত নতুন রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতে গতকাল হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানি বাহিনী। তাদের মতে, চারটি জাহাজ হরমুজের ‘অনিরাপদ’ রুট ব্যবহার করছিল। সতর্কবার্তায় দুটি জাহাজ পিছু হটলেও অন্য দুটি জাহাজ ‘দুর্ঘটনার’ শিকার হয়, তবে সেগুলোতে হামলা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নিউজনেশনকে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন যে, পরমাণু অস্ত্র তৈরি থেকে ইরানকে বিরত রাখাই তাঁদের মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য সামনে রেখে গত শনিবার অষ্টম রাতের হামলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের দারখোভিন অঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ একেবারে শুরুর দিকে ছিল এবং তারা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। অন্যদিকে, ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থা একে ‘সন্ত্রাসী’ হামলা আখ্যা দিয়ে এক বিবৃতিতে বলেছে, "পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। যুক্তরাষ্ট্রের চরিত্রই হলো আইনের বাইরে গিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখানো।"

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, শনিবার রাতের হামলার উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সক্ষমতা হ্রাস করা এবং জর্ডানে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলার জন্য ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরকে শাস্তি দেওয়া। এই অভিযানে পরমাণুকেন্দ্রের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চের সিরিক শহর এবং ইরাক সীমান্তবর্তী শাদেগান শহরের কাছেও হামলা চালানো হয়েছে।

জবাবে তেহরান কুয়েতের আল আদিরি ক্যাম্প ও আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, গতকাল রোববার দ্বিতীয় দিনের মতো তাদের একটি পানি পরিশোধনাগারে হামলা হয়েছে। পাশাপাশি জর্ডানে সাইরেনের শব্দ শোনা গেছে এবং দেশটির বাহিনী ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার কথা জানিয়েছে।

ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকলে জবাব আরও বিপর্যয়কর হবে। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, "যুক্তরাষ্ট্রের হামলার সময় প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ইরানের জনগণের মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য।"

যুদ্ধের আশঙ্কা ঘনীভূত হওয়ার মাঝে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইসরায়েলও ইরানে হামলা চালিয়েছিল, তবে ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির পর তারা হামলা বন্ধ রাখে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে আল-জাজিরাকে বলেন মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের গবেষক রস হ্যারিসন, ট্রাম্প হয়তো হামলা আরও জোরদার করতে পারেন এবং প্রতিশোধ নিতে পারেন। তবে সামরিক পদক্ষেপ কেবল তখনই নেওয়া উচিত, যখন তার মাধ্যমে কোনো উদ্দেশ্য হাসিল হয়। মার্কিন হামলা ইরানিদের মনোবল আরও দৃঢ় করতে পারে, যা ট্রাম্পের উদ্দেশ্য সাধনে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।