মুক্তকণ্ঠের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ময়মনসিংহ জেলায় নারী ও শিশু সহিংসতার যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কেবল এই জেলাতেই ১০৩টি ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬৪ জন শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট ঘটনার প্রায় ৬৩ শতাংশই শিশু-কিশোরীদের ওপর সংঘটিত। গত বছরের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, শিশু ধর্ষণের ঘটনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতাশাজনক হলো বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি। উল্লিখিত ১০৩টি ধর্ষণের মামলার মধ্যে মাত্র ১১টির অভিযোগপত্র এবং মাত্র ২টি মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিচার সম্পন্ন হয়েছে মাত্র একটি মামলায়। অন্যদিকে, গত বছরের ১০৬টি মামলার একটিরও এখনো রায় হয়নি। ময়মনসিংহ জেলার এই তথ্য স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে যে, রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং বিচার পাওয়ার মৌলিক নাগরিক অধিকার প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে।
কেবল ময়মনসিংহ নয়, পুরো দেশের চিত্রই similarly হতাশাজনক। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) সম্প্রতি জানিয়েছে, গত ছয় মাসে ১ হাজার ৬২১ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের তথ্যমতে, এক বছরে নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পদ্ধতিগত প্রতিবন্ধকতা এবং উক্ত প্রতিবন্ধকতাসমূহ নিরসনের কার্যকর উপায় চিহ্নিতকরণ’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিচারব্যবস্থার এই নাজুক দশার প্রমাণ এই পরিসংখ্যানগুলো। মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে মেডিক্যাল ও ডিএনএ রিপোর্টের দীর্ঘসূত্রতাকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, কোনো ঘটনা গণমাধ্যমে আলোচিত না হলে তদন্ত প্রক্রিয়া থেমে যায়, যা এই সংবাদেও পরিলক্ষিত হয়েছে।
বিচারপ্রক্রিয়ার এমন দীর্ঘসূত্রতার ফলে বাংলাদেশে এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যার প্রতিফলন ময়মনসিংহ জেলার নারী ও শিশু সহিংসতার চিত্রে দেখা যাচ্ছে। এই বিচারহীনতা সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থা তৈরি করছে, যার বহিঃপ্রকাশ প্রায়ই নাগরিক পরিসরে দেখা যায়।
মূলত এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই নারী ও শিশুদের প্রতি অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধির প্রধান কারণ। বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য নয়। মেডিক্যাল ও ডিএনএ রিপোর্ট প্রদানের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ আধুনিকায়ন করে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। একইসঙ্গে প্রয়োজনীয় আইনি ও কাঠামোগত সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।