ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অনশনরত লাদাখের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবাদী সোনম ওয়াংচুককে শনিবার সকালে জোর করে তুলে নিয়ে গেছে দিল্লি পুলিশ। অনশনের ২১তম দিনে তাঁকে দিল্লির সফদরজঙ্গ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত এই আন্দোলনকর্মী গত শুক্রবার জানিয়েছিলেন, শারীরিক দুর্বলতা থাকলেও তিনি মানসিকভাবে শক্ত আছেন এবং আগামী সোমবারের সংসদ অভিযানে অংশ নেবেন। তবে তার আগেই যন্তর মন্তরের ধরনাস্থল থেকে তাঁকে জবরদস্তি সরিয়ে নেওয়া হয়।

এই ঘটনার পরপরই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ জানানো হয় যে, সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেছেন। আগামী সোমবার পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ‘চলো সংসদ’ অভিযান চলবে। একটি ভিডিও বার্তায় অভিজিৎ দিপকে বলেন, “সোনম স্যারকে জবরদস্তি তুলে নেওয়ার প্রতিবাদে দেশের সর্বত্র ছাত্রসমাজ যেন বিক্ষোভে শামিল হন।”

অভিজিৎ আজ সকালে অভিযোগ করেন যে পুলিশ তাঁকে মারধর করে আটকে রেখেছে, যদিও পুলিশ এই দাবি অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, দিল্লি পুলিশ ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে জানিয়েছে, হাইকোর্টের নির্দেশ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীদের বাধা দেওয়ার কারণে সামান্য ধস্তাধস্তি হলেও পুলিশ সংযত থেকে কাজ শেষ করেছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের শান্তিপূর্ণভাবে ধরনাস্থল ত্যাগ করার অনুরোধ জানানো হয়।

উল্লেখ্য, নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ও সিবিএসইর দুর্নীতির প্রতিবাদে সিজেপি-র ব্যানারে ছাত্রসমাজ ২৮ দিন ধরে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ চালাচ্ছিল। তাঁদের দাবি শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা, যা সমর্থন করে সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন।

গত বৃহস্পতিবার দিল্লি হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সোনম ওয়াংচুকের জীবনরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করতে। পুলিশের এই অভিযানটি সেই নির্দেশনার প্রেক্ষাপটে সংসদের অধিবেশন শুরুর আগে চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সাদা পোশাকে আসা পুলিশ সদস্যরা সাদা চাদর দিয়ে সোনম ওয়াংচুককে আড়াল করে বিছানাসুদ্ধ তাঁকে দ্রুত সরিয়ে নিয়ে যান। পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ হতে ১০ মিনিটের মতো সময় লাগে।

৫৯ বছর বয়সী শিক্ষাবিদের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো দ্রুত সফদরজং হাসপাতালে পৌঁছান। সকাল সোয়া নটা নাগাদ তিনি ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে লেখেন, “আমি সফদরজং হাসপাতালে রয়েছি যেখানে সোনম ওয়াংচুককে ভর্তি করা হয়েছে। আমাকে, আমাদের পরিবার এবং যে চিকিৎসকেরা গত ২০ দিন ধরে সোনমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন তাঁদের সম্মতি ছাড়া যেন কোনোভাবে তাঁর পরিচর্যা করা না হয়। জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টাও যেন না করা হয়।”

দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রসমাজ বিক্ষোভ চালালেও সরকারি কোনো প্রতিনিধি তাঁদের সঙ্গে কথা বলেননি। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস দল সক্রিয় হয়ে ওঠে। দলের শীর্ষ নেতা কে সি বেনুগোপাল বিবৃতি দেন এবং রাজ্যসভা সদস্য পবন খেরা ধরনাস্থলে গিয়ে সোনম ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। পবন খেরা বলেন, “এই হৃদয়হীন সরকারের কাছ থেকে কিছু আশা করা অন্যায়। এরা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বার্তা শোনে না। এদের জন্য প্রাণের ঝুঁকি নেওয়ার দরকার নেই।”

গত শুক্রবার কংগ্রেসের সংসদীয় দলের বৈঠকে সোনিয়া গান্ধী ১৯৮৪ সালের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সোনমের বাবা সোনম ওয়াংগিয়াল যখন লাদাখিদের তফসিল জনজাতিভুক্ত করার দাবিতে অনশন করেছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁর সঙ্গে দেখা করে দাবি পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে রাজীব গান্ধী সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছিলেন।

বিশ্লেষকদের মতে, সংসদীয় অধিবেশনের প্রাক্কালে সরকারের ওপর চাপ বাড়ায় হাইকোর্টের নির্দেশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সোনম ওয়াংচুককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, যাতে ছাত্রদের সংসদ অভিযান বাধাগ্রস্ত হয়। তবে সিজেপি তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছে।