জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রশক্তির বিক্ষোভের মুখে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের কক্ষ থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন অর্থনীতির অধ্যাপক আইনুল ইসলাম। জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী হিসেবে তাঁকে উল্লেখ করে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিনের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন দুই ছাত্রসংগঠনের নেতারা।

বৃহস্পতিবার বেলা দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে নিজের কক্ষে ছিলেন অধ্যাপক আইনুল ইসলাম। এ সময় ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তির নেতা–কর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে তাঁকে কক্ষ থেকে চলে যেতে বলেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে এক পর্যায়ে অধ্যাপক আইনুল ইসলাম ওই স্থান ত্যাগ করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আজ জুলাই শহীদ দিবস ছিল। শিক্ষার্থীদের সেন্টিমেন্ট (আবেগ) অন্য রকম ছিল।  ঘটনার সময়ে আমি ক্লাসে ছিলাম। আমাকে দুজন শিক্ষক সেখান থেকে কল করেন। একই সময়ে উপাচার্যও কল করেন। তৎক্ষণাৎ আমি সেখানে উপস্থিত হই। যেহেতু তিনি শিক্ষক, তাই আমি তাঁকে নিরাপদে ক্যাম্পাস থেকে বের হওয়ার ব্যবস্থা করি। আমি নিজে গাড়িতে তুলে দিয়েছি।’

অধ্যাপক আইনুল ইসলাম একসময় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও নীল দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে ছিলেন।

অধ্যাপক আইনুল ইসলামকে ৭ জুলাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১২ জুলাই তিনি এই দায়িত্বে যোগ দেন। তাঁর এই পদে যোগদানের বিরোধিতা করে গত রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি দেন কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় যখন দেশজুড়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলছিল, তখন আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের কয়েকটি সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ৩ আগস্ট গণভবনে অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে অংশ নেন আইনুল ইসলাম। ওই বৈঠকে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং আন্দোলন মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা করেন। ঠিক এর পরের দিন ৪ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে নীল দলের ব্যানারে মানববন্ধন করেন।

আজকের ঘটনা সম্পর্কে অবগত দুজন শিক্ষক মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছেন, অধ্যাপক আইনুল ইসলাম সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন হিসেবে যোগ দেওয়ার আগের দিন থেকে ওই অফিসে কে বা কারা তালা দিয়ে রাখেন। এ কারণে তিনি ওই অফিসে যেতে পারেননি। আজকে অনেকটা ‘মব’ করেই তাঁকে নিজের কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্রদলের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল আউয়াল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আজকের ঘটনার পর অধ্যাপক আইনুল ইসলামকে প্রক্টর ও কয়েকজন শিক্ষক নিরাপদে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি আবার দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আর জাতীয় ছাত্রশক্তি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখ্য সংগঠক ফেরদৌস শেখ বলেন, ‘জুলাইবিরোধী একজন শিক্ষক কীভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন হিসেবে নিয়োগ পান? বারবার বিচার চাওয়ার পর সেটার সুরাহা না করে তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাঁকে ক্যাম্পাসে থাকতে দেব না।’

আজকের এ ঘটনার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দায়ী করেছেন অধ্যাপক আইনুল ইসলাম। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আইন অনুযায়ী আমি (ডিন) নিয়োগ পেয়েছি। যোগদানও করেছি; কিন্তু আমার অফিসে তালা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেন দিয়েছে, কারা দিয়েছে তার জন্য প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম। আজ কয়েকজন শিক্ষার্থী আমাকে রুমে এসে চলে যেতে বলে। বলে, আমি যেন আর না আসি।’

অধ্যাপক আইনুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষকদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। আমাকে যারা এসে চলে যেতে বলল, সে খবর প্রশাসন জানত। আমি উপাচার্যের শিক্ষক ছিলাম, তিনি তো আমার খোঁজ নিতে এলেন না। বরং আমাকে চলে যেতে বাধ্য করা হলো।’