জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অসাংবিধানিক বলে সরকারি দল জাতীয় সংসদে যে দাবি তুলছে, তা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, স্বার্থের অনুকূলে থাকলে তারা আদেশ মেনে নেন, আর বিপক্ষে গেলেই অসাংবিধানিক বলে আইনি কূট তর্ক তৈরি করেন, যা মূলত রাজনৈতিক দ্বিচারিতা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনের বিষয় ছিল ‘সংবিধান সংস্কার-গণভোট-জুলাই সনদ-পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার রায়-বর্তমান বাস্তবতায় গণতন্ত্রের ভবিষ্যত’।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সর্বদলীয় ঐক্যমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের জন্য একটা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গণভোট ও সংস্কারের ব্যাপারে ঐক্যমত্য হয়েছিল। সেটিকে লিগ্যাল কাভারেজের (আইনি বৈধতা) জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ হয়েছিল।’
এই আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন, যদি চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানপরবর্তী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবৈধ হয়, তবে বর্তমান সংসদ সদস্যরা কোন সংবিধান বা নিয়মে নির্বাচিত হলেন? তিনি মনে করেন, কোনো বিপ্লব বিদ্যমান সংবিধান মেনে হয় না, কারণ জনগণই সব বৈধতার উৎস। সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস এবং সংবিধান হলো জনগণের পরম ইচ্ছারই প্রকাশ’। গণভোটে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ এই রূপান্তরের পক্ষে রায় দেওয়ায় জুলাই সনদের বাস্তবায়ন সম্পূর্ণ বৈধ বলে তিনি দাবি করেন।
আন্তর্জাতিক আইনি নজিরের কথা উল্লেখ করে তাজুল ইসলাম স্পষ্ট করেন, ‘জনগণের ইচ্ছায় হওয়া বিপ্লবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার কোনো এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্টেরও নেই। মূলত নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা নিতেই একটি গোষ্ঠী এই অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করছে।’
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য প্রদান করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি জানান, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত গণ–আকাঙ্ক্ষা পূরণেই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছে, তাই গণভোটের রায় এবং সংবিধান সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, গণভোটের রায়কে না মেনে বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া মানে একে টিস্যু পেপারে পরিণত করা। আইনকে এভাবে অবমূল্যায়ন করলে সংসদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। সংসদ যদি আদালতের রায় ছাড়াই সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সবকিছু অসাংবিধানিক ঘোষণা করে, তবে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। কোনো আপত্তি থাকলে সরকারের উচিত আদালতে মামলা করে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়া।
জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কেন নাম দেওয়া হয়নি—জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমানের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো সংবিধান সংশোধনেরই বিরোধী। নাম দেব কেন? আমরা সংস্কার চাই। সরকার একদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলছে, অন্যদিকে নতুন সংশোধন কমিটি গঠন করে উল্টো পথে হাঁটছে। এটি মূলত জুলাই সনদকে ব্যর্থ করার একটি পরিকল্পিত টালবাহানা।’
আইনজীবী মতিউর রহমান আকন্দের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সংবাদ সম্মেলনে ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি জসিম উদ্দিন সরকার।