একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল এই বিশ্বে ‘ফিনটেক’ বা ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজির বিকাশ পুরো পৃথিবীর সনাতন ব্যাংকিং ও মুদ্রাব্যবস্থাকে এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এই প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অনুষঙ্গ হলো ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রা। বিটকয়েন, ইথারিয়াম ও ইউএসডিটির মতো ডিজিটাল টোকেন বিশ্বজুড়ে লাখো তরুণকে রাতারাতি ধনী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রেখেছে।
মুসলিম তরুণদের মধ্যেও এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য যেকোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর আগে তার শরিয়তসম্মত অবস্থান জেনে নেওয়া জরুরি।
সম্প্রতি খ্যাতিমান ইসলামি অর্থনীতিবিদ মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি ও করাচির জামিয়া দারুল উলুমের দারুল ইফতা একটি স্পষ্ট ফতোয়া জারি করেছে, যা মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
.ফতোয়াটির ভিত্তি ছিল দুটি ব্যবহারিক প্রশ্ন, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে সাধারণ বই কেনা বৈধ কি না, আর ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে কোনো অনলাইন শিক্ষামূলক কোর্স কিনে তা থেকে উপকৃত হওয়া শরিয়তসম্মত কি না।.
গত ১০ জুন ২০২৬ করাচির জামিয়া দারুল উলুমের দারুল ইফতা থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে একটি নির্দিষ্ট ফতোয়া প্রকাশিত হয়। জুলাইয়ে এসে ফতোয়াটি সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়।
পাকিস্তান ভার্চ্যুয়াল অ্যাসেট রেগুলেটরি অথরিটির (পিভারা) চেয়ারম্যান বিলাল বিন সাকিব মুফতি উসমানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। ফেডারেল শরিয়া আদালতের সাবেক বিচারপতি মুফতি তাকি উসমানি ছাড়া আরও পাঁচ প্রখ্যাত মুফতি এই ফতোয়ায় স্বাক্ষর করেছেন।
মুফতি উসমানির পুত্র হাসান উসমানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফতোয়াটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ফতোয়াটির ভিত্তি ছিল দুটি ব্যবহারিক প্রশ্ন, ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে সাধারণ বই কেনা বৈধ কি না, আর ক্রিপ্টোকারেন্সি দিয়ে কোনো অনলাইন শিক্ষামূলক কোর্স কিনে তা থেকে উপকৃত হওয়া শরিয়তসম্মত কি না।
উভয় প্রশ্নের জবাবে ফতোয়া বোর্ড ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে যেকোনো কেনাকাটা বা লেনদেনকে সম্পূর্ণ নাজায়েজ (অবৈধ) ঘোষণা করেছে।
.মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে ইসলাম যে ব্যবস্থার কথা বলে.ফতোয়ার মূল যুক্তি দাঁড়িয়ে আছে ইসলামি অর্থব্যবস্থায় ‘মাল’ বা সম্পদের সংজ্ঞার ওপর। ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো কিছু মুদ্রা বা বিনিময়ের মাধ্যম হতে হলে তার পেছনে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি, আইনি স্বীকৃতি বা নিজস্ব অন্তর্নিহিত মূল্য থাকা প্রয়োজন।
কিন্তু বিটকয়েন বা ইউএসডিটির মতো ক্রিপ্টোকারেন্সির পেছনে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সরকারের আইনি নিশ্চয়তা নেই। ফতোয়ার ভাষায়, এটি প্রকৃত অর্থে সম্পদ নয়; বরং ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত কিছু কাল্পনিক সংখ্যার রেকর্ড মাত্র।
রাদ্দুল মুহতার ইসলামি ফিকহের একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ। ইমাম ইবনে আবিদিন সেখানে ‘মাল’–এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, ‘মাল হলো এমন বিষয়, যার প্রতি মানুষের স্বভাবগত আকর্ষণ থাকে এবং যা প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা যায়।’ (ইবনে আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার আলাদ দুররিল মুখতার, ৫/২১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)
.তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।কোরআন, সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮
ক্রিপ্টোকারেন্সির কোনো ভৌত অস্তিত্ব নেই এবং এর পেছনে কোনো আইনি সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণও নেই। তাই এটি এ সংজ্ঞা পূরণ করে না।
পবিত্র কোরআনে অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাসের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা আছে, ‘তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)
ফতোয়ার যুক্তি হলো, অস্তিত্বহীন সম্পদের বিনিময়ে লেনদেন করাটাই এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়ে।
.ইসলামি চুক্তি আইনে ক্রয়–বিক্রয়ের মৌলিক শর্ত হলো, বিনিময়ের বস্তু অবশ্যই বৈধ ‘মাল’ হতে হবে। যেহেতু ফতোয়া অনুযায়ী ক্রিপ্টোকারেন্সি এই শর্ত পূরণ করে না, তাই এর মাধ্যমে কেনা জিনিসের ক্রেতা টেকনিক্যালি মালিকই হন না। এখান থেকে দুটি কঠোর সিদ্ধান্ত এসেছে।
বই কেনার ক্ষেত্রে ক্রিপ্টো দিয়ে কেনা বই ব্যবহার বা বিক্রি করা হারাম; বরং তা বিক্রেতার কাছে ফেরত দিয়ে টাকা বা ডলারের মতো বৈধ মুদ্রায় নতুনভাবে চুক্তি করা বাধ্যতামূলক।
অনলাইন কোর্সের ক্ষেত্রে যেহেতু ফাইল বিক্রির পরও মূলত বিক্রেতার কাছেই থেকে যায়, তাই ক্রেতা মালিকানা পান না, কোর্স ম্যাটেরিয়াল নিজের ডিভাইস থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে হবে, ব্যবহার বা উপহার দেওয়া দুটিই নাজায়েজ।
.ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিমদের নিরাপত্তা কতখানি.এই কঠোরতার একটি নীতিগত ভিত্তি আছে, অনিশ্চয়তাপূর্ণ লেনদেনের প্রতি ইসলামের সতর্কতা। নবীজি (সা.) কঙ্করের মাধ্যমে ক্রয়–বিক্রয় ও ধোঁকাপূর্ণ লেনদেন (বাইউল গারার) নিষিদ্ধ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, আয়াত: ১৫১৩)
ক্রিপ্টোকারেন্সির চরম মূল্য ওঠানামা ও অনিশ্চয়তাকে ফতোয়ায় এই ‘গারার’–এর আধুনিক রূপ হিসেবে দেখা হয়েছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে আলেমদের কারও কারও মধ্যে দ্বিমতও আছে। তারা বিটকয়েনকে শর্তসাপেক্ষে ‘মাল’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এই যুক্তিতে যে বাজারে এর প্রকৃত চাহিদা ও গ্রহণযোগ্যতা আছে।
.ক্রিপ্টোকারেন্সির চরম মূল্য ওঠানামা, জবাবদিহির অভাব, আর এর মাধ্যমে মাদক, অস্ত্র চোরাচালান ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি—এসব উম্মাহর সামগ্রিক কল্যাণের পরিপন্থী।.
বাংলাদেশ ব্যাংকও ক্রিপ্টোকারেন্সিকে সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে লেনদেন বা মাইনিং করা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। (গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২, ধারা ৪)
ক্রিপ্টোকারেন্সির চরম মূল্য ওঠানামা, জবাবদিহির অভাব, আর এর মাধ্যমে মাদক, অস্ত্র চোরাচালান ও অর্থ পাচারের ঝুঁকি—এসব উম্মাহর সামগ্রিক কল্যাণের পরিপন্থী।
ফিকহের একটা মূলনীতি হলো, যা সমাজের বড় ক্ষতির কারণ হয়, তা নিষিদ্ধ করা ওয়াজিব। (আবদুর রহমান ইবনে নাসির আস–সাদি, আল–কাওয়াইদ ওয়াল উসুলুল জামিয়া, ১/১২, দারুল ওয়াতান, রিয়াদ, ১৯৯৯)
সারকথা, ক্রিপ্টোকারেন্সি হয়তো প্রযুক্তির এক বিস্ময়কর আবিষ্কার, কিন্তু মানুষের তৈরি এই ব্যবস্থা ইসলামি অর্থনীতির ইনসাফপূর্ণ ও বাস্তবমুখী কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না।
.ইসলামি জীবনব্যবস্থার বিস্তার কতটা





