প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভোটে জয়ের লক্ষ্যে বিরোধীদের দান-খয়রাত নীতির বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানান। কিন্তু ক্ষমতায় এসে বিজেপি সেই ধরনের নীতিরই নানা উদ্যোগকে জোরালোভাবে সামনে আনে। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতার পর রাজ্যজুড়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে গতি ধীর হচ্ছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা শর্ত আরোপ করে দান-খয়রাত বা ডোলের পরিমাণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে কোষাগার ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের যুক্তিও সামনে আনা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লি—এই তিন রাজ্যে উদাহরণ টানা হচ্ছে। ভোটে জেতার আগে ঢালাও প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে তা বাস্তবায়নের ধরন বদলে ফেলছে সংশ্লিষ্ট বিজেপি সরকারগুলো। প্রতিশ্রুতি রক্ষা না হওয়ায় তিন রাজ্যেই বিরোধীরা সরব এবং ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও। তবু বিপুল সমর্থনে ক্ষমতায় আসা সরকারগুলো তুলনামূলকভাবে নির্বিকার অবস্থায় রয়েছে।

দান-খয়রাত নীতি রূপায়ণে বিজেপি সরকার এখন নৈতিকতা, প্রয়োজন ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার আলোচনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের বক্তব্য, ডোলের সুবিধা দেওয়া হবে যাঁদের প্রয়োজন আছে, আর ঢালাও দান অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে—এ যুক্তিতে তারা বেছে বেছে সহায়তা দেওয়ার কথা বলছে।

নারীদের ভোট টানতে আর্থিক সহায়তা উদ্যোগের ধারাটি রাজ্যভেদে ভিন্ন নামে ছড়িয়ে পড়ে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার প্রথম উদ্যোগ নেন নারীদের পৃথক ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনার ধারণা নিয়ে। জাতপাতের বেড়াজাল থেকে নারীদের বের করে এনে ভোটের কৌশলে সফলও হন তিনি। নীতীশের পথ ধরেই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের মাধ্যমে নারীদের সমর্থন আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখার দাবি করা হয়। শুরুতে যে আর্থিক সহায়তা ছিল ৫০০ রুপি, তা পরে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে দেড় হাজার রুপিতে পৌঁছায়।

এবারের নির্বাচনে মমতার প্রতিশ্রুতি দ্বিগুণ বাড়িয়ে বিজেপি প্রচার চালায়। ক্ষমতায় এলে তাদের ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’-এর আর্থিক সহায়তা মাসিক তিন হাজার রুপি করা হবে—এ কথা বিজেপির পক্ষ থেকে জানানো হয়। পাশাপাশি বলা হয়, যাঁরা লক্ষ্মীর ভান্ডার পাচ্ছেন, তাঁরা সবাই অন্নপূর্ণা ভান্ডার পাবেন।

নীতীশ কুমারের দেখানো পথ অনুসরণ করে সফল হওয়ার নজির হিসেবে মধ্যপ্রদেশে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান, মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরে এবং দিল্লিতে রেখা গুপ্তারা—এই নেতাদের কথাও আলোচনায় আসে।

অন্যদিকে, নারীদের মন জয়ের চেষ্টায় আর্থিক সহায়তা প্রকল্প একেক রাজ্যে একেক নামে পরিচালিত হতে থাকে। কোন দল কত বেশি টাকা নারীদের ব্যাংক খাতে ফেলতে পারে—এই প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়। এখন বিজেপি বলছে, ঢালাও টাকা না দিয়ে প্রয়োজনীয়দের লক্ষ্য করে সহায়তা দেওয়া হবে এবং বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলো সেই পথে হাঁটছে।

দান-খয়রাত নীতির এই পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে মহারাষ্ট্রের বিষয়টি সামনে আনা হয়। মধ্যপ্রদেশে শিবরাজ সিং চৌহানের প্রকল্পের নাম ছিল ‘লাডলি বহেনা’। সেটি দেখে মহারাষ্ট্রের ভোটের আগে বিজেপি ‘মাঝি লড়কি বহিন’ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেয়। ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী নারীদের মাসে দেড় হাজার রুপি দেওয়ার কথা বলা হয় এবং ২০২৪ সালের জুন মাস থেকে প্রকল্পটি চালুও হয়।

মহারাষ্ট্রে সহায়তা প্রাপকদের নাম যাচাই-বাছাই করে সরকার ৯২ লাখ গ্রহীতাকে বাদ দিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, যাঁরা আয়কর দেন, যে পরিবারের কেউ সরকারি চাকরি করেন, যে পরিবারে একাধিক সদস্যা সাহায্য পাচ্ছেন—তাঁদের এই সরকারি সুবিধা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। একাধিক সদস্যা থাকলে কেবল বয়োজ্যেষ্ঠই এই সাহায্য পাবেন—এ শর্তও যুক্ত করা হয়। ওই তালিকায় ১৪ হাজার পুরুষের নামও পাওয়া যায় এবং তাঁদেরও ছাঁটাই করা হয়েছে। ফলে মহারাষ্ট্রে মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা ২ কোটি ৪৩ লাখ থেকে একধাক্কায় ১ কোটি ৫০ লাখে নেমে এসেছে।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারও। ভোটের আগে ঢালাও প্রতিশ্রুতি থাকলেও এখনও ‘অন্নপূর্ণা ভান্ডার’ ঢালাওভাবে চালু করেনি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। আগের তালিকা ঝাড়াই-বাছাই ও ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া চলছে। বিজেপি সরকার ১২ পৃষ্ঠার এক ফর্ম চালু করেছে বলে বলা হয়েছে; সেই ফর্ম পূরণ করতে নারীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে—এ প্রসঙ্গে বিতর্ক তৈরি হয়। বিতর্কের প্রেক্ষিতে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা সরকার জানিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, যাঁরা আয়কর দেন, তাঁরা এই সহায়তা পাবেন না। যাঁরা কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের কর্মী, পেনশনভোগী কিংবা যাঁরা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী, তাঁদের এই প্রকল্পের আওতায় আসবে না। আবেদনকারীকে অবশ্যই পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হতে হবে। তালিকা ঝাড়াই-বাছাইয়ের সময় বহু পুরুষের খোঁজও পাওয়া যায়, যাঁরা এই সাহায্য পাচ্ছিলেন। সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, যাঁদের ভোটার তালিকায় নাম নেই এবং এসআইআরে যে ২৭ লাখ নাম বিচারাধীন, তাঁরা এই সহায়তা পাবেন না।

গতকাল সোমবার দিল্লির বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে খবর। অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সময় দিল্লিতে চালু হয়েছিল ‘মহিলা সমৃদ্ধি যোজনা’। গত বছর ভোটের আগে বিজেপি জানায়, ওই যোজনায় প্রতি পরিবারের নারী সদস্যরা মাসিক আড়াই হাজার রুপি সাহায্য পাবেন।

ভোটের পর বিজেপি ক্ষমতায় এলে যোজনার নাম বদল হয়। নতুন নাম ‘দিল্লি লক্ষ্মী যোজনা’। এক বছর অতিক্রান্ত হলেও সরকার সেই যোজনা চালু করেনি—এ নিয়ে সমালোচনার পর গতকাল মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা ঘোষণা করেন, নতুন যোজনা ২৮ আগস্ট থেকে চালু হবে। তবে আগের জমানায় যাঁরা সরকারি অনুদান পেয়ে এসেছেন, নতুন যোজনায় তাঁরা সবাই যোগ্য বিবেচিত হবেন না।

সরকারি আর্থিক সহায়তা কারা পাবেন না—গতকাল সেই তালিকা প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়েছে, যাঁরা সরকারি পেনশন পান, তাঁরা বাদ। যে সুবিধাভোগী পরিবারের কেউ আয়কর দেন, সেই পরিবারের নারীরা টাকা পাবেন না। যে পরিবারের কেউ সরকারি চাকরি করেন, সেই পরিবার বাদ। পরিবারের বার্ষিক আয় আড়াই লাখ রুপির মধ্যে হতে হবে। পরিবারে একাধিক নারী থাকলে সহায়তা পাবেন শুধু বয়োজ্যেষ্ঠ নারী। যে পরিবারে চার চাকার গাড়ি আছে, তারা বাদ। আবেদনকারীকে অবশ্যই দিল্লির বাসিন্দা হতে হবে এবং ১০ বছর টানা বাস করছেন সেই প্রমাণ দাখিল করতে হবে। আবেদনকারী পরিবারের কারও বিরুদ্ধে অপরাধের রেকর্ড থাকলে সেই পরিবারের কেউ এই সহায়তা পাবেন না।

দিল্লির বাজেটে এই সহায়তা বাবদ বার্ষিক ৫ হাজার ১০০ কোটি রুপি বরাদ্দ হয়েছিল। নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে খরচ অর্ধেক কমে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটে জিতলেও আর্থিক সংস্কারের পথে হেঁটে ঢালাও অনুদান বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার ইঙ্গিত মিলছে—এমন পর্যবেক্ষণও সামনে এসেছে।