বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে একের পর এক পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির কারণে হাজারো চাকরিপ্রার্থীর অপেক্ষার প্রহর দীর্ঘ হচ্ছে। বছরের পর বছর নিয়োগ কার্যক্রম শেষ না করে একই পদের জন্য বারবার পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে হাজারো চাকরিপ্রার্থীর অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক চাপ বাড়ছে।
শুধু চলতি বছরের জুন থেকে জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সমাজসেবা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়সহ ছয় থেকে সাতটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রায় আড়াই বছর পর আবার একই পদের জন্য পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়। ৪৩১টি শূন্য পদে নতুন এ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় গত ১৬ জুন।
এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং কর্মচারী কল্যাণ বোর্ডও গত জুন মাসে তাদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পুনরায় প্রকাশ করেছে।
.যৌক্তিক কারণ ছাড়া বছরের পর বছর নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন না করা অদক্ষতা বা অবহেলা। অনেক সময় তদবিরের চাপে বা মামলা হলেও নিয়োগ আটকে যায়, পরে পুনর্বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া, জনপ্রশাসন–বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব
একই ধরনের দীর্ঘসূত্রতা দেখা গেছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিয়োগেও। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ ১ হাজার ৪৮৫টি পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও নিয়োগ কার্যক্রম শেষ না হওয়ায় গত ২৪ মে আবার পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক সাইফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।’ তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, চলতি মাসের মধ্যেই পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
.যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরেও পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর ৯০টি পদের জন্য পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে পদোন্নতি ও অন্যান্য কারণে আরও পদ শূন্য হওয়ায় বর্তমানে পদসংখ্যা বাড়িয়ে ২৪২ করা হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মো. সাইফুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘শূন্য পদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে পদসংখ্যা সমন্বয় করা হয়েছে।’
এদিকে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরেও পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর ৯০টি পদের জন্য পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে পদোন্নতি ও অন্যান্য কারণে আরও পদ শূন্য হয়। ফলে পদসংখ্যা বাড়িয়ে বর্তমানে ২৪২টি পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গাজী মো. সাইফুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘শূন্য পদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে পদসংখ্যা সমন্বয় করা হয়েছে।’
অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ২৮০টি শূন্য পদে পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও এই নিয়োগ কার্যক্রমের উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী আবেদনকারীরা।
.তিন বিসিএসের জাঁতাকলে চাকরিপ্রার্থীরা: ৪৫ ও ৪৯তম–এর গেজেট না হওয়ায় ফাঁকা থাকবে ৪৭-এর আসনও.জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে ২৮০টি শূন্য পদের জন্য ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও নিয়োগ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।
.দীর্ঘসূত্রতার আরেকটি উদাহরণ হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয় (সিজিএ)। ৯ জুলাই প্রতিষ্ঠানটি তিনটি পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। তিনটি বিজ্ঞপ্তিতে মোট ৫৭৫টি শূন্য পদ রয়েছে। এই পদগুলোর প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর। অর্থাৎ সাড়ে চার বছরেও নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়ায় আবার পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়েছে।
.যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে আবেদন করা এক চাকরিপ্রার্থী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এর আগেও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদনের পর বছর কেটে গিয়েছে, কিন্তু পরীক্ষা হয়নি। পরে আবার বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। অনেক সময় মনে হয়, পরীক্ষা আর হবেই না। তখন হতাশ লাগে। টিউশনি করে চলি, আবেদন করতেও তো টাকা লাগে।’
চাকরিপ্রার্থীরা বলছেন, একটি নিয়োগে আবেদন করতে আবেদন ফি, ছবি, কাগজপত্র, যাতায়াত ও প্রস্তুতির জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়। কিন্তু বছরের পর বছর নিয়োগ ঝুলে থাকলে সেই অর্থ ও সময়—দুটিই নষ্ট হয়।
.এআই যুগে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যেভাবে চাকরির প্রস্তুতি নেওয়া উচিত.জনপ্রশাসন–বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘যৌক্তিক কারণ ছাড়া বছরের পর বছর নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন না করা অদক্ষতা বা অবহেলা। আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে এটি করা হয়। অনেক সময় তদবিরের চাপে বা মামলা হলেও নিয়োগ আটকে যায়, পরে পুনর্বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।’
.বিশেষজ্ঞদের মতে, পুনর্নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে আগের আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনা ভালোভাবে পড়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি—
* নিয়োগসংক্রান্ত সব বিজ্ঞপ্তি ও নোটিশ নিয়মিত অনুসরণ করতে হবে
* আবেদনপত্র, প্রবেশপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করতে হবে
* একটি নিয়োগের অপেক্ষায় না থেকে একাধিক নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে।
.স্নাতক পাসেই ৩০০ তরুণের চাকরি, মাসিক ভাতা ও উৎসব বোনাস দেবে ‘প্রশিকা’.সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় আবেদনকারীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ প্রার্থীরা বলছেন, এই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা তাঁদের চাকরিজীবন ও ক্যারিয়ারের পরিকল্পনাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলছে। অনেকেই বয়সসীমা শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। ফলে নিয়োগে স্বচ্ছতা ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রক্রিয়া শেষ করার দাবি এখন চাকরিপ্রার্থীদের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা।