বিশ্বজুড়ে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে বাংলাদেশ অন্যতম সফল দেশ হিসেবে স্বীকৃত। সরকারের নেতৃত্ব, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের কঠোর পরিশ্রম, উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন এবং সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি)-সহ বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্রিয় অংশগ্রহণে এই অর্জন সম্ভব হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই কর্মসূচির গতি কিছুটা মন্থর হয়ে আসায় নতুন করে চিন্তার অবকাশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বর্তমান সময়ে পরিবার পরিকল্পনাকে কেবল জন্মনিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতায় দেখার সুযোগ নেই। এটি মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য, কৈশোরকালীন স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নারীর ক্ষমতায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং দেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই এই কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখনও প্রায় ১০ শতাংশ নারীর পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতির প্রয়োজন পূরণ হচ্ছে না। অন্যদিকে, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী প্রজনন বয়সে পদার্পণ করছে। তাদের কাছে বৈজ্ঞানিক, নির্ভুল ও দায়িত্বশীল তথ্য পৌঁছে দেওয়া এখন অত্যন্ত জরুরি। নতুন প্রজন্মের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাতে গণমাধ্যমের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি পর্যায়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ ও অপুষ্টি বর্তমানে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে, যা পরিবার পরিকল্পনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দেশে এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মেয়ের বিয়ে ১৮ বছরের আগেই হয়ে যাচ্ছে এবং অনেকেই কৈশোরে গর্ভধারণ করছেন। এর ফলে মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি অপুষ্টি ও দারিদ্র্যের একটি দীর্ঘমেয়াদি চক্র তৈরি হচ্ছে। তাই পরিবার পরিকল্পনা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং পুষ্টি উন্নয়নকে একটি সমন্বিত কর্মসূচি হিসেবে বাস্তবায়ন করার কথা বলা হয়েছে।

শিশু, কিশোর-কিশোরী এবং প্রজননক্ষম নারীদের মধ্যে আয়রন, আয়োডিন, জিংক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ঘাটতি এখনও উদ্বেগের বিষয়। এই সমস্যা মোকাবিলায় সরকার, উন্নয়ন সহযোগী এবং এসএমসি-সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুষ্টিসেবা ও প্রয়োজনীয় পণ্যের প্রাপ্যতা বাড়াতে কাজ করছে। তবে পণ্যের সহজলভ্যতার পাশাপাশি মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, সচেতনতা এবং নিয়মিত পুষ্টিসেবা গ্রহণ নিশ্চিত করা সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশ বর্তমানে জনমিতিক সুবিধা ভোগ করলেও আগামী কয়েক দশকে বয়োজ্যেষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়বে। তাই বর্তমান জনমিতিক সুবিধার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্য এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে এখনই বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিতে নতুন গতি আনতে চারটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে: নিরবচ্ছিন্ন পদ্ধতি সরবরাহ নিশ্চিত করা, তরুণদের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা, বাল্যবিবাহ ও অপুষ্টি প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এবং সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করা।

সামগ্রিক বিষয়ে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানী (এসএমসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, "বাংলাদেশ অতীতে দেখিয়েছে, সম্মিলিত উদ্যোগে বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। পরিবার পরিকল্পনা, পুষ্টি এবং কৈশোরকালীন স্বাস্থ্যকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে সবাই একসঙ্গে কাজ করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সুস্থ, দক্ষ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।"