ভাইভা তারিখ: ১০ জুন, ২০২৩
ক্যাডার চয়েজ: পুলিশ, প্রশাসন, ট্যাক্স, কাস্টমস, স্বাস্থ্য, ফ্যামিলি প্ল্যানিং।
ভাইভা বোর্ড নাম্বার: ৬
বোর্ড চেয়ারম্যান: সদস্য (নাম প্রকাশ করা হবে না।)
ভাইভার সময়: ১৫ মিনিটের মতো।
সিরিয়াল: ১১
ফলাফল: পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত।
আমার সিরিয়াল ১৫ জনের মধ্যে ১১ থাকায় আমি ভাইভা দিতে ঢুকেছিলাম বেশ দেরিতে। যখন ঢুকি তখন ঘড়ি দেখেছিলাম। ঘড়িতে ১২টা ৩৫–এর মতো বেজেছিল। বেল বাজার পর ভেতরে ঢুকলাম।
আমি: স্যার, আসতে পারি?
চেয়ারম্যান স্যার: আসো।
(আমি ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই স্যারই আগে আমাকে সালাম দিলেন। আমি সালাম দেওয়ার সুযোগটাই পাইনি।)
চেয়ারম্যান স্যার: কী নাম?
আমি: এবার সালাম দিয়ে বললাম, এহসানুল হক।
চেয়ারম্যান স্যার: (স্যার নিজের টেবিলের দিকে ডেকে নিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন। পরে জানতে পারি, স্যার এটা সবার সঙ্গেই করেন। তারপর আমার ডকুমেন্ট চেক করে বললেন) ও তুমি ডাক্তার?
আমি: জ্বি স্যার।
চেয়ারম্যান স্যার: প্রথম চয়েজ কী?
আমি: স্যার, বিসিএস পুলিশ।
চেয়ারম্যান স্যার: পুলিশ কেন? ডাক্তারি রেখে পুলিশে আসতে চাও কেন?
আমি: (এটার উত্তর রেডি করা ছিল। বললাম) স্যার, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষের সেবা করার জন্য হলেও যে বৈধ কর্তৃপক্ষ (অথরিটি) দরকার বা কর্তৃত্ব দরকার, তা পুলিশের আছে। এ জন্য আমি পুলিশকে প্রথম চয়েজে রেখেছি।
চেয়ারম্যান স্যার : ডাক্তারের নেই?
আমি: সেভাবে নেই স্যার।
চেয়ারম্যান স্যার: কী রকম?
আমি: স্যার, উদাহরণস্বরূপ যদি বলা হয়, ডাক্তার মানুষকে ওষুধ লিখে দেয়। পাবলিক সে ডোজ কমপ্লিট না করে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো ঝামেলা বাধিয়ে বসে। কিন্তু এ বিষয়ে আসলে ডাক্তারের কিছু করার থাকে না। অপর দিকে একজন বাইকচালক যদি বাইক চালানোর সময় হেলমেট না পরে, তো পুলিশ তাকে বাধ্য করতে পারে হেলমেট পরানোর জন্য। সুতরাং স্যার, আমাদের দেশে সেবা করতে গেলেও একটা বৈধ অথরিটি লাগে।
চেয়ারম্যান স্যার: আচ্ছা যাও, চেয়ারে গিয়ে বসো।
(চেয়ারম্যান স্যার তারপর এক্সটার্নাল–১ স্যারকে শুরু করতে বললেন)
এক্সটার্নাল–১ স্যার–
–হরমুজ কোথায়?
–স্যার, এটি পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযোগকারী প্রণালি।
–জিব্রাল্টার কোথায়?
–স্যার, এটি ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরকে সংযোগকারী প্রণালি।
–আমাদের বাজেট কবে উত্থাপিত হবে?
–(এটা সেদিনের পত্রিকার নিউজ ছিল। সকালেই পেপার পড়ে গিয়েছিলাম) স্যার, ১১ জুন। অর্থাৎ আগামীকাল।
–আমাদের সংবিধানে বাজেটের কথা কোথায় বলা আছে?
–৮৭ থেকে শুরু করে পরবর্তী ৯১ অনুচ্ছেদ পর্যন্ত অর্থব্যয়, অর্থব্যয়ের অনুদান সম্পর্কে বলা আছে, স্যার।
(এখানে স্যার আরও কিছু অনুচ্ছেদ শুনতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু আমি বলতে পারিনি)
–আমাদের বাজেট কী ধরনের বাজেট?
–স্যার, ঘাটতি বাজেট।
–এই ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হয়?
–স্যার, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আর বৈদেশিক অনুদান নিয়ে।
–আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক জিডিপি বেসিসে দেশগুলোর একটা ক্ল্যাসিফিকেশন করে। জানো?
–দুঃখিত স্যার, এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।
–ক্রাইম আর জিডিপির সম্পর্ক কী?
–স্যার অপরাধ বৃদ্ধি পেলে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়। তখন বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ থেকে শুরু করে দেশের সামগ্রিক অর্থব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে জিডিপির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
–একজন মানুষ কী কী কারণে ক্রাইম করে?
–স্যার আর্থিক কারণ, মূল্যবোধের অবক্ষয়, সুশিক্ষার অভাব।
–বর্তমানে ধর্ষণের কেস কেন বেশি হচ্ছে?
–স্যার, মূল্যবোধের অবক্ষয় ও নৈতিকতার অবনতি মূল কারণ। তা ছাড়া বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের একটা সময় পার করছে। একটা নির্দিষ্ট বয়সের রেঞ্জের বেশির ভাগ মানুষেরই কর্মসংস্থান নেই। সুশিক্ষা নেই। ফলে মূল্যবোধের অবক্ষয় আরও বেশি হচ্ছে। কেস স্টাডি করে দেখা যায়, রেপ কেসে জড়িত বেশির ভাগ অপরাধীই এই বয়স রেঞ্জের।
–আমাদের মাথাপিছু জাতীয় ইনকাম কত?
–স্যার, সর্বশেষ অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে ২ হাজার ৮২০ মার্কিন ডলার।
–ভারতের কত?
–দুঃখিত স্যার।
–কাদের বেশি? আমাদের না ভারতের?
–আমাদের বেশি স্যার। (এটা জানা ছিল অবশ্য)
(যদ্দুর মনে পড়ে এক্সটার্নাল–১ স্যার মোটামুটি এগুলোই ধরেছিলেন। দুটি প্রশ্ন আমি বুঝতে পারিনি বা ঠিকমতো শুনতে পাইনি। এ জন্য সরি বলেছিলাম।)
এবার এক্সটার্নাল–২ স্যার–
–তুমি প্র্যাকটিস করো এখন কোথাও?
–জ্বি না, স্যার। আমি বর্তমানে বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাই শেষ ছয় মাস যাবৎ কোথাও প্র্যাকটিস করি না।
–তা প্রথম চয়েজ পুলিশ?
–জ্বি, স্যার।
–বলো তো, সুরতহাল আর ময়নাতদন্ত কী?
–স্যার সুরতহাল হলো, কোনো অস্বাভাবিক বা সন্দেহজনক মৃত্যুর পর মৃত্যুর বাহ্যিক কারণ ও শরীরের অবস্থা পর্যালোচনা করে পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটের তৈরি করা প্রাথমিক প্রতিবেদন। আর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে ডাক্তার বা স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক যে রিপোর্ট তৈরি করা হয়, সেটি ময়নাতদন্ত।
–১৪৪ ধারা কী, জানো?
–জানি স্যার।
–কোথায় আছে?
–ফৌজিদারি কার্যবিধিতে।
–কে জারি করে? কেন করে?
–জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়। বেআইনি সমাবেশ ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য।
–সূর্যাস্ত আইন কী?
–স্যার, ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের প্রবর্তিত ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’-এর আওতায় সরকারনির্ধারিত রাজস্ব আদায়ের একটি কড়া নিয়ম ছিল সূর্যাস্ত আইন। এই আইন অনুযায়ী, জমিদারদের নির্দিষ্ট দিনের সূর্যাস্তের পূর্বেই সরকারের কোষাগারে রাজস্ব জমা দিতে হতো। কোনো জমিদার ব্যর্থ হলে তাঁর জমিদারি বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হতো।
–দ্বিতীয় চয়েজ কী?
–স্যার, বিসিএস প্রশাসন।
–(এমন সময় চেয়ারম্যান স্যার এক্সটার্নাল–২ স্যারকে উদ্দেশ করে বললেন, ধরেন তো, ওকে প্রশাসন থেকে প্রশ্ন ধরেন) আচ্ছা বলো, এসি ল্যান্ডের কাজ কী?
–নামজারি বা মিউটেশন, ভূমি রাজস্ব আদায়, খাসজমি ব্যবস্থাপনা, সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণ।
–মূল কাজটা কী? একবাক্যে বলো।
–স্যার, ভূমি রাজস্ব আদায় ও ভূমি ব্যবস্থাপনা।
–আচ্ছা ইউএনও আর এসি ল্যান্ডের মধ্যে কাজের সমন্বয় হয় কীভাবে?
–(প্রশ্নটা আমি ভালো করে বুঝিনি। তাও বলার চেষ্টা করেছিলাম) স্যার, প্রশাসনিক সমন্বয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা। (স্যার থামিয়ে দিলেন)
এবার আবার চেয়ারম্যান স্যার–
–আচ্ছা তোমার তৃতীয় চয়েজ কী?
–স্যার, বিসিএস ট্যাক্স।
–তারপর?
–স্যার, বিসিএস কাস্টমস অ্যান্ড এক্সাইজ।
–স্বাস্থ্য চয়েজেই রাখোনি?
–রেখেছি স্যার। এরপরে স্বাস্থ্য।
–কেন? স্বাস্থ্যের প্রতি এত বিতৃষ্ণা কেন তোমাদের?
(সম্পূর্ণ ভাইভার মধ্যে এই একটি কথা শুনে আমার বেশ মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে সেই মন খারাপকে ভেতরে চেপে হাসিমুখে বললাম)–স্যার, আসলে বিতৃষ্ণা নয়। বিষয়টা হলো...এটা বলে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, তখনি চেয়ারম্যান স্যার থামিয়ে দিয়ে বললেন, আসো, মাঝখানে এসে দাঁড়াও। ৩ জন স্যারের ৩ টেবিলের মাঝবরাবর গিয়ে দাঁড়ালাম।
–তোমার পছন্দের সাবজেক্ট নিয়ে ইংরেজিতে একটা স্পিচ দাও।
অর্থোপেডিক্স নিয়ে স্পিচ দেওয়া শুরু করলাম। আল্লাহ চাইলে এই সাবজেক্টে ক্যারিয়ার করার ইচ্ছা ছিল, এ জন্য। মিনিটখানেক স্পিচ দেওয়ার পর চেয়ারম্যান স্যার বললেন, আচ্ছা এবার আসতে পারো তুমি। এক্সটার্নাল–২ স্যারের কাছ থেকে ডকুমেন্টস নিয়ে চেয়ারম্যান স্যারকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে এলাম। বের হয়েও ঘড়ি দেখেছিলাম। দেখলাম ১৫ মিনিটের মতো ভেতরে ছিলাম।
*লেখক: এহসানুল হক, চিকিৎসক, পড়াশোনা: রংপুর মেডিকেল কলেজ। সেশন: ২০১৬-১৭।
.বুয়েট থেকে বিসিএস: রিভার-কেয়ার একসঙ্গে জয়ী হওয়ার গল্প .বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে বড় নিয়োগ, পদ ১৪৬০





