সম্প্রতি জাতীয় সংসদে রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ইডেন মহিলা কলেজকে একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি উত্থাপিত হয়েছে। কলেজটির দীর্ঘ ইতিহাস, নারীশিক্ষায় অনন্য অবদান এবং অতীতে একে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার উদ্যোগের প্রসঙ্গগুলো আলোচনায় এসেছে। ইডেন কলেজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব সর্বস্বীকৃত হলেও বর্তমান উচ্চশিক্ষার প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—একটি সফল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করাই কি সবচেয়ে কার্যকর পথ, নাকি বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরেই একে আরও আধুনিক, গবেষণানির্ভর ও বিশ্বমানের কলেজ হিসেবে গড়ে তোলা অধিকতর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বাংলাদেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। "ইডেন মহিলা কলেজকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করার দাবি উঠলেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, এটি কার্যকর নয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মানের ঘাটতি রয়েছে।"

গত দুই দশকে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও গুণগত মানের উন্নয়ন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এছাড়া ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া করা ভবন বা অস্থায়ী ক্যাম্পাসে চলছে এবং প্রায় ২০টিতে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার ও ছাত্রাবাস গড়ে ওঠেনি। ফলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সহজ হলেও সেগুলোকে মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইডেন মহিলা কলেজ উপমহাদেশে নারীশিক্ষার অন্যতম প্রাচীন ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময়ে এটি নিজস্ব ঐতিহ্য ও একাডেমিক সুনাম গড়ে তুলেছে। বর্তমানে ২৩টি বিভাগে প্রায় ২৪ হাজার শিক্ষার্থী এখানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়ন করছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের জন্য ঢাকা শহরে এত সুলভ, নিরাপদ ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষা ও আবাসনের বিকল্প আর দ্বিতীয়টি নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সুপ্রতিষ্ঠিত কলেজটিকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করলে এর আসনসংখ্যা সীমিত হয়ে পড়বে এবং অভ্যন্তরীণ একাডেমিক চরিত্র বদলে যাবে। এতে প্রতিবছর উচ্চমাধ্যমিক পাস করে আসা বিপুলসংখ্যক ছাত্রীর কলেজভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ও নিরাপদ আবাসনের সুযোগ এক ধাক্কায় বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করা সম্ভব নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইডেন মহিলা কলেজ বর্তমানে নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির একটি সংযুক্ত কলেজ। প্রশাসনিক ও একাডেমিক জটিলতা নিরসনে এই কাঠামো তৈরি করা হলেও রূপান্তর প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীরা সেশনজট ও প্রশাসনিক অনিশ্চয়তার মতো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। যখন এই নতুন কাঠামো স্থিতিশীল হওয়ার পথে এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে, তখন পুনরায় পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সামগ্রিক ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

"সম্প্রতি ইডেন কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবি করা হয়েছে, তবে এর বদলে একে উচ্চমানের নারীশিক্ষা কেন্দ্রে উন্নীত করাই অধিক যুক্তিসংগত ও কার্যকর।"

একটি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার অর্থ কেবল নাম পরিবর্তন নয়; এর জন্য নতুন আইন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রারসহ অসংখ্য পদের সৃষ্টি হয়, যা নতুন ব্যয় বৃদ্ধি করে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ এবং ইউজিসির প্রস্তাবিত বাজেটে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট বাজেটের মাত্র ১.৮৪ শতাংশ গবেষণার জন্য বরাদ্দ। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, সংকটের মূল কারণ নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব নয়, বরং গবেষণায় বিনিয়োগের ঘাটতি।

বিশ্বের অনেক নামী প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় না হয়েও শীর্ষস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়ামস কলেজ, অ্যামহার্স্ট কলেজ, সোয়ার্থমোর কলেজ কিংবা যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন এবং ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেইন্ট স্টিফেন ও মিরান্ডা হাউস কলেজ এর উদাহরণ। এসব প্রতিষ্ঠান প্রমাণ করে যে, উৎকর্ষ নামের ওপর নয়, বরং শিক্ষা ও গবেষণা সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে।

তাই ইডেন মহিলা কলেজকে নারী উচ্চশিক্ষার জাতীয় ‘কলেজ অব এক্সিলেন্স’ হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির আওতায় থেকেই একে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, আধুনিক গ্রন্থাগার, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণার সুযোগ দিয়ে একাডেমিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা সম্ভব।

উল্লেখ্য, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত অনেক প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর পার করেও পূর্ণাঙ্গ গবেষণার পরিবেশ পায়নি। প্রায় দুই দশক আগে রূপান্তরিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আজও অবকাঠামো, আবাসন ও বাজেট সংকটে ভুগছে। ফলে কেবল কাগজে-কলমে বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করলেই তা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত একাডেমিক কাঠামো প্রশাসনিক জটিলতায় গতি হারায়।

ইডেন কলেজ দীর্ঘ দেড় শ বছরের পথচলায় ‘কলেজ’ হিসেবেই অনন্য সুনাম অর্জন করেছে। একে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করে যদি সফল করা না যায়, তবে নারীশিক্ষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি কলেজের অবলুপ্তি ঘটবে। একটি নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও ইডেনের মতো ঐতিহ্য ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সম্পন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে কয়েক প্রজন্ম লেগে যেতে পারে।

পরিশেষে, রাষ্ট্রের উচ্চশিক্ষা নীতিতে আবেগের চেয়ে বাস্তবতা এবং সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। উচ্চশিক্ষা বিস্তারের নামে কলেজব্যবস্থাকে দুর্বল না করে ইডেন মহিলা কলেজকে নারী উচ্চশিক্ষার জাতীয় উৎকর্ষকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই হবে অধিকতর দূরদর্শী ও টেকসই সিদ্ধান্ত।

— লেখক: সৌরভ জাকারিয়া, শিক্ষক