বোস্টনে গতকাল রাতে মরক্কোর বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জিতে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স। তবে সেই ম্যাচে কিলিয়ান এমবাপ্পে পেনাল্টি মিস করায় আলোচনায় উঠে আসে ‘থমকে যাওয়া’ কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন।

বিশ্বকাপে ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের পেনাল্টি মিসের ইতিহাস অবশ্য খুব বড় নয়—এমন ঘটনা দেখা গেছে মাত্র দুবার। ২০১৪ বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে করিম বেনজেমার পর এমবাপ্পে মিস করেন পেনাল্টি।

এমবাপ্পের মিসের মুহূর্তে দেখা যায়, শট নেওয়ার মাঝপথে তিনি মরক্কো গোলকিপার ইয়াসিন বুনুর দিকে তাকিয়ে একটু থেমে গিয়েছিলেন। বুনু সহজেই নিজের বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্বল শটটি ঠেকান। এই পেনাল্টিতে থমকে যাওয়ার ধরনটি আসলে পরিচিত এবং বহুবার সফলও হয়েছে—নেইমারও পেনাল্টিতে এমনভাবে সফল হয়েছিলেন। দৌড়ে পেনাল্টি নেওয়ার সময় সামান্য থেমে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করাই এই আধুনিক কৌশলের মূল ভাবনা।

তবে প্রশ্ন উঠেছে—দ্রুত দৌড়ের মধ্যে থেমে যাওয়ার এই কৌশল থেকে সরে আসার সময় কি এখন?

ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বল কিক করার ঠিক আগমুহূর্ত ছাড়া দৌড়ানোর যেকোনো পর্যায়ে খেলোয়াড়েরা গতি কমাতে বা ছক পরিবর্তন করতে পারবেন। অতীতে জন অলড্রিজ, হুগো সানচেজ কিংবা পেলে পেনাল্টিতে সুবিধা পেতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। তবে গোলরক্ষক যদি আগেভাগেই কোনো একদিকে ঝাঁপ না দিয়ে নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন, তাহলে এই কৌশল উল্টো ফল দিতে পারে।

চলতি বিশ্বকাপেই শুধু এমবাপ্পে নন—পেনাল্টি নেওয়ার সময় গতি কমানোর পথে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন ব্রুনো গিমারাইস, জর্গেন স্ট্র্যান্ড লারসেন, লিওনেল মেসি ও হ্যারি কেইন। তবে কেইন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয়বার পেনাল্টির সুযোগ পেয়ে দ্বিতীয়বার থমকে না গিয়ে সাধারণভাবে নেওয়া শটে গোল করেন।

বিবিসি জানিয়েছে, এবার বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ মোট ২৬টি পেনাল্টি নেওয়া হয়েছে এই থমকে যাওয়া কৌশলে। এর মধ্যে ১১টি থেকে গোল আসেনি। অর্থাৎ এই কৌশলে গোল পাওয়ার হার মাত্র ৫৭ শতাংশ।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আইটিভিকে আর্সেনাল কিংবদন্তি ইয়ান রাইট এ বিষয়ে বলেন, ‘মনে হচ্ছে থমকে যাওয়ার কৌশল গোলরক্ষকেরা ধরে ফেলেছেন। তাঁরা এ ধরনের শটের গতিপ্রকৃতি বেশ ভালোভাবেই বুঝে গেছেন।’

তবে পাল্টা যুক্তিও আছে। মার্কো আরনাউতোভিচ, নেইমার, এমবাপ্পে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, কাই হাভার্টজ তো একই কৌশলে এবার পেনাল্টি থেকে গোল পেয়েছেন। তবু পরিসংখ্যান বলছে, থমকে না গিয়ে সাধারণ গতিতে দৌড়ে নেওয়া ৩৫ পেনাল্টির মধ্যে গোল হয়েছে ২৪টিতে—অর্থাৎ স্বাভাবিক কৌশলে সফলতার হার ৬৮ শতাংশ।

সব মিলিয়ে এবার বিশ্বকাপে পেনাল্টি থেকে গোলে সফলতার হার সন্তোষজনক নয়। এবারের বিশ্বকাপে টাইব্রেকার বাদে পেনাল্টি মিসের হার ৩০ শতাংশ। ১৯৬৬ সালে পেনাল্টির পরিসংখ্যান রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে যেকোনো বিশ্বকাপে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মিসের রেকর্ড। যদি টাইব্রেকারকেও এই হিসাবে যোগ করা হয়, তবে মিসের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে। ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি সর্বোচ্চ পেনাল্টি মিসের রেকর্ড।

ফ্রান্সের হয়ে এটি এমবাপ্পের দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস। জাতীয় দলে ১৬টি পেনাল্টির ১৪টিতেই গোল করেছেন। ক্লাব ফুটবলে সাফল্যের হার কিছুটা কম—৬২টি পেনাল্টিতে ৫০ গোল।

মরক্কোর বিপক্ষে গত রাতে এমবাপ্পের পেনাল্টি শটের সামনে ছিল কঠিন এক প্রতিপক্ষ। টাইব্রেকারসহ বুনু এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ৯টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়ে দুটিতে গোল হজম করেছেন। বাকি ৭টির মধ্যে ৪টি সেভ, ২টি পোস্টে লেগেছে এবং অন্যটি পোস্টের বাইরে ছিল। টাইব্রেকারসহ বিবেচনা করলে বিশ্বকাপে বুনু এখন যৌথভাবে সর্বোচ্চ পেনাল্টি সেভ করা গোলকিপার। এর আগে তাঁর সমান ৪টি সেভ করেছেন জার্মানি টনি শুমাখার, আর্জেন্টিনার গয়কোচিয়া, স্পেনের ক্যাসিয়াস ও ক্রোয়েশিয়ার লিভাকোভিচ।

চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে বলতাম, গোল্লায় যান—আনচেলত্তির ওপর ক্ষোভ উগরে দিলেন রোমারিও.

এমবাপ্পেকে পেনাল্টি নেওয়ার আগে অপেক্ষা করতেও হয়েছিল বেশ কিছুটা সময়। ভিএআরের হস্তক্ষেপের কারণে পেনাল্টির বাঁশি বাজা থেকে প্রায় ৩ মিনিট ১২ সেকেন্ড পর শটটি নেন এমবাপ্পে।

এ নিয়ে আইটিভিকে আয়ারল্যান্ডের সাবেক মিডফিল্ডার রয় কিন বলেন, ‘৩ মিনিটের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে বাধ্য করানোটা অন্যায়। এমন মুহূর্তে সময় হলো স্ট্রাইকারদের প্রধান শত্রু। দীর্ঘ অপেক্ষার সুবিধা গোলরক্ষক ও পেনাল্টি হজম খাওয়া দলই পায়।’

ম্যাচ শেষে এমবাপ্পের কথাতেও বোঝা যায়, পেনাল্টি শটটি নেওয়ার আগে দীর্ঘ অপেক্ষায় মনঃসংযোগে প্রভাব পড়ে। শুনুন তাঁর মুখেই, ‘উসমান বলটা আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। এরপর আমি কিক নেওয়ায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই রেফারি বললেন, এটা পেনাল্টি নয়...বলটা আবার তুলে নিয়ে মাঠে বসাই। রেফারি ফিরে এসে বললেন, হ্যাঁ, এটা পেনাল্টিই। কিন্তু এরপরই আবার বলেন, একটু দাঁড়াও, দুই মিনিট আগের একটি খেলার মুহূর্ত রিভিউ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত আমি মনোযোগ হারিয়ে ফেলি।’

এমবাপ্পের মনের মধ্যে আসলে কী ঘটেছিল, সেটির ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছেন ইয়ান রাইট, ‘পেনাল্টি নিতে যত বেশি সময় অপেক্ষা করতে হবে, নিজের নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনার মনে তত বেশি সংশয় তৈরি হতে থাকবে।’

এদিকে এমবাপ্পে–দেম্বেলেদের দুর্দান্ত ফ্রান্সকে থামাবে কে—সেই প্রশ্ন নিয়েই এখন ফুটবলপ্রেমীদের নজর পরের ম্যাচগুলোর দিকে।