শেষ বাঁশি বাজার কিছুক্ষণ পর বোস্টনের জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠল—‘থ্যাংক ইউ’। যেন স্টেডিয়ামেই বলে দিল, আজকের গল্প এখানেই শেষ। তবে গ্যালারির দুই প্রান্তে তখন লেখা হচ্ছিল একেবারে ভিন্ন দুই বাস্তবতা।

এক পাশে নীল জার্সির উচ্ছ্বাস—ফরাসি সমর্থকদের কণ্ঠে বিজয়ের গান, আলিঙ্গনে বাঁধভাঙা উল্লাস, আর সেমিফাইনালে ওঠার স্বস্তি। অন্য পাশে লাল জার্সির বুকভরা নীরবতা—অনেকেই আসন ছাড়তে পারছিলেন না, কেউ অপলক তাকিয়ে ছিলেন সবুজ ঘাসের দিকে, কারও চোখ বেয়ে ধীরে ধীরে নেমে আসছিল অশ্রু। বাবার হাত ধরে আসা ছোট্ট মরক্কান শিশুটিও হয়তো বুঝে গেছে, ‘আজ আর কোনো রূপকথা নেই’। কারণ, রূঢ় বাস্তবতা হলো ম্যাচটা ফ্রান্সই জিতে নিয়েছে ২-০ গোলে।

এ পরাজয়ের পরও মরক্কোর ডাগআউটে কোনো ভাঙনের সুর শোনা যায়নি। সেখানে ছিল ভবিষ্যতের প্রতি প্রতিজ্ঞার ভাষা। ম্যাচ শেষে মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ উয়াহবি মাথা উঁচু করেই বললেন, ‘আমরা শুধু একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করি না, মরক্কোর মানুষের পাশাপাশি এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশের মানুষের স্বপ্ন বহন করি। অনেকেই এই দলে নিজেদের খুঁজে পান। আজ আমরা হেরেছি, কিন্তু ভবিষ্যতে শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে আমাদের কাজ থামবে না।’

ফ্রান্সের ড্রেসিংরুমে দেখা গেল অন্য রকম আবহ। লক্ষ্যপূরণের পরও উচ্ছ্বাসের চেয়ে সংযমের আবরণটাই বেশি স্পষ্ট ছিল। ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশমে বলেন, ‘আমরা ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছেছি, যেখানে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। এখন নিজেদের পুনরুদ্ধার করব, তারপর ফাইনালের প্রস্তুতি নেব। ফ্রান্সজুড়ে নিশ্চয়ই এখন উৎসব চলছে। কিন্তু আমরা এখনো আমাদের কাজের মধ্যেই আছি। খেলোয়াড়দের দায়িত্ব যতটা সম্ভব এগিয়ে যাওয়া। আমরা একটি বড় বাধা পেরিয়ে এসেছি।’

দুই কোচের এই দুই বক্তব্য যেন একই ম্যাচের দুটি আলাদা অধ্যায়। একটিতে পরাজয় মানিয়েও সামনে তাকানোর সুর, অন্যটিতে জয় পেয়েও আরও বড় চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুতির কথা।

মাঠের চিত্রটা মূলত ফ্রান্সময়ই ছিল। অতীতে মরক্কোর রূপকথা দেখে অভ্যস্ত দর্শকদের জন্য প্রথমার্ধের মরক্কোকে চেনা কঠিন ছিল। নিজেদের চেনা গোছানো আক্রমণ দেখা যায়নি, লক্ষ্যভেদী শটও কম ছিল, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার মতো সাহসী ফুটবল খেলতে পারেনি তারা। নিজেদের জাল অক্ষত রাখতে ব্যস্ত ছিল ‘আফ্রিকার সিংহদের’ দল। দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা থাকলেও ফ্রান্সের আক্রমণের ধার আর কৌশলের সামনে বেশিক্ষণ টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।

ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার কৃতিত্বও যায় এক জনের কাঁধেই—কিলিয়ান এমবাপ্পে। ৬০ মিনিটে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সের প্রান্তে নিজের ‘গোল্ডেন জোনে’ বল পেয়ে যান। সেখান থেকে নেওয়া এমবাপ্পের দুর্দান্ত শট মরক্কোর জাল কাঁপিয়ে দেয়—এবারের বিশ্বকাপে তাঁর অষ্টম গোল। প্রথম গোল হজম হওয়ার পর মরক্কোর রক্ষণভাগ আরও ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। সুযোগ কাজে লাগাতে ফ্রান্স সময় নেয়নি; ঠিক ছয় মিনিট পরই ব্যবধান দ্বিগুণ করেন উসমান দেম্বেলে।

এরপর বাকি সময়টা অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতার রং পায়। মরক্কোর এলোমেলো আক্রমণে ম্যাচে ফেরার কোনো আভাস ছিল না; বরং ফ্রান্সই এগিয়ে যেতে থাকে জয়ের সুবাস ছড়াতে ছড়াতে।

এমন ম্যাচেও মরক্কোর সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ইয়াসিন বুনু। ২৮ মিনিটে এমবাপ্পের পেনাল্টি শট চিলের মতো ছোঁ মেরে আটকে দেন এই গোলরক্ষক। ফ্রান্সের জার্সিতে টানা ১৫টি স্পট-কিকে সফল হওয়ার পর এই প্রথম ব্যর্থতার খাতায় নাম লেখালেন এমবাপ্পে।

তবে বুনুর পারফরম্যান্সের পরিসংখ্যানও বলছে—বিশ্বকাপে টাইব্রেকারসহ মোট ৯টি পেনাল্টির মুখোমুখি হয়ে গোল হজম করেছেন মাত্র ২টিতে। ৪টি শট তিনি নিজেই ঠেকিয়েছেন, অন্য ৩টি লক্ষ্যভ্রষ্ট। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর থেকে টাইব্রেকারসহ সর্বোচ্চ ৪টি পেনাল্টি রক্ষার যে কীর্তি ইকার ক্যাসিয়াস বা ডমিনিক লিভাকোভিচদের আছে, সেই অমরত্বের কাতারে এখন সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছেন বুনুও।

মাঠে যে ব্যবধান তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রেখেই ফ্রান্স এগিয়ে যায়—কীভাবে থামবে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের এই ফ্রান্সকে—সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।