সেটা ছিল ২০২২ বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় স্পেনের বিপক্ষে ম্যাচ। টাইব্রেকারে আশরাফ হাকিমির শট জালে। মরক্কোও ওই শটে পৌঁছে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। কিলিয়ান এমবাপ্পে যেন তৈরিই ছিলেন। ‘আশরাফ হাকিমি—দুই শব্দের এই স্ট্যাটাসের সঙ্গে তিনটি ইমোজি পোস্ট করেন এক্সে (তখন টুইটার)। রাজার মুকুট, হার্ট ও পেঙ্গুইন।
পেঙ্গুইন কেন? ওই স্ট্যাটাসের কয়েক মুহূর্ত আগে টাইব্রেকারে গোলটি করে পেঙ্গুইনের আদলে উদ্যাপন করেন হাকিমি। এমবাপ্পের কাছে সেই উদ্যাপন অচেনা নয়। পিএসজিতে গোল করার পর ওটাই ছিল দুই বন্ধুর চিরচেনা উদ্যাপন।
.এমবাপ্পে–হাকিমির বন্ধুত্বের গল্প অনেকেরই জানা। এটাও নিশ্চয়ই জানা যে সর্বশেষ সেই বিশ্বকাপের বছরেই শুরুতে কাতারে গিয়ে একটি ভিডিও করেছিলেন দুই বন্ধু। একে অপরকে বলেছিলেন, এখানে আমরা মুখোমুখি হব। মুখোমুখি তাঁরা হয়েছিলেন বটে, সেমিফাইনালে ফ্রান্স–মরক্কো লড়াইয়ের মোড়কে সেটা হয়ে গিয়েছিল দুই বন্ধুর দ্বৈরথ। বন্ধু তুমি, শত্রু তুমি! এমবাপ্পে তাতে জিতলেও বন্ধুর জন্য সহমর্মিতাটুকু ছিল।
বোস্টনে আজ রাতেও যে সেই আবেশ থাকবে, তা এখনই বলে দেওয়া যায়। এবারের মঞ্চটা কোয়ার্টার ফাইনাল। কিন্তু ফ্রান্স–মরক্কো লড়াই শুধু শিরোনামই। ভেতরে সিংহভাগই তো বন্ধু থেকে আবারও শত্রু বা প্রতিপক্ষ হয়ে যাওয়ার গল্প! ফুটবলে এক অসাধারণ বন্ধুত্বের গল্পকে দেড়–দুই ঘণ্টার জন্য ভুলে এমবাপ্পে–হাকিমি মুখোমুখি হবেন মাঠের একই প্রান্তে। হাকিমি যে রাইটব্যাক, আর এমবাপ্পেও মাঠে ঠিক ওই অঞ্চল দিয়ে ত্রাসের সঞ্চার করেন। সেখানে বন্ধুকে থামাতে তাই ‘অ্যাটলাস পর্বত’ হয়ে দাঁড়াতে হবে হাকিমিকে। সেটা টপকাতে এমবাপ্পেকে আবার হতে হবে ফরাসি ‘রাফাল যুদ্ধবিমান’।
.বিমান ও পর্বতের রূপে দুজনকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে গিয়ে মিলের গল্পটাই বেশি উঠে আসে অবশ্য। তাঁরা নিজ নিজ দলের সেরা তারকা, অধিনায়কও। গান, সিনেমার রুচিতেও অমিল নেই। ঠাসা খেলার সূচির মধ্যে একটু ফুরসত পেলেই চলে যান একসঙ্গে ছুটি কাটাতে। পিএসজিতে থাকতে ব্যাপারটা বেশি হতো। এমবাপ্পে ২০২৪ সালে পিএসজি ছেড়ে রিয়ালে যোগ দেওয়ার পর মুখ দেখাদেখি হয়তো একটু কমেছে, কিন্তু আত্মিক সংযোগে ‘হরিহর আত্মা’ তাঁরা এখনো।
সেই সংযোগের শুরু ২০২১ সালে, হাকিমি যখন পিএসজিতে যোগ দিলেন। ভাষাগত সমস্যা সমাধানে দুজনের কাছে আসার শুরু। মাদ্র্রিদে জন্মানো হাকিমির মুখে স্প্যানিশ ভাষার খই ফুটলেও ফরাসি ভাষা জানতেন না। এমবাপ্পে আবার একটু একটু স্প্যানিশ পারতেন। বাকিটা শুনুন হাকিমির মুখেই, ‘(বন্ধুত্ব) একদমই সহজাতভাবে শুরু। ফুটবলের বাইরে আমরা খুব ভালো বন্ধু। আমি ফরাসি ভাষা জানতাম না, ও স্প্যানিশ পারে একটু। যখনই আমার কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হতো, ও আমার পাশে দাঁড়াত। ওর দরকারেও আমি দাঁড়িয়েছি।’
মজার ব্যাপার, পৃথিবীর বুকেও দুজনের দাঁড়ানো (জন্ম) একই সময়ে। ১৯৯৮ সালে, পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে। পিএসজির সেই দিনগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাকিমিকে নিয়ে পোস্টে সে জন্যই কি ‘আমার ভাই’ বলে সম্বোধন করেছেন এমবাপ্পে!
.কাতার বিশ্বকাপ ফেরাতে পারবে ফ্রান্স, না কি মরক্কোর নতুন গল্প.বোস্টনে তাহলে কি আজ ভাইয়ে ভাইয়ে যুদ্ধ? কেমন হতে পারে যুদ্ধের আঁচটা, সেটা দুই বন্ধুর তরফ থেকে এখনো জানা যায়নি। তবে আন্দাজ করে নেওয়া যায় সর্বশেষ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হওয়ার আগে দুজনের কথা থেকে। এমবাপ্পে বলেছিলেন, ‘আমাকে আমার বন্ধুকে ধ্বংস করতে হবে।’ হাকিমির জবাব ছিল, ‘তাকে আমি মারব।’
দুজনেই যে ‘মিথ্যা’ বলেছিলেন, তা বোঝা গিয়েছিল ম্যাচের পরই। বিশ্বকাপে সেই প্রথম সাক্ষাতে ফ্রান্স ২–০ গোলে জেতার পর বুকে বুক মিলিয়েছিলেন দুই বন্ধু। বদল হয়েছিল জার্সি। শুধু হৃদয়টা থেকে গিয়েছিল অভিন্ন।
.সেই অভিন্ন হৃদয় কতটা একসূত্রে গাঁথা, এমবাপ্পে তা বলেছেন গত এপ্রিলে এক পডকাস্টে, ‘হাকিমির মতো মরক্কোর কারও সঙ্গে আমি এর আগে মিশিনি।’
মিশতে মিশতে এমবাপ্পে কিন্তু মরক্কোর খাবারেরও ভীষণ ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। গত বছর ডিসেম্বরে আফকন চলাকালে এমবাপ্পে হাকিমিদের খেলা দেখতে গিয়েছিলেন মরক্কোয়। তখন এমবাপ্পের ভেতরের খবর ফাঁস করেছিলেন হাকিমি, ‘সে মরক্কোকে খুব পছন্দ করে। সময় পেলেই পরিবার নিয়ে চলে আসে। মরোক্কান খাবার পছন্দ করে। আমার বন্ধুর আমার দেশে আসা খুবই আনন্দের বিষয়।’
ঝামেলা হচ্ছে, বোস্টনে সেই আনন্দটুকু বেশ কিছুক্ষণ থাকবে না। কী হবে বলুন তো? ফল যা–ই হোক, ১০ ও ২ নম্বর জার্সি যে হাতবদল হচ্ছে, তা বোধ হয় নিশ্চিত।
.আর্জেন্টিনা–মিসর ম্যাচে রেফারিং বিতর্ক নিয়ে ব্যাখ্যা দিল ফিফা





