কাতারের আল বাইত আর বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামের মধ্যবর্তী দূরত্ব ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি হলেও, আজ বোস্টনের মাঠে ফিরে আসছে চার বছর আগের কাতারের স্মৃতি। বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্স ও মরক্কো।
ফুটবলীয় ঐতিহ্যের বিচারে দুই দলের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। ফ্রান্স যেখানে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, সেখানে মরক্কো মাত্র একবার সেমিফাইনাল খেলেছে। সেটিও ছিল গত বিশ্বকাপের কাতার আসরে, যেখানে মরক্কোকে পরাজিত করে ফাইনালে উঠেছিল ফ্রান্স। তবে গত চার বছরে শক্তির এই ব্যবধান যে কমে এসেছে, তা মরক্কোর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে স্পষ্ট।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষস্থানে থাকা ফ্রান্সের বিপরীতে মরক্কো বর্তমানে ৭ নম্বরে অবস্থান করছে। ধীরে ধীরে আফ্রিকার ফুটবলের বিজ্ঞাপন হয়ে উঠছে মরক্কো। নাটকীয় ও বিতর্কিত এক সিদ্ধান্তের পর তারা এ বছর আফ্রিকান নেশন্স কাপ জয় করেছে। চলতি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করে শুরু করা মরক্কো এরপর হাইতি ও স্কটল্যান্ডকে হারিয়ে গ্রুপ পর্ব পার করে। নকআউট পর্বে নেদারল্যান্ডস ও কানাডাকে পরাজিত করে এখন তারা বড় স্বপ্নের পথে।
অন্যদিকে, দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে চলছে ফ্রান্স। শেষ সাতটি ম্যাচেই তারা জয়ী। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসে—এই তিন তারকা প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এমবাপ্পে এখন পর্যন্ত সাত গোল করে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে লিওনেল মেসির ঠিক পেছনে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে, এই আসরে ফ্রান্সের একমাত্র হ্যাটট্রিকটি করেছেন দেম্বেলে।
গোল করার পাশাপাশি অ্যাসিস্টের দায়িত্ব নিয়েছেন ওলিসে, যার খতিয়ানে এখন পর্যন্ত পাঁচটি অ্যাসিস্ট। আর একটি অ্যাসিস্ট করতে পারলে তিনি এক বিশ্বকাপে পেলের ছয় অ্যাসিস্টের রেকর্ড স্পর্শ করবেন। উইলিয়াম সালিবার প্রত্যাবর্তনে ফ্রান্সের রক্ষণভাগ আরও শক্তিশালী হয়েছে। এছাড়া দলের গভীরতা তাদের বড় শক্তি; শেরকি, দুয়ে এবং থুরামদের মতো খেলোয়াড়রা বেঞ্চ থেকে এসেও ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। তবে মধ্যমাঠের ভরসা অরেলিয়েন চুয়ামেনির চোটের কারণে আজকের ম্যাচে তার অংশগ্রহণ অনিশ্চিত, যা দেশমের জন্য একমাত্র দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে।
গ্রুপ পর্বে সেনেগাল, ইরাক ও নরওয়েকে হারানো ফ্রান্স শেষ ৩২-এ সুইডেনকে সহজেই পরাজিত করে। তবে শেষ ষোলোর ম্যাচে প্যারাগুয়ে এমবাপ্পেদের কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছিল। সেই ম্যাচের পর এমবাপ্পে বলেছেন, “দরকার হলে তারাও শরীরী ফুটবল খেলতে পারেন।”
আজ হয়তো দিদিয়ের দেশমের দলকে তেমন কিছু করতে হবে না। ব্রাজিল ও নেদারল্যান্ডসের মতো দলের বিপক্ষে যেভাবে লড়াই করেছে মরক্কো, ফ্রান্সের বিপক্ষেও তারা স্বাভাবিক খেলাটি খেলতে চাইবে। মোহাম্মদ উয়াহবির দল ট্যাকটিক্যালি বেশ গোছানো এবং তাদের দলে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট খেলোয়াড় রয়েছেন। তবে চোটের কারণে তিন গোল করা ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারি আজ মাঠে নামছেন না।
মধ্যমাঠে আজ্জেদিন উনাহি গত ম্যাচেই দুটি গোল করেছেন এবং রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াজও নিজের দক্ষতা দেখিয়েছেন। গোলপোস্টের নিচে ভরসা হিসেবে আছেন নেদারল্যান্ডস ম্যাচে টাইব্রেকার জয়ের নায়ক ইয়াসিন বনু। দলের এই সংহতির পেছনে বড় কৃতিত্ব কোচ উয়াহবির। ফ্রান্স ম্যাচের আগে তিনি প্রতিপক্ষকে বার্তা দিয়ে বলেছেন, “আজ আমরা আর কোনো চমক নই, আর এটাই আমাদের বড় গর্বের জায়গা।”
মরক্কো যে কেবল চমক নয়, তা আফ্রিকার ফুটবল প্রেমীরা আগে থেকেই জানেন। বাছাইপর্ব পেরিয়ে বিশ্বকাপ খেলা এবং শেষ ষোলোতে যাওয়া প্রথম আফ্রিকান দল তারা। ফ্রান্সকে হারাতে পারলে তারা হবে টানা দুই বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠা সপ্তম দল। অন্যদিকে, জয়ী হলে ফ্রান্স হবে টানা তিন বিশ্বকাপে অন্তত সেমিফাইনালে পৌঁছানো তৃতীয় দল।
দুই দেশের সম্পর্ক কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘ সময় মরক্কো ছিল ফরাসি উপনিবেশ এবং বর্তমানে ফ্রান্সে সাত লাখের বেশি মরোক্কান বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করেন। ফলে সাবেক উপনিবেশ ও ঔপনিবেশিক শাসকের এই লড়াই স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচের চেয়েও বেশি কিছু।






