হেরা গুহার নিঃসঙ্গ অন্ধকারে ইসলামের প্রথম বাণী নেমেছিল একটি মাত্র শব্দ নিয়ে—‘ইকরা’, যার অর্থ পড়ো (সুরা আলাক, আয়াত: ১)। এই একটি শব্দই পড়ার সংস্কৃতির ওপর মুসলিম সভ্যতার ভিত্তি স্থাপন করেছিল। কোরআন হয়ে উঠেছিল মুসলিম উম্মাহর প্রথম সংকলিত গ্রন্থ এবং আব্বাসীয় আমলে সেই অনুরাগের সূত্র ধরেই জন্ম নিয়েছিল অসংখ্য ব্যক্তিগত ও পাবলিক পাঠাগার। বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ ছিল তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্ঞানের গৃহ, যার ধ্বংসযজ্ঞের কথা আজও ইতিহাসপ্রেমীদের মনে গভীর ক্ষত রেখে যায়।

অতীত সোনালি হলেও বর্তমানের দিকে তাকালে দেখা যায়, আমাদের অনেকের কাছে পড়ার অভ্যাস এখনো তেমন গুরুত্ব পায়নি। অভিভাবকেরা আক্ষেপ করেন যে, সন্তানরা স্মার্টফোনের স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকে, কিন্তু তাদের সামনে বিকল্প কিছু তুলে দেওয়ার কথা ভাবেন না। অথচ বই পড়ার গুরুত্ব অপরিসীম।

"উপন্যাসের চরিত্রের ভুলত্রুটি থেকেও মানুষ শেখে, শিশুদের কল্পনাশক্তি বাড়ে রূপকথায়। তবে এখানে সতর্কতা জরুরি—শুধু লেখকের নাম মুসলিমসুলভ হলেই বই তোলা যাবে না।"

বর্তমানে বইয়ের আকাশছোঁয়া দামের কারণে সন্তানদের জন্য সুস্থ পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে গিয়ে লেখক নিজের এলাকায় একটি পাড়াভিত্তিক ‘মুসলিম পাঠকেন্দ্র’ গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।

লাইব্রেরি শুরুর আগে প্রধান প্রশ্নটি হলো বইয়ের ধরন নিয়ে। এটি কি কেবল ধর্মীয় গ্রন্থের ‘ইসলামি পাঠাগার’ হবে, নাকি ‘মুসলিম পাঠকেন্দ্র’? ইসলামি পাঠাগারের মূল লক্ষ্য থাকে তাফসির, হাদিস, ফিকহ, আকাইদ এবং নির্ভরযোগ্য ইতিহাসগ্রন্থের মতো ধর্মীয় জ্ঞানচর্চায়। এটি সাধারণ পাঠক, গবেষক এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিরাট নিয়ামত, যাঁদের পক্ষে দামি কিতাব কেনা সম্ভব নয়। তবে মুসলিম পাঠকেন্দ্রর পরিধি আরও বিস্তৃত। এখানে ধর্মীয় বইয়ের পাশাপাশি সুস্থ ধারার গল্প, উপন্যাস, সায়েন্স ফিকশন ও রূপকথার স্থান থাকে, যা সরাসরি বিধান না শেখালেও জীবনবোধ জাগিয়ে তোলে। তবে বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কারণ বাজারে এমন কিছু বই আছে যা ছদ্মবেশে মূল্যবোধকে হেয় করে বা কিশোর মনে বিভ্রান্তি ছড়ায়।

পাঠকেন্দ্রটি কোথায় স্থাপন করা হবে—মসজিদের কোনো কোণে, মাদ্রাসার কক্ষে নাকি আলাদা কোনো জায়গায়—তা আগে নির্ধারণ করা জরুরি। মসজিদের ক্ষেত্রে কমিটির অনুমোদন এবং তাদের অভ্যন্তরীণ নীতি মেনে চলা আবশ্যক। বিশেষ করে নির্দিষ্ট মাজহাব-ঘেঁষা মসজিদে ভিন্নমতের ফিকহি বই রাখা নিয়ে জটিলতা হতে পারে, তাই শুরুতেই একটি লিখিত পরিকল্পনা দায়িত্বশীলদের সামনে উপস্থাপন করা বুদ্ধিমানের কাজ।

"যেকোনো মহৎ উদ্যোগের ভিত্তি আসলে ইখলাস, নিয়তের সততা আর ধারাবাহিকতা। সমালোচনা বা প্রতিবন্ধকতায় উৎসাহ হারিয়ে ফেললে চলবে না।"

বই সংগ্রহের জন্য তিনটি উৎস কার্যকর হতে পারে। প্রথমত, সমাজের বিত্তবান ও সংস্কৃতিমনা মানুষের কাছ থেকে নগদ অর্থ বা বইয়ের অনুদান। তবে দান করা বইয়ের মান যাচাই করে নেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, মসজিদ কমিটির মাসিক বাজেট বরাদ্দ অথবা প্রকাশনীগুলোর সৌজন্যে নতুন বই সংগ্রহ। তৃতীয়ত, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বা অলাভজনক দাতব্য সংস্থার অনুদান। এছাড়া নীলক্ষেত বা বাংলাবাজারের পুরোনো বইয়ের দোকান এবং প্রকাশনীর বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে অল্প বাজেটে অনেক বই সংগ্রহ করা সম্ভব।

পাঠাগার খোলা যতটা আনন্দের, তা সচল রাখা ততটাই ধৈর্যের কাজ। খোলার সময়, বইয়ের হিসাব এবং ফেরত না দেওয়ার নিয়মগুলো আগে থেকে ঠিক করা প্রয়োজন। বর্তমানে ‘হ্যান্ডি লাইব্রেরি’র মতো অ্যাপ বা বড় পরিসরে ‘রিসোর্স মেট’ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ডেটাবেজ তৈরি করা যায়। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি একজন নিবেদিতপ্রাণ ভলান্টিয়ার এবং একটি স্পষ্ট লিখিত নীতিমালা থাকা অপরিহার্য।

"দেড় হাজার বছর আগে হেরার অন্ধকারে যে ‘ইকরা’ প্রথম নেমে এসেছিল, আমাদের পাড়ার ছোট্ট একটা পাঠকেন্দ্রও হতে পারে সেই একই ডাকের প্রতিধ্বনি।"

একটি সফল লাইব্রেরি কেবল বইয়ের তাকে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পাড়ার সুস্থ সংস্কৃতির কেন্দ্রে পরিণত হয়। শিশুদের গল্প বলা, তরুণদের বুক রিভিউ প্রতিযোগিতা এবং লেখকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মতো আয়োজন মহল্লার পরিবেশ বদলে দিতে পারে।

যেকোনো মহৎ উদ্যোগের ভিত্তি হলো ইখলাস, নিয়তের সততা এবং ধারাবাহিকতা। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল তা-ই, যা নিয়মিত করা হয়—পরিমাণে যতই কম হোক না কেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)। তাই ক্ষণিকের আবেগে প্রকল্প শুরু করে মাঝপথে ছেড়ে দিলে মানুষের আস্থা নষ্ট হয়; এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

প্রতিটি মহল্লায় এমন আলোর প্রদীপ জ্বলে উঠুক, যা পরবর্তী প্রজন্মকে সুস্থ, মননশীল এবং ধর্মভীরু নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলবে। আল্লাহ এই প্রচেষ্টাকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে কবুল করুন।