দাপ্তরিক প্রয়োজনে নেপাল সফরে গিয়ে উঠেছিলাম পাহাড়ঘেরা এক মনোরম হোটেলে। হোটেলের সুইমিংপুলের পাশে ঘন সবুজ বেষ্টনীতে ফুটে থাকা হলুদ ফুলগুলো প্রথম দর্শনেই মন কেড়ে নিয়েছিল। স্ত্রী রূপা ফুল খুব ভালোবাসে, তাই ভাবলাম এই ফুলের বীজ যদি দেশে নিয়ে যাওয়া যেত! কিন্তু অনেক খুঁজেও কোনো বীজ পাচ্ছিলাম না।
একদিন বেড়ার ওপাশ থেকে এক লোক এসে সামনে দাঁড়ালেন। আমি নেপালি ভাষা জানি না, তাই হিন্দিতেই কথা বলার চেষ্টা করলাম। যদিও আমার হিন্দি বলা নিয়ে পুরনো এক তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। ভারতে থাকাকালীন একবার এক রেস্তোরাঁর ওয়েটারকে বকশিশ হিসেবে আট আনা দিয়েছিলাম। পরদিন তাকে তা বোঝাতে গিয়ে বলেছিলাম, ‘আগলা দিন ম্যায়নে আপকো এক আধুলি দিয়া থা।’ সে উত্তর দিয়েছিল, ‘হু, এক আধানি দি থি।’ এরপর আমি তাকে জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম সে কিছু মনে করেছে কি না, কিন্তু শব্দ খুঁজে না পেয়ে বলে বসলাম, ‘ইস লিয়ে তুমকো তবিয়ত খারাপ হোয়া।’ সে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘ইসসে মেরি তাবিয়ত খারাব কিউঁ হোগি?’ আমি পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে আরও ভুল করে বললাম, ‘ইস লিয়ে তুমকো দেমাগ গড়বড় হুয়া?’ এতেই হুলুস্থুল কাণ্ড বেধে গেল, কারণ ‘দেমাগ গড়বড়’ মানে যে পাগল হয়ে যাওয়া, তা আমার জানা ছিল না। সে রেগে চিৎকার করে লোক জড়ো করে বলল, ‘এক মামুলি-সি আধানিকে লিয়ে মেরা দিমাগ কিউঁ গড়বড় হোগা? কেয়া, ম্যায় এতনা মিসকিন হু? ফকির হু?’
সেই ভীতি নিয়েই নেপালের সেই লোকটিকে দেখে আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই হলুদ ফুলের নাম কী? এটা কী গাছ?’ তিনি কিছু বুঝলেন না দেখে আমি আমার নিজস্ব ঢঙে হিন্দি আওড়ালাম, ‘ইয়ে হলুদ ফুল কা নাম কিয়া হ্যায়? কোনসা গাছ ইয়ে?’ এরপর আরও বুঝিয়ে বললাম, ‘মেরা এক বিবি হ্যায়। মেরা বিবিকা নাম রূপা হ্যায়। ও দেশমে রাইতা হ্যায়। মেরা বিবি রূপা ফুল বহুত ভালোবাসতা হ্যায়। মানে পেয়ার করতা হ্যায়। উনকো লিয়ে ম্যায় ইয়ে গাছকো হলুদ ফুলকা বীজ ঢুরতা হ্যায়।’ মালি কোনো কথা না বলে শুধু মোলায়েম চোখে তাকিয়ে রইলেন।
পরদিন ফেরার আগে আবার সেখানে গেলাম। হঠাৎ সেই মালি উদয় হয়ে আমার হাতে একটি লিকলিকে চারা তুলে দিলেন। আবেগের আতিশয্যে তাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘ম্যায় তুমকো বহুত পেয়ার করতা হ্যায়।’ অনেক কসরত করে ইমিগ্রেশনের চোখ বাঁচিয়ে সেই চারা দেশে নিয়ে এলাম। রূপাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, ইয়ে হলুদ ফুলওয়ালা গাছকা নাম কিয়া হ্যায়?’ রূপা হেসে উত্তর দিল, ‘হলুদ কাঞ্চন।’ আমি আহ্লাদে বললাম, ‘জরুর আচ্ছা। টব মে লাগা দো। ইয়ে গাছ মে বহুত ছুন্দর ফুল আ যাতা।’
ছাদবাগানে হাফড্রামে লাগানো সেই গাছ বড় হতে সময় নিল দীর্ঘ পাঁচ বছর। একদিন রূপার প্রচণ্ড জ্বর, সেই অবস্থাতেই সে ছাদে গিয়ে আমায় ডেকে বলল, ‘দীপু, তোমার নেপালের গাছে দেখো ফুল এসেছে।’ আমি গিয়ে তো অবাক! যে গাছে হলুদ ফুল ফোটার কথা, সেখানে ফুটে আছে নীল আর সাদার মিশেলে অপরাজিতার মতো এক অদ্ভুত ফুল। রূপা জ্বরের ঘোরেই হেসে বলল, ‘এত দিন পরে এখন কেন এই গাছে ফুল ফুটেছে বুঝতে পারছ! এ হচ্ছে বিশ্বকাপ সিজনের ফুল। আমি আর্জেন্টিনার সাপোর্টার। তা-ই গাছের হলুদ ফুল হয়ে গেছে নীল-সাদা।’
রূপার কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আনন্দে না কষ্টে জানি না, আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।






