ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসে হাঁটতে হাঁটতে একদল তরুণের চোখে কিছু স্বপ্ন জমা হয়েছিল। সেটি ২০০৫ সালের কথা। এরপর পড়াশোনা শেষ করে কেউ যোগ দিলেন করপোরেট চাকরিতে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায়, আবার কেউ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও ১৫ জন বন্ধু, সিনিয়র ও জুনিয়র মিলে বাস্তবে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন দুই দশক আগে দেখা সেই স্বপ্ন।
তিল তিল করে জমানো টাকায় সম্মিলিত প্রয়াসে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে ও নওগাঁর নিয়ামতপুরে তাঁরা গড়ে তুলেছেন ৪৫ বিঘার তিনটি বাগান। সেখানে ফলছে বিভিন্ন জাতের আমসহ নানা রকমের ফল। অনেকটাই জৈব ও আধুনিক উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করে নিরাপদ ফল উৎপাদন করছেন তাঁরা।
‘গ্রোয়ার্স গ্রুপ’ নামে এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের চেয়ে তাঁদের কাছে পরিবার–পরিজন, পরিচিত নিকটজন ও সাধারণ মানুষের জন্য দূষণমুক্ত নিরাপদ ফলের জোগান দেওয়াই মুখ্য। পাশাপাশি এই উৎপাদন–পদ্ধতি আশপাশের অন্যান্য চাষির মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ারও ইচ্ছা তাঁদের। সম্মিলিতভাবে এ কাজের মধ্য দিয়ে তাঁদের বহুদিনের বন্ধুত্বের বন্ধনও অটুট রয়েছে।
.গ্রোয়ার্স গ্রুপের নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার চৌড়াপাড়া এলাকার একটি মিশ্র ফলবাগানে গিয়ে দেখা যায়, আমগাছগুলোয় থোকায় থোকায় ঝুলছে নানা জাতের ডাঁসা ডাঁসা আম। বিকেলের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে মৃদুমন্দ বাতাসে দোল খাচ্ছে আমগুলো। পাশেই সারি সারি গাছে ধরে আছে কচি আনার। পাশের বাগানে ড্রাগনের গাছেও ফল এসেছে।
এ সময় উদ্যোক্তাদের একজন মফিজুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) পড়ার সময়ে তাঁরা এই উদ্যোগের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁদের এক করেছিল নিরাপদ খাদ্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেন, ‘করোনা মহামারির ক্রান্তিকালের পর ২০২১ সালের জুলাইয়ে আমরা যখন নতুন করে আমবাগান গড়ার স্বপ্ন বুনি, তখন থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট—আমরা এমন এক উৎপাদন–পদ্ধতি অনুসরণ করব, যা মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করবে এবং মানুষকে দেবে সম্পূর্ণ নিরাপদ ফল। সেই ভাবনা থেকেই আমরা জৈব ও অজৈব পদ্ধতির এক চমৎকার সমন্বয় (ইন্টিগ্রেটেড ক্রপ ম্যানেজমেন্ট) গড়ে তুলেছি।’
.চাকরির ফাঁকে রেজাউলের গড়ে তোলা বাগানে অর্ধশতাধিক জাতের আমগাছ.উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসের শুরুতে নিয়মিতভাবে প্রত্যেকে ২০০০ টাকা করে জমা করতে থাকেন। এরপর ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ৩০০০ টাকা করে জমা করতে থাকেন। এতে ১৫ জনের প্রত্যেকের সাড়ে ছয় লাখ টাকা করে জমা হয়। সবার প্রায় কোটির পুঁজি নিয়ে গ্রোয়ার্স গ্রুপ গঠন করে ৪৫ বিঘা জমি ১২ বছরের জন্য বন্দোবস্ত নিয়ে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তোলার কাজে নেমে পড়েন তাঁরা। এ সময় তাঁরা প্রত্যেকে আরও ৫০ হাজার টাকা করে এককালীন জমা দেন।
উদ্যোক্তারা জানান, নিয়ামতপুরের চৌড়াপাড়া মুৎসুদ্দিমোড়েদুটি ও নাচোলের সবদলপুরে একটি মিশ্র ফলের বাগানে রয়েছে। সেখানে নানা জাতের আম, মাল্টা, কমলা, কলা, লংগান, ড্রাগন, বিদেশি জাম্বুরা ও আনার (বেদানা) চাষ করা হচ্ছে। গত দুই বছর থেকে আশাব্যঞ্জক ফলন পাওয়া যাচ্ছে। যে হারে ফলন পাওয়া যাচ্ছে, তাতে আগামী তিন বছরের মধ্যে তাঁদের লগ্নি করা পুঁজি উঠে আসবে। এরও বেশি উঠে আসতে পারে বলে ধারণা করছেন তাঁরা।
.চাষপদ্ধতি সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে উদ্যোক্তা মফিজুর রহমান বলেন, চারা রোপণের সময় প্রতি গর্তে ৩০ থেকে ৪০ কেজি সম্পূর্ণ পচা গোবর সার ব্যবহার করা হয়, যা মাটির প্রাণশক্তি ধরে রাখে। প্রতিবছর স্থানীয় কৃষকদের বাড়ি থেকে সরাসরি মানসম্মত এই জৈব সারা সংগ্রহ করেন তাঁরা। গাছের বয়স এবং আকার মেপে সুষমভাবে এই জৈব সার প্রয়োগ করা হয়, যার সঙ্গে অত্যন্ত সামান্য পরিমাণে যোগ করা হয় প্রয়োজনীয় অজৈব সার।
মাটিকে রোগমুক্ত ও জীবন্ত রাখতে ওই জৈব সারের সঙ্গে উপকারী ছত্রাক ট্রাইকোডার্মা এস্প্রেলাম (ইকোডার্মা) ব্যবহার করা হয়। এটি গাছের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা যেমন বাড়িয়ে দেয়, তেমনই মাটির পুষ্টি উপাদানগুলোকে সহজেই গাছের গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
বালাই দমনের ক্ষেত্রেও প্রাকৃতিক ও জৈব পদ্ধতি ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বলে জানান মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা বাগানে ক্ষতিকর পোকা পর্যবেক্ষণের জন্য ইয়েলো স্টিকি ট্র্যাপ ব্যবহার করি। প্রিমিয়াম জাতের আমগুলোকে মাছি পোকার আক্রমণ থেকে বাঁচাতে আমরা আধুনিক ফ্রুটস ব্যাগ ব্যবহার করি। এর ফলে আমের গায়ে কোনো কীটনাশক সরাসরি স্পর্শ করতে পারে না। অতি জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া রাসায়নিক বালাইনাশক একেবারেই ব্যবহার করি না। যদি কখনো ব্যবহার করতেই হয়, তবে ফল সংগ্রহের অন্তত ১৫-২০ দিন আগেই তা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।’
সাধারণ পদ্ধতির চেয়ে এই পদ্ধতিতে বালাই দমন অনেক সাশ্রয়ী বলে দাবি করে মফিজুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সমপরিমাণ একটি বাগানে যেখানে বালাইনাশক বাবদ প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ হয়, সেখানে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে আমাদের খরচ হয় মাত্র ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা।’
.আমের বাগান করে কলেজছাত্র ইমনের আয় বছরে দুই লাখ টাকা.বাগানগুলোর মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সরাসরি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের ল্যাবে নিয়মিত মাটি পরীক্ষা করা হয়। মাটির অম্লতা বা ক্ষারত্ব পরীক্ষা করে ল্যাবের নির্দেশিকা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট মাত্রায় ডলোমাইট ব্যবহার করে মাটির পিএইচ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। শুধু তা–ই নয়, মাটি পরীক্ষার প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারণ করা হয় কোন বাগানে কোন সার ঠিক কতটুকু পরিমাণে দিতে হবে।
গ্রোয়ার্স গ্রুপের ১৫ কৃষিবিদের মধ্যে রয়েছেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইছাক। তিনি বলেন, ‘শ্রেণিকক্ষে আমরা শিক্ষার্থীদের টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্যের যে তাত্ত্বিক পাঠ দিই, আজ আমরা ১৫ জন কৃষিবিদ বন্ধু মাঠপর্যায়ে সেটির এক জীবন্ত রূপান্তর ঘটিয়েছি। একজন মৃত্তিকাবিজ্ঞানী হিসেবে আমি মনে করি, সুস্থ মাটিই পারে নিরাপদ ও পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফসল দিতে। আমরা মাটির আদি স্বাস্থ্য অক্ষুণ্ন রেখে, জৈব সার ব্যবহার করে এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে উৎপাদন করছি। আমাদের দেশের তরুণ ও শিক্ষিত প্রজন্মের জন্য আমরা এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে যেতে চাই।’
.গ্রোয়ার্স গ্রুপের বাগানে কৃষিমজুর হিসেবে দুই বছর থেকে কাজ করেন চৌড়াপাড়ার মো. সইবুর রহমান। নাচোল সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেছেন তিনি। কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বাগানগুলোয় কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয় না। প্রচুর পরিমাণে গোবর সার ও ভার্মিকম্পোজড (কেঁচো সার) ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া শুরুতেই ডলোচুন দিয়ে মাটি শোধন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, এ এলাকার বাগানিরা তাঁদের চাষের পদ্ধতি দেখে ভালো ফলাফল হবে না বলে মন্তব্য করত। এখন তাঁরা বলছে গ্রোয়ার্স গ্রুপই ঠিক। সবার এমন পদ্ধতি অনুসরণ করা দরকার।
চৌড়াপাড়ার ইদিল হক নামের একজন আমচাষি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে আমাদের খরচ বেশি। কিন্তু কৃষিবিদদের বাগানে জৈবসার ব্যবহার, ডলোচুন দিয়ে মাটি শোধন করে চাষাবাদ শুরু করে ভালোই ফল পাচ্ছে এবং খরচও কম হচ্ছে বলে জেনেছি। আমি নিজে আগামীতে জৈবসার ও ডলোচুন দিয়ে মাটি শোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি চৌড়াপাড়ার মিশ্র ফলের বাগানটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে উত্তম কৃষিচর্চা অনুসরণ করা হচ্ছে। এটা ভালো উদ্যোগ।’






