যুক্তরাষ্ট্রের টেসলাকে আবারও পেছনে ফেলে বিশ্বের বৃহত্তম ব্যাটারিচালিত গাড়ি কোম্পানি হিসেবে নিজেদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে চীনের বিওয়াইডি।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গাড়ি সরবরাহ ৮ দশমিক ২ শতাংশ কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির ওপর ভর করে শীর্ষস্থান ফিরে পেয়েছে বিওয়াইডি। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
টেসলার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বিওয়াইডির এগিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, বিশ্বজুড়ে চলমান জ্বালানি–সংকটের মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজারে চীনের দাপট আরও বাড়ছে।
চীনের গাড়ির দাম টেসলার তুলনায় অনেক কম। ফিচারের দিক থেকেও তা অনেক আকর্ষণীয়। এসব কারণে তারা তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে টেসলা জানিয়েছে, জুনে শেষ হওয়া প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) তারা ৪ লাখ ৮০ হাজার ১২৬টি গাড়ি সরবরাহ করেছে, গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বিক্রি এতটা বাড়লেও বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রির বাজারে তারা শীর্ষস্থান পায়নি। চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিওয়াইডির গাড়ি সরবরাহ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৯০টি, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় যা ৮ দশমিক ২ শতাংশ কম। তা সত্ত্বেও সংখ্যার দিক থেকে টেসলাকে ছাড়িয়ে গেছে বিআওয়াইডি।
টেসলা শুধু শতভাগ বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) তৈরি করে। শেনজেনভিত্তিক চীনা কোম্পানি বিওয়াইডি ব্যাটারিচালিত গাড়ির পাশাপাশি প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িও তৈরি করে থাকে।
বিওয়াইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের গাড়ি সরবরাহ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ ৭১ হাজার ৯১টি ইউনিটে পৌঁছেছে। তাদের মোট বিক্রির ৪২ দশমিক ৫ শতাংশই হয়েছে বিদেশে, ২০২৫ সালে যা ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। তবে চলতি বছর চীনের মূল ভূখণ্ডের বাইরে কতটি শতভাগ ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক গাড়ি (বিইভি) বিক্রি হয়েছে, সেই পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করেনি কোম্পানিটি।
সাংহাইয়ের অটোমোবাইল বিশ্লেষক গাও শেন বলেন, বিদেশি বাজারে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিওয়াইডির গাড়ির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ফলে শতভাগ বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি বিক্রির ক্ষেত্রে টেসলা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় কোম্পানিটি এগিয়ে গেছে।
গাও শেন আরও বলেন, বিওয়াইডি ও চীনের অন্যান্য গাড়ি কোম্পানিগুলো উৎপাদন খরচের দিক থেকে একচেটিয়া সুবিধা পায়। ফলে বৈশ্বিক বাজারে তারা প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এগিয়ে থাকে।
এর আগে ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিকের পর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে টেসলা ব্যাটারিচালিত গাড়ি বিক্রির শীর্ষস্থান সাময়িকভাবে পুনরুদ্ধার করেছিল। ওই সময় টেসলার সরবরাহ বার্ষিক ভিত্তিতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ২৩টি ইউনিটে পৌঁছায়। বিপরীতে, একই সময়ে চীনে সরকারি প্রণোদনা ও সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে ধাক্কা খায় বিওয়াইডি। প্রথম প্রান্তিকে তাদের শতভাগ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৩ লাখ ১০ হাজার ৩৮৯টিতে নেমে আসে।
বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান অ্যালিক্সপার্টনার্স চলতি সপ্তাহের শুরুতে পূর্বাভাস দিয়েছে, কম উৎপাদন খরচ ও প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছরে চীনা গাড়ির বৈশ্বিক রপ্তানি ৪১ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ইউনিট ছাড়িয়ে যেতে পারে।
গত মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে জেপি মরগানের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অটোমোবাইল গবেষণা বিভাগের প্রধান নিক লাই বলেন, ২০২৮ সালের মধ্যে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে চীনা গাড়ি কোম্পানিগুলো বছরে ২৫ লাখ গাড়ি সরবরাহ করতে পারে। গত বছরের আনুমানিক ১০ লাখ ইউনিটের তুলনায় এটি প্রায় ১৫০ শতাংশ বেশি।
নিক লাইয়ের মতে, ২০২৮ সালের মধ্যে পশ্চিম ইউরোপের গাড়ির বাজারের ২০ শতাংশ হিস্যা চীনা ব্র্যান্ডগুলোর হাতে চলে আসবে। এমনকি স্থানীয় কোম্পানিগুলোকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে তারা। তাঁর ভাষ্য, এই বাজারের বড় অংশই হবে বৈদ্যুতিক গাড়ি।
টেসলা আরও জানিয়েছে, সাংহাই গিগাফ্যাক্টরি থেকে জুন মাসে ৮৯ হাজার ৯১টি মডেল-৩ ও মডেল-ওয়াই গাড়ি সরবরাহ করা হয়েছে। এক বছর আগের তুলনায় যা ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। সাংহাইয়ের এই কারখানা তাদের সবচেয়ে উৎপাদনকেন্দ্র।
জুন মাসের সরবরাহ মে মাসের তুলনায়ও ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো চলতি বছরের সর্বোচ্চ মাসিক সরবরাহের রেকর্ড গড়েছে সাংহাইয়ের এই কারখানা।
বাস্তবতা হলো, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক তেলের বাজারে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে চীনের আরও পোয়াবারো হবে বলেই বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।






