ড. সৈয়দ নিজার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। মুক্তকণ্ঠ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, সংস্কার, সনদ, গণভোট এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিয়ে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাফসান গালিব ও সহুল আহমদ
.জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে দুই বছর ধরে বহু ধরনের বয়ান ও ভাষ্য তৈরি হয়েছে। যেমন জুলাই অভ্যুত্থান নাকি বিপ্লব? এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
সৈয়দ নিজার: আমার মতে, এটি নিঃসন্দেহে একটি অভ্যুত্থান। কারণ, অভ্যুত্থান সব সময় শুরু হয় একটি ‘না’ বা অস্বীকারের মধ্য দিয়ে। পক্ষান্তরে বিপ্লব শুরু হয় ‘হ্যাঁ’ বা একটি ইতিবাচক বিকল্প প্রস্তাবনার মাধ্যমে।
বিপ্লবের দুটি ধরন আমরা ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে লক্ষ করি। একটি হলো ফরাসি বিপ্লবের প্যাটার্ন, যেখানে আগে থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামো ছিল না; বিভিন্ন অংশের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ ছিল। আন্দোলনের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই কিছুটা আদর্শিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল। এটি ছিল বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অত্যন্ত প্রাণবন্ত একটি সময়। দ্বিতীয় ধরনটি হলো বলশেভিক, চীনা বা ইরানি বিপ্লবের মতো, যা একটি সুনির্দিষ্ট দল এবং আগে থেকে নির্ধারিত আদর্শিক কাঠামোর ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা মূলত একটি অভ্যুত্থান। তবে এই ‘না’ বা প্রত্যাখ্যান যদি ভবিষ্যতে একটি ‘হ্যাঁ’ বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হয়, তবেই তা বিপ্লবে রূপান্তরিত হবে।
এই অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতাকে জৈন দর্শনের ‘অনেকান্তবাদ’ বা ‘অন্ধের হাতি দেখা’র গল্পের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। প্রত্যেকেই এই বিশাল ঘটনাকে তার নিজের অবস্থান ও পরিচিত গণ্ডি থেকে একেকভাবে অনুভব করেছেন। কোনো ব্যক্তিকে ‘অভ্যুত্থান কারা করেছে’ প্রশ্ন করলে তিনি মূলত তাঁর সঙ্গে যাঁদের যোগাযোগ ছিল, তাঁদের কথা বলবেন। ফলে কোনো ব্যক্তি যখন কাউকে মাস্টারমাইন্ড বলেন, অথবা কোনো রাজনৈতিক দলকে কৃতিত্ব দিতে চান, তখন বুঝতে হবে কাদের সঙ্গে ওই ব্যক্তির সম্পর্ক ছিল। কারণ, গণ–অভ্যুত্থান স্বতঃস্ফূর্ত, সুপরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয় না।
তবে অভ্যুত্থান নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বড় জটিলতা হলো এর ‘মাংসপেশি’ ও ‘হাড়গোড়’-এর পার্থক্য করা। আন্দোলনের সময় যে বিশাল জনসমুদ্র বা ‘মাস’ দেখা যায়, তা হলো ‘মাংসপেশি’। অভ্যুত্থান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সাধারণ জনতা উধাও হয় বা করে ফেলা হয়, কিন্তু রয়ে যায় কেবল ‘হাড়গোড়’। এই হাড়গোড়গুলো হচ্ছে সংগঠিত শক্তি। সেটা রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিকও হতে পারে। সাধারণত এই সংগঠিত শক্তিই অভ্যুত্থানের ফসল ভোগ করে থাকে। পরবর্তী সময়ে অভ্যুত্থান নিয়ে অনুসন্ধান করতে গেলে কেবল এই সংগঠিত হাড়গুলোই আমাদের নজরে আসে। ফলে আমাদের সত্যভ্রম হয়। মনে হয় কেবল বুঝি সংগঠিত শক্তিই আন্দোলনের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করেছে! কিন্তু এর নেপথ্যে থাকা সাধারণ মানুষের বিশাল ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের দিকটি তখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা সব সময়ই আংশিক, এর প্রকৃত সত্য কেবল সাংগঠনিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
সাধারণ জনতা মূলত এসেছিল নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং সহমর্মিতা থেকে। অন্যদিকে, বিভিন্ন সংগঠনের রাজপথে নামার পেছনে কাজ করে একটি সুনির্দিষ্ট ‘আদর্শিক কাঠামো’। ফলে এখন কেবল সংগঠিত শক্তিগুলোকে দেখতে পাওয়া গেলেও সাধারণ মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল, তাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, এটাকে অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্বাধীনতা হিসেবে অভিহিত করেছেন। আপনি এটাকে কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ নিজার: আমি মনে করি, স্বাধীনতা বা ‘ইনডিপেনডেন্স’ মূলত স্বায়ত্তশাসন বা স্বরাজ অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪৭ সালে এই অঞ্চলের মানুষ ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তির বদলে নিজেদের শাসন কায়েম করেছিল। এটা ছিল স্বাধীনতার একটি উদাহরণ। ১৯৭১ সালেও বাঙালিরা অনুভব করেছিল যে একটি নিজস্ব রাষ্ট্রকাঠামো থাকলে তারা অনেক ভালো ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারবে। এটাও আরেক স্বাধীনতা।
কিন্তু ২০২৪ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে যারা শাসন করছিল এবং যারা নিপীড়িত হয়েছে—উভয় পক্ষই এ দেশেরই মানুষ। এখানে সরাসরি কোনো বহিরাগত শাসক ছিল না। তাই একে ‘স্বাধীনতা’ না বলে অন্যভাবে দেখা প্রয়োজন।
এখানে আমাদের দুটি ধারণা বুঝতে হবে, যা নিয়ে আলোচনা কম হয়—তা হলো ‘অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব’ এবং ‘বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব’। বাহ্যিক সার্বভৌমত্ব মানে হলো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো বিদেশি শক্তি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। আর অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব হলো নিজ দেশের জনগণের ওপর ক্ষমতাচর্চার আইনি ভিত্তি। এর মূল শর্ত হলো নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র সেই নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে উল্টো নাগরিকের ওপর নগ্ন দমনমূলক শক্তি প্রয়োগ করছে। এ সংকটটি কোনো সাময়িক ঘটনা নয়, বরং রাষ্ট্রের গভীরে প্রোথিত একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। যাঁরা একে কেবল ‘সরকার পরিবর্তন’ বা ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ হিসেবে দেখতে চান, তাঁরা মূলত রাষ্ট্রের এই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্বহীন করে তুলছেন।
আপনার দৃষ্টিতে জুলাইয়ের এই গণবিস্ফোরণের পেছনে কী কী বিষয় কাজ করেছে?
.সৈয়দ নিজার: আমি মনে করি, এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে বুঝতে হলে আমাদের দুটি তাত্ত্বিক কাঠামো ব্যবহার করা প্রয়োজন, ‘বিমানবিকীকরণ’ এবং ‘বিরাজনৈতিকীকরণ’। বিমানবিকীকরণ বলতে বোঝাচ্ছি নাগরিকের মানবিক সত্তা ও তার অধিকারগুলোকে রাষ্ট্র কর্তৃক অস্বীকার করা। প্রচলিত মানবাধিকারের ধারণা মূলত ব্যক্তিগত অধিকার এবং নির্দিষ্ট কিছু তথ্য-উপাত্ত নিয়ে কাজ করে, এটি সংকটের ‘কার্যকারণ’ অনুসন্ধান করে না। অন্যদিকে বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র পরিকল্পিতভাবে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে তার মানবিক মর্যাদা থেকে বিচ্যুত করে। এই নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার ইতিহাস বেশ পুরোনো। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে চলে আসছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নিয়মিত সরকারের অধীনে জুলাই মাসে নজিরবিহীন মাত্রার হত্যাযজ্ঞ দেখেছি।
পাশাপাশি বিরাজনৈতিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাগরিকদের যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড রুদ্ধ করা হয়েছে। শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলো এই নিপীড়নের শিকার হলেও পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে সাধারণ জনগণকেও এর আওতাভুক্ত করা হয়েছে। বিরাজনৈতিকীকরণ প্রক্রিয়ার ফলে গত এক দশকে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেছে। বিগত রেজিমে ধীরে ধীরে ক্ষমতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রশাসন ও পুলিশ। এমনকি ক্ষমতাসীন দলের ‘সংসদ সদস্যদের’ও জনপরিসরে প্রশাসনিক খবরদারি নিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে।
এই বিরাজনৈতিকীকরণের কারণেই অভ্যুত্থানে প্রচলিত বড় দলগুলোর পরিবর্তে ছোট সংগঠনগুলো নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যখন একটি সমাজে সুস্থ রাজনৈতিক চর্চা রুদ্ধ করা হয়, তখন কেবল এই ধরনের ছোট গোষ্ঠীগুলোই সক্রিয় হয় না, বরং উগ্র ও চরমপন্থী মতাদর্শের বিকাশের ঝুঁকিও বহুগুণ বেড়ে যায়। গত দেড় দশকের শাসনামলে আমরা বিরাজনৈতিকীকরণের এই ভয়াবহ ফলাফলকেই স্পষ্টভাবে লক্ষ করেছি। দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি—উভয় দিক থেকেই বিমানবিকীকরণ ও বিরাজনৈতিকীকরণ ছিল অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ।
.অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন হলো, সরকারের গঠন নিয়ে অনেক আলাপ এখনো চলছে। আপনার মূল্যায়ন কী?
.সৈয়দ নিজার: ৫ আগস্ট বাংলাদেশে আক্ষরিক অর্থেই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৯ বা ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও ঠিক এমনটি ঘটেনি। সেদিন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, এমনকি বায়তুল মোকাররমের খতিব পর্যন্ত—রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী ব্যক্তি উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। এটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের সব কাঠামোর এক চরম শূন্যতা। এমন পরিস্থিতিতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনটি বিকল্প পথ খোলা ছিল: প্রথমত, সামরিক শাসন, দ্বিতীয়ত, একটি জাতীয় সরকার গঠন এবং তৃতীয়ত, যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়েছে।
অনেকেই বলে থাকেন, সামরিক বাহিনীর পক্ষে সেই মুহূর্তে ক্ষমতা গ্রহণ করা বাস্তবসম্মত ছিল না। কারণ, ২ আগস্টের আগপর্যন্ত জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক খুব একটা ইতিবাচক ছিল না। যদিও পরবর্তী সময়ে তারা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তবু শুরুতে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করলে তা প্রয়োজনীয় বৈধতা সংকটে পড়ার ঝুঁকি থাকত। অন্যদিকে, একটি জাতীয় সরকার গঠিত হলে তা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, কিছু রাজনৈতিক দল জাতীয় স্বার্থের চেয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করার সম্মতি দেয়নি।
অন্যদিকে, যে সরকার গঠন হয়েছে, তার প্রক্রিয়াটি বেশ অদ্ভুত। একে আমি জৈন দর্শনের সেই ‘অন্ধের হাতি দেখা’র গল্পের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। অভ্যুত্থানের প্রকৃত অংশীজন কারা, তা নিয়ে সরকারেরও স্পষ্ট ধারণা ছিল না। ফলে তারা বিভিন্ন পক্ষকে সরকারে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট আদর্শিক কাঠামো ছিল না।
তবে বাংলাদেশ একটি রক্তক্ষয়ী সংঘাতের বদলে শান্তিপূর্ণ উত্তরণের পথ বেছে নিয়েছে। বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠনের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। যদিও অনেকে এই সংস্কার কমিশনগুলোর সমালোচনা করছেন, কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে যে জনগণের দীর্ঘ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও সংঘাতের প্রবণতাকে এখানে গঠনমূলক আলোচনার দিকে ধাবিত করা হয়েছে। তবে এ–ও সত্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে।
.আপনি যে দুই সংকটকে চিহ্নিত করলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র বা সনদ সেটার সমাধানের প্রস্তাব করতে পেরেছে বলে কি মনে করেন?
.সৈয়দ নিজার: জুলাই ঘোষণাপত্রে প্রধানত ‘বিরাজনৈতিকীকরণ’ সমস্যাটিকেই তুলে ধরা হয়েছে, অর্থাৎ রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আন্দোলনের মূল শক্তি যে সাধারণ জনগণ, তাদের অধিকারের প্রশ্নগুলো এই ঘোষণাপত্র থেকে একরকম বাদ পড়ে গেছে। অথচ এ ধরনের ঘোষণাপত্রে সবচেয়ে জরুরি ছিল ‘প্রাণের অধিকার’ বা জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্র যেভাবে অভ্যুত্থানের সময় এবং তার আগে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তাতে জনগণের প্রধান দাবিই ছিল প্রাণের নিরাপত্তা।
এই সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সময়ে যখন ‘সনদ’ এল, সেখানে কিছু নতুন ধারণা যুক্ত হলো। যদিও সংস্কার কমিশনের অধিকাংশ মানুষের সদিচ্ছা ছিল, তবু তাঁরা অভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনাটি পুরোপুরি ধরতে পারেননি। সনদেও ‘প্রাণের অধিকার’ সরাসরি আসেনি, এটি এসেছে ‘জরুরি অবস্থা’বিষয়ক আলোচনার অনুষঙ্গ হিসেবে। জরুরি অবস্থায় প্রাণের অধিকার বলবৎ থাকবে কি না, তা নিয়ে সেখানে মতভেদ ছিল। শেষ পর্যন্ত বলা হয়েছে, সাংবিধানিক কাঠামোর মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হবে।
এখানে আমাদের সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের মারপ্যাঁচটি লক্ষ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। সেখানে বলা হয়েছে—আইন অনুযায়ী ব্যক্তিস্বাধীনতা ও প্রাণের অধিকার রক্ষা করা হবে। এই ‘আইন অনুযায়ী’ কথাটির একটি গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। রাষ্ট্র যদি কোনো দমনমূলক আইন পাস করে এবং সেই আইনের দোহাই দিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়, তবে আইনিভাবে তা অবৈধ বলা যাবে না। অর্থাৎ এই সাংবিধানিক কাঠামোর কারণে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন বৈধতা পেয়ে যায়।
’৭২–এর সংবিধানে প্রাণের অধিকারবিষয়ক অনুচ্ছেদটি ভারত ও পাকিস্তানের সংবিধানের অনুরূপ। প্রাণের অধিকার এই ধারণাটি মূলত মার্কিন সংবিধান থেকে অনুপ্রাণিত মনে হলেও তা সত্য নয়। মার্কিন সংবিধানে জীবনের অধিকার বা ‘রাইট টু লাইভ’ নিশ্চিত করতে ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’ নয়, ‘ন্যায়বিচার’-এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারত ও পাকিস্তানের সংবিধানে প্রাণের অধিকার দেওয়া হলেও ‘আইনি প্রক্রিয়া’র মধ্য দিয়ে তার ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। তা মূলত এসেছে জাপানের সংবিধান থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান মিত্রশক্তির কাছে পরাজিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থার সুপ্রিম কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে জাপানের সংবিধান রচনা করা হয়, সেখানে ‘যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া’ যুক্ত করা হয়, যাতে মিত্রশক্তির বলপ্রয়োগের ক্ষমতা এবং প্রাণ হননের আইনি বৈধতা থাকে। এই অনুচ্ছেদটি থাকলে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ই ‘জরুরি অবস্থা’য় পরিণত হয়। উপনিবেশ-উত্তর পর্বে ভারত ও পাকিস্তানের সংবিধানের চরিত্র ম্যাকআর্থারের সংবিধানের মতো, এমনকি বাংলাদেশের সংবিধানও এটার মতো! আবার চব্বিশে এত মৃত্যু দেখার পরও সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়া হলো না। অথচ বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধান অনুসরণ করতে পারত, যেখানে শর্তহীনভাবে প্রাণের অধিকার ব্যক্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, যেহেতু সনদে ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ রহিত করা হয়নি, তাই ন্যূনতম প্রাণাধিকার নিশ্চিত করার জন্য ‘আইনি প্রক্রিয়া’র সীমানা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খানিকটা সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা করেছে মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ, পুলিশ কমিশনসহ আরও কিছু অধ্যাদেশ প্রস্তাব করার মধ্য দিয়ে। তা ছাড়া বর্তমান সংবিধানে মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করার আইনত বাধ্যবাধকতা নেই। জুলাই সনদে মৌলিক অধিকারগুলোকে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ‘প্রাণের অধিকার’ নিশ্চিত না করতে পারলেও কিছু নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে একটি বড় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
.কিন্তু নির্বাচিত সরকার তো গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করার পথ ধরেছে। আপনি যে অধ্যাদেশগুলোর কথা বলেছেন, সংসদে সেগুলো কার্যকারিতা হারিয়েছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন?
.সৈয়দ নিজার: মনে রাখা দরকার, বর্তমান সংসদ কোনো সাধারণ বা নিয়মিত সংসদ নয়। এটি একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী বিশেষ পরিস্থিতির ফসল। কিন্তু প্রথমত, গণভোটের প্রস্তাবটি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো বিল আবার ফেরত পাঠানো হয়েছে।
সংস্কারের এই ধারাগুলো কেবল রাজনৈতিক বিষয় নয়, এগুলো সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবন ও অধিকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। নির্বাচিত সরকার এবং সংসদ এটাকে অবজ্ঞা করলে প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আরও অনাস্থা তৈরি হবে। বিচ্ছিন্ন জনতা তখন আরও চরমপন্থী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। এর ফলে দেশ দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হবে। এবার সংস্কার কমিশনগুলোর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ রূপান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। জনগণ যদি এগুলোকে স্রেফ কালক্ষেপণ বা ফাঁকি মনে করে, তবে ভবিষ্যতে তারা আর এ ধরনের আলাপ-আলোচনায় বিশ্বাস করবে না। এটি রাষ্ট্রকে আরও সহিংস পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, জনগণের মৌলিক আকাঙ্ক্ষাগুলোকে উপেক্ষা করার মানে হলো একটি ভয়ংকর গণবিস্ফোরণের জন্য ‘টাইম বোমা’ তৈরি করে রাখা।
.এবার সবাইকে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। আমলাতন্ত্রের সংস্কার কেন সম্ভব হলো না?
.সৈয়দ নিজার: বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র শুধু উপনিবেশের উত্তরাধিকারই নয়, ঔপনিবেশিক অভিমুখ জারি রেখেছে। আমলাতন্ত্রের প্রবণতা এখনো শাসনমুখী, ব্যবস্থাপনামুখী নয়। আমলাতন্ত্রের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি ও গতিপথ পরিবর্তন করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের আমলাতন্ত্রের মধ্যে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারের মানসিকতা তাদের পদবি বা নাম চয়নের মধ্যেও প্রকাশ পায়। যেমন ‘জেলা প্রশাসক’ পদবি। অথচ একজন ‘ডেপুটি কমিশনার’ কোনোভাবেই স্বাধীন রাষ্ট্রে ‘প্রশাসক’ বা শাসক হতে পারেন না।
.এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী হতে পারে?
.সৈয়দ নিজার: প্রথমত, রাষ্ট্রপক্ষের উচিত জনগণের সঙ্গে তৈরি হওয়া বর্তমান দূরত্ব কমিয়ে আনা। সংসদকে অবশ্যই জন–অধিকার নিশ্চিতকারী বিলগুলো দ্রুত পাস করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, একধরনের জাতীয় ঐকমত্য গঠন করা। আমরা একটি ‘অধিনীতি’ (মেটাপ্রিন্সিপাল)-এর কথা বলছি। এর মূল কথা হলো, রাষ্ট্রের বিমানবিকীকরণ প্রক্রিয়া রুখে দেওয়া এবং প্রত্যেক নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আদর্শিক ভিন্নতা বা বিতর্ক থাকবেই, কিন্তু জানমালের নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ে সব পক্ষকে একটি সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় আসতে হবে।
.আপনাকে ধন্যবাদ।
.সৈয়দ নিজার: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।






