প্রকৃতি আর ইতিহাসের এক অপূর্ব মিলনস্থল কক্সবাজারের রামু। সবুজে ঘেরা পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ আর অসংখ্য বৌদ্ধবিহার নিয়ে যেন এক অন্য ভুবন। প্রাচীন ঐতিহ্যের এই জনপদে এবার যুক্ত হচ্ছে বুদ্ধের ১৫০ ফুট দৈর্ঘ্যের ‘নির্বাণশয্যার’ মূর্তি। রামুর প্রাচীন রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ মহাবিহারে প্রাঙ্গণে চলছে এর নির্মাণকাজ। নির্মাণ শেষ হলে এটি হবে দেশের সর্ববৃহৎ ‘নির্বাণশয্যা’ বুদ্ধমূর্তি।
রামুর দক্ষিণমিঠাছড়ির জোয়ারিয়ানালার পাহাড়চূড়ায় বিমুক্ত বিদর্শন ভাবনাকেন্দ্র বৌদ্ধবিহারের খোলা মাঠের ১০০ ফুট লম্বা ‘সিংহশয্যা’ বুদ্ধমূর্তিই এত দিন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণের জায়গা। দেশের কোথাও অত বড় সিংহশয্যা বুদ্ধমূর্তি দ্বিতীয়টি নেই। বৌদ্ধধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী, বুদ্ধ যখন বিশ্রাম নিতেন, তখন সিংহের মতো করে শয়ন করতেন।
এবার রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহারের ১৫০ ফুট লম্বা নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ হচ্ছে পাহাড়ের ঢালুতে। সিংহশয্যায় থাকে প্রশান্ত বিশ্রামের রূপ আর নির্বাণশয্যায় থাকে জাগতিক মোহ ও দুঃখ থেকে পরম মুক্তি লাভের এক গভীর ও শান্ত রূপ।
.‘নির্বাণশয্যা’ হচ্ছে বুদ্ধের শেষ মুহূর্তের শয়নভঙ্গি। তাঁর অন্তিম মুহূর্তকে ধারণ করেই এই মূর্তি তৈরি হচ্ছে। মূর্তিতে বুদ্ধকে ডান দিকে কাত হয়ে শায়িত অবস্থায় দেখানো হয়। মূর্তির ডান হাতটি মাথার নিচে ভাঁজ করে রাখা থাকে। বাঁ হাতটি শরীরের ওপরের দিকে লম্বালম্বিভাবে প্রসারিত।
.এ প্রসঙ্গে রাংকূট মহাবিহারের পরিচালক ও অধ্যক্ষ কে শ্রী জ্যেতিসেন থের মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দেশের সর্ববৃহৎ নির্বাণশয্যা বৌদ্ধমূর্তিটি নির্মিত হচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তির অনুদানের টাকায়। ইতিমধ্যে এক কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। মূর্তির ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে এবং আশপাশের পরিবেশ উন্নয়নে আরও কোটি টাকা খরচ হবে। চীন, মিয়ানমার, ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর চেয়ে বড় নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তি থাকলেও রামুর বুদ্ধমূর্তিতে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকছে। যেটি দেখতে আকর্ষণীয় মনে হবে। এই মূর্তির উচ্চতা ২৫ ফুট।
বিদেশি পর্যটক টানতে এই মূর্তি বিশেষ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে কে শ্রী জ্যেতিসেন থের বলেন, মূর্তির ভেতরে ভিক্ষু সংঘের ধ্যানের পরিবেশ রাখা হচ্ছে, যেখানে অন্তত ১০০ জন ভিক্ষু ধ্যানে মগ্ন থাকবেন। ধ্যানের জন্য মূর্তির ভেতরে ঢোকার একাধিক দরজা রাখা হচ্ছে। নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তির মূল কারিগর উখিয়ার পুরোনো রুমখাঁ গ্রামের বাসিন্দা কারুশিল্পী উত্তম বড়ুয়া। যিনি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ভারতেও শিল্পকর্মের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।
.রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহারের ১৫০ ফুট লম্বা নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ হচ্ছে পাহাড়ের ঢালুতে। সিংহশয্যায় থাকে প্রশান্ত বিশ্রামের আরাম, নির্বাণশয্যায় থাকে জাগতিক মোহ ও দুঃখ থেকে পরম মুক্তি লাভের এক গভীর, গম্ভীর ও শান্ত রূপ।.
শিল্পী উত্তর বড়ুয়া বলেন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, চীন, জাপানসহ এশিয়ার দেশগুলোতে এর চেয়েও দীর্ঘ শায়িত বুদ্ধমূর্তি থাকলেও নির্মাণশৈলী ও প্রেক্ষাপটে রামুর নির্বাণশয্যা স্থাপনাটির পৃথক স্বকীয়তা রয়েছে। এটি কংক্রিট স্থাপত্যের নিদর্শন হিসেবে এশিয়ার বৌদ্ধ ভাস্কর্য শিল্পেও বিশেষ জায়গা করে নেবে।
বৌদ্ধ ভিক্ষুদের মতে, রামুর বৌদ্ধঐতিহ্যের ভিত্তি অনেক গভীরে। সম্রাট অশোকের সময়কালে রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা পায়। পাহাড়চূড়ার এই বিহারে রক্ষিত একটি সাদা মূর্তিতে রয়েছে গৌতম বুদ্ধের পবিত্র অস্থি ধাতু বা বুকের হাড়। যে কারণে বিহারটি বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। বৌদ্ধবিহারের নামকরণের পেছনেও রয়েছে অস্থি ধাতু। ‘রাং’ শব্দের অর্থ বুদ্ধের বক্ষাস্থি এবং ‘কূট’ শব্দের অর্থ পর্বত বা চূড়া। দুই শব্দের সংমিশ্রণে হয়েছে ‘রাংকূট’। যার অর্থ দাঁড়ায় ‘বুদ্ধের বক্ষাস্থিসংবলিত পর্বত’। জায়গাটির নাম ছিল রাং-উ। কালক্রমে সেটি হয়ে গেল রামু। বিহারের ভিক্ষু-শ্রমণদের ভাষ্য, এই বিহারে গৌতম বুদ্ধের বক্ষাস্থি সংরক্ষিত আছে বলেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ, ভিক্ষু, গবেষক ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা এখানে ছুটে আসছেন। রামুর অভ্যন্তরে আছে ২০টির বেশি প্রাচীন বিহার। ১৫০ ফুটের নির্বাণশয্যা বুদ্ধমূর্তি নির্মিত হলে রচিত হবে প্রাচীন ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক ভাস্কর্য শিল্পের এক সেতুবন্ধ।
.একনজরে রাংকূট বিহার
কক্সবাজার শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার রাংকূট বনাশ্রমের অবস্থান। এর প্রধান ফটকে লেখা আছে, প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট অশোক, স্থাপিত ২৬৮ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। মূল ফটক দিয়ে বিহারে পা রাখতেই সামনে পড়ে ‘ঐতিহাসিক বুদ্ধনগর’। গৌতম বুদ্ধের ৮৪ হাজার বাণীকে ধারণ করে সেখানে স্থাপন করা হয় ৮৪টি সারিবদ্ধ মূর্তি; যা দেশের অন্য কোথাও নেই। পাশে আছে জাদুঘর, যেখানে ৬০০ থেকে ১৬০০ শতাব্দীর বিভিন্ন দলিল, পুস্তক, শিলালিপি, মূর্তি সংরক্ষণ করা হয়। উল্টো পাশে বিশাল এক বটবৃক্ষ। বৃক্ষের গোড়ায় স্থাপন করা হয় বুদ্ধের প্রথম ধর্মপ্রচার দৃশ্য ‘প্রতীকী সারনাথ’ ভাস্কর্য। পূর্ব পাশে ভাবীবুদ্ধ সিদ্ধার্থের জন্মদৃশ্য ‘প্রতীকী লুম্বিনী’ ভাস্কর্য। বটবৃক্ষের ছায়াতলে স্থাপন করা হয় সম্রাট অশোক ও চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-এর ভাস্কর্য।
বটবৃক্ষের পূর্ব পাশে ৬৭ ধাপে নির্মিত আকর্ষণীয় ড্রাগন সিঁড়ি। এরপর পাহাড়চূড়ায় মূল বিহার। এরপর ভোজনশালা, বোধি মন্দির, সীমা ঘর, ব্রিটিশ কেল্লা, মহিলা আবাস কেন্দ্র, বুদ্ধমূর্তি সংগ্রহশালা, অ্যাকুয়ারিয়াম, মাটির নিচে ধ্যান গুহা ইত্যাদি। মহাবিহারে তিন পাশে উঁচু-নিচু পাহাড়ে ঘেরা। পাহাড় ঘিরে তৈরি হয় রাংকূট মিরাকল গার্ডেন। দর্শনার্থীদের এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে যাতায়াত সুবিধার্থে নির্মাণ করা হয় দৃষ্টিনন্দন ঝুলন্ত সেতু, ‘প্রজ্ঞাবংশ ফ্লাইওভার’, ইকো মেডিটেশন পার্ক। প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মহাবিহার ভ্রমণের সুযোগ রাখা হয়। টিকিটের মূল্য ২০ টাকা।






