সকালের অভিনয়ের মাস্টারক্লাস দিয়ে শুরু। বিকেলে বাংলা সিনেমা ও ওটিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা। আর সন্ধ্যা গড়াতেই লালগালিচায় তারকাদের পদচারণ, ক্যামেরার ঝলকানি, ভক্তদের উচ্ছ্বাস, সেলফি আর আড্ডায় মুখর পাঁচতারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল। সব মিলিয়ে দিনভর উৎসবের আবহেই অনুষ্ঠিত হলো দেশের জনপ্রিয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির দ্বিতীয় চরকি কার্নিভ্যাল। দিনের শেষ ভাগে বসে দ্বিতীয় চরকি অ্যাওয়ার্ডস, যেখানে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সেরা সিনেমা, সিরিজ ও শিল্পীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সম্মাননা।

চরকির ছয় বছরের পথচলা ঘিরে আয়োজিত এ উৎসবকে শুধু পুরস্কার বিতরণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি আয়োজকেরা। অভিনয় শেখা, শিল্প আলোচনা, নেটওয়ার্কিং, তারকাদের মিলনমেলা—সব মিলিয়ে একে পরিণত করা হয় পূর্ণাঙ্গ একটি কার্নিভ্যালে।

.

লালগালিচায় তারার মেলা

সন্ধ্যা ছয়টা বাজতেই ইন্টারকন্টিনেন্টালের লালগালিচায় একে একে হাজির হতে থাকেন তারকারা। ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, ভক্তদের উচ্ছ্বাস আর আলোকচিত্র সাংবাদিকদের ব্যস্ততায় মুহূর্তেই উৎসবের আবহ তৈরি হয়। জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম, ফজলুর রহমান বাবু, জয়া আহসান, আরিফিন শুভ, আফরান নিশো, সাফা কবির,আয়মান সাদিক, আরিফিন জিলানী–ঐশী, আনিকা কবির শখ, কনা, শাহেদ আলী–দীপা খন্দকার, আফসান আরা বিন্দুসহ দেশের চলচ্চিত্র ও ওটিটির জনপ্রিয় মুখগুলো উপস্থিত হন অনুষ্ঠানে। নতুন প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।

.কার হাতে কোন পুরস্কার.

লালগালিচার প্রথম অতিথিদের একজন ছিলেন আফসান আরা বিন্দু। ঝলমলে উপস্থিতির পর শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালের ‘উনিশ–২০’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতে সন্ধ্যাটিও স্মরণীয় করে রাখেন তিনি। চট্টগ্রাম থেকে শুধু এ আয়োজনে অংশ নিতে মা–বাবাকে নিয়ে হাজির হয়েছিল সর্বকনিষ্ঠ শিল্পী ত্রিধা পাল মান্। লালগালিচায় ছিল তারও প্রাণবন্ত উপস্থিতি।

.

মূল মঞ্চে শুরু পুরস্কারের আসর

সন্ধ্যা সাতটায় নির্ধারিত সময়েই শুরু হয় চরকি অ্যাওয়ার্ডস। শুরুতেই মুবাশশীরা কামাল ইরার কোরিওগ্রাফিতে ‘ফ্লো বাই ইরা’র পরিবেশনায় মঞ্চে আসে ‘নবরস’ শিরোনামের নৃত্য। এরপর বিটমসফিয়ারের অ্যাকাপেলা ও বিটবক্সিং পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

.

পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রাকিন আবসার ও রাফসান সাবাব। দুই উপস্থাপকের সাবলীল পরিবেশনা ও হালকা রসিকতা অনুষ্ঠানে আলাদা মাত্রা যোগ করে। এরপর একে একে ঘোষণা করা হয় ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সাবস্ক্রাইবারস চয়েস ও ক্রিটিকস চয়েস বিভাগের বিজয়ীদের নাম। বিজয়ীদের উচ্ছ্বাস, সহশিল্পীদের করতালি আর দর্শকদের উল্লাসে বারবার প্রাণ ফিরে পায় মিলনায়তন।

.দিনভর আয়োজন শেষে সন্ধ্যায় পুরস্কার ঘোষণা, শাকিব-জয়া-শুভ-নিশো–বাঁধনদের মধ্যে কারা জিতবেন.

মঞ্চের বাইরে আরেক উৎসব
মূল অনুষ্ঠান চললেও মিলনায়তনের বাইরের লবি যেন ছিল আরেকটি উৎসবের কেন্দ্র। কোথাও শিল্পীদের আড্ডা, কোথাও দীর্ঘদিন পর সহকর্মীদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ, আবার কোথাও চলছিল ব্যস্ত সেলফি তোলা। শরীফুল রাজ, মন্দিরা চক্রবর্তী ও সুনেরাহ বিনতে কামালের প্রাণখোলা আড্ডা যেমন নজর কেড়েছে, তেমনি আরিফিন শুভ, আফসান আরা বিন্দু, আফসানা মিমি, ফজলুর রহমান বাবুদের ঘিরেও ছিল দর্শক ও অতিথিদের ভিড়। অনেকেই বলছিলেন, অনেক দিন পর এক ছাদের নিচে এত শিল্পী, নির্মাতা, লেখক, কলাকুশলী ও প্রযুক্তিকর্মীর এমন মিলনমেলা দেখা গেল।

.

বিশেষ সম্মাননা কারিনা কায়সারকে

এবারের আয়োজনের আবেগঘন মুহূর্ত ছিল প্রয়াত অভিনেত্রী, লেখক ও নির্মাতা কারিনা কায়সারকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান। পুরস্কার বিতরণ শুরু হওয়ার আগে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়। কারিনা কায়সারের বন্ধু রেজাউর রহমান ও কামরুন নাহারের হাতে সম্মাননা তুলে দেন মুক্তকণ্ঠের সম্পাদক মতিউর রহমান। পরে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন কারিনার বাবা ফুটবলার কায়সার হামিদ ও মা লোপা কায়সার।
চরকির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেদওয়ান রনি বলেন, ‘৩৬–২৪–৩৬’ চলচ্চিত্রের জন্য সাবস্ক্রাইবারস চয়েস ও ক্রিটিকস চয়েস—দুই বিভাগেই মনোনয়ন পেয়েছিলেন কারিনা কায়সার। কিন্তু তিনি আজ সব প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে। তাঁর অসাধারণ অবদান স্মরণ করতেই এ সম্মাননা।

.

চরকির স্বপ্ন আরও বড়

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে রেদওয়ান রনি বলেন, বাংলা কনটেন্টের রাজধানী হিসেবে চরকিকে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘বাংলা কনটেন্টের রাজধানী হবে চরকি—এই লক্ষ্য পূরণে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। চরকি অ্যাপকে মানুষের জীবনের আরও প্রয়োজনীয় অংশ করে তোলার পরিকল্পনাও আমাদের আছে।’ তিনি জানান, পাঁচ বছরে চরকির প্রিমিয়াম কনটেন্ট দেখা হয়েছে ১০০ কোটির বেশি ঘণ্টা। প্ল্যাটফর্মটিতে নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা তিন কোটির বেশি। ইতিমধ্যে শতাধিক অরিজিনাল কনটেন্ট প্রকাশ করেছে চরকি।

.

সকাল থেকে শুরু উৎসব

কার্নিভ্যালের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় সকাল সাড়ে ১০টায়। প্রায় দুই ঘণ্টার অভিনয়ের মাস্টারক্লাসে ৩৪ জন অংশগ্রহণকারীকে প্রশিক্ষণ দেন অভিনেতা তারিক আনাম খান। বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য রাইজ, রিয়েলিটিজ অ্যান্ড রিইনভেনশন অব বেঙ্গলি সিনেমা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। আলোচনায় অংশ নেন নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন, আদনান আল রাজীব ও নুহাশ হুমায়ূন। সঞ্চালনায় ছিলেন সাদিয়া খালিদ রীতি। ফেসবুক রিলস ও ইউটিউব শর্টসের যুগে দীর্ঘদৈর্ঘ্যের সিনেমার ভবিষ্যৎ, দর্শকের মনোযোগ, গল্প বলার ধরন, ওটিটির সম্ভাবনা এবং আগামী দিনের বাংলা সিনেমা—এসব বিষয় নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়।

.

মেজবাউর রহমান সুমনের মতে, কনটেন্টের ভেতরে গভীরতা থাকলে দর্শক তিন ঘণ্টার সিনেমাও দেখবেন, আবার রাত জেগে ওয়েব সিরিজও শেষ করবেন। আদনান আল রাজীব বলেন, দর্শকের সামনে এখন অসংখ্য বিকল্প থাকলেও ভালো চলচ্চিত্র হলে দর্শক সেটি দেখবেনই। আর নুহাশ হুমায়ূন তাঁর আশার কথা জানিয়ে বলেন, আগামী দুই দশক পরও বাংলাদেশি সিনেমা আরও শক্ত অবস্থানে থাকবে বলেই তিনি বিশ্বাস করেন।

.

শুধু পুরস্কার নয়, একটি উৎসব

এবারের চরকি কার্নিভ্যাল শুধু সেরা কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার অনুষ্ঠান ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের ওটিটি অঙ্গনের শিল্পী, নির্মাতা, প্রযুক্তিকর্মী, লেখক ও দর্শকদের এক মিলনমেলা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শেখা, আলোচনা, আড্ডা, ছবি তোলা, পুরস্কার আর উদ্‌যাপনের মধ্য দিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয় দিনব্যাপী আয়োজন। আয়োজকদের বিশ্বাস, এ ধরনের উদ্যোগ শুধু শিল্পীদের কাজের স্বীকৃতিই দেবে না, বরং বাংলাদেশের ওটিটি ও চলচ্চিত্রশিল্পের ভবিষ্যৎ পথচলাকেও আরও সমৃদ্ধ করবে।
একনজরে যাঁরা পেলেন পুরস্কার

.

সাবস্ক্রাইবারস চয়েজ ২০২৩

সেরা সিনেমা: ‘সুড়ঙ্গ’
সেরা পুরুষ অভিনয়শিল্পী (সিনেমা): আরিফিন শুভ, ‘উনিশ২০’
সেরা নারী অভিনয়শিল্পী (সিনেমা): আফসান আরা বিন্দু, ‘উনিশ২০’
সেরা সিরিজ: ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’
সেরা পুরুষ অভিনয়শিল্পী (সিরিজ): নাসির উদ্দিন খান, ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’
সেরা নারী অভিনয়শিল্পী (সিরিজ): সাবিলা নূর, ‘মারকিউলিস’
সেরা গান: ‘গা ছুঁয়ে বলো’। কণ্ঠশিল্পী: তানজীব সরোয়ার ও অবন্তী সিঁথি। কথা: তানজীব সরোয়ার, সংগীতায়োজন: সাজিদ সরকার

.

ক্রিটিক চয়েজ ২০২৩

সেরা পরিচালক (সিনেমা): রায়হান রাফী, ‘সুড়ঙ্গ’
সেরা গল্প ও চিত্রনাট্য (সিনেমা): আশরাফুল আলম শাওন ও অনম বিশ্বাস, ‘দুই দিনের দুনিয়া’
সেরা পুরুষ অভিনয়শিল্পী (সিনেমা): আফরান নিশো, ‘সুড়ঙ্গ’
সেরা নারী অভিনয়শিল্পী (সিনেমা): নাজিয়া হক অর্ষা, ‘জাহান’
সেরা পরিচালক (সিরিজ): শঙ্খ দাশগুপ্ত, ‘গুটি’
সেরা গল্প ও চিত্রনাট্য (সিরিজ): রবিউল আলম রবি, শঙ্খ দাশগুপ্ত, জাহীন ফারুক আমিন, আবু সাঈদ রানা, ‘গুটি’
সেরা পুরুষ অভিনয়শিল্পী: নাসির উদ্দিন খান, ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’
সেরা নারী অভিনয়শিল্পী: আজমেরী হক বাঁধন, ‘গুটি’
সেরা চিত্রগ্রাহক: সুমন সরকার, ‘সুড়ঙ্গ’
সেরা সম্পাদক: সালেহ সোবহান অনীম, ‘ক্যাফে ডিজায়ার’, ‘গুটি’
সেরা মেকআপ আর্টিস্ট: আতিয়া রহমান, ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’, ‘দুই দিনের দুনিয়া’, ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’, ‘ভাইরাস’
সেরা কস্টিউম ডিজাইনার: বিজয়া রত্নাবলী, ‘গুটি’
সেরা আবহসংগীত: ইমন চৌধুরী, ‘দুই দিনের দুনিয়া’, ‘মারকিউলিস’
সেরা সাউন্ড ডিজাইন: রিপন নাথ, ‘দুই দিনের দুনিয়া’, ‘সামথিং লাইক অ্যান অটোবায়োগ্রাফি’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘মাইশেলফ অ্যালেন স্বপন’
সেরা শিল্পনির্দেশক: শহীদুল ইসলাম, ‘সুড়ঙ্গ’
চরকি পাওয়ার হাউস অব টুমোরো: মাশা ইসলাম, ‘টেকা পাখি’

.

সাবস্ক্রাইবারস চয়েজ ২০২৪

সেরা সিনেমা: ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’
সেরা পুরুষ অভিনয়শিল্পী (সিনেমা): শাকিব খান, ‘তুফান’
সেরা নারী অভিনয়শিল্পী (সিনেমা): মাসুমা রহমান নাবিলা, ‘তুফান’
সেরা সিরিজ: ‘আধুনিক বাংলা হোটেল’
সেরা পুরুষ অভিনয়শিল্পী (সিরিজ): মোশাররফ করিম, ‘আধুনিক বাংলা হোটেল’
সেরা নারী অভিনয়শিল্পী (সিরিজ): জয়া আহসান, ‘২ষ’
সেরা গান: ‘লাগে উড়া ধুরা’। কণ্ঠ: প্রীতম হাসান ও দেবশ্রী অন্তরা। কথা: রাসেল মাহমুদ ও শরীফ উদ্দিন। সুরকার: প্রীতম হাসান ও রাজ্জাক দেওয়ান

.

ক্রিটিক চয়েজ ২০২৪

সেরা পরিচালক: রবিউল আলম রবি, ‘ফরগেট মি নট’
সেরা গল্প ও চিত্রনাট্য: আল–আমিন হাসান নির্ঝর, রবিউল আলম রবি, ‘ফরগেট মি নট’
সেরা পুরুষ অভিনয়শিল্পী (সিনেমা): প্রীতম হাসান, ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’
সেরা নারী অভিনয়শিল্পী (সিনেমা): মেহজাবীন চৌধুরী, ‘ফরগেট মি নট’
সেরা পরিচালক (সিরিজ): মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম, ‘সিনপাট’
সেরা গল্প ও চিত্রনাট্য (সিরিজ): নুহাশ হুমায়ূন ও গুলতেকিন খান, ‘২ষ’
সেরা পুরুষ অভিনয়শিল্পী (সিরিজ): এফ এস নাইম, ‘কালপুরুষ’
সেরা নারী অভিনয়শিল্পী (সিরিজ): জিন্নাত আরা, ‘সিনপাট’
সেরা চিত্রগ্রাহক: তাহসিন রহমান, ‘তুফান’
সেরা সম্পাদক: সালেহ সোবহান অনীম, ‘কালপুরুষ’, ‘ফরগেট মি নট’
সেরা মেকআপ আর্টিস্ট: রুবামা ফাইরুজ, ‘কালপুরুষ’, ‘৩৬–২৪–৩৬’
সেরা কস্টিউম ডিজাইনার: সাথী আকতার, ‘সিনপাট’
সেরা আবহসংগীত: খৈয়াম সানু সন্ধি, ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’, ‘৩৬–২৪–৩৬’
সেরা সাউন্ড ডিজাইনার: অদীপ সিং মানকি, ‘সিনপাট’, ‘কালপুরুষ’
সেরা শিল্পনির্দেশক: শিহাব নূরুন নবী, ‘কালপুরুষ’, ‘তুফান’
চরকি পাওয়ার হাউস অব টুমোরো: রিজভী রিজু, ‘২ষ’