৪ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস। যে শহরে আড়াই শ বছর আগে লেখা হয়েছিল দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র—সেই ফিলাডেলফিয়ায় আজ প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে আছে বজ্রঝড়ের পূর্বাভাস। প্যারাগুয়েকে এই শহরেই আজ মুখোমুখি হতে হচ্ছে অন্য একটি ঝড়ের—যেটির নাম ফ্রান্স।

ফ্রান্সের আক্রমণভাগ এই বিশ্বকাপে যেমন খেলছে, সেটাকে ঝড় তো বলাই যায়! এক কিলিয়ান এমবাপ্পেকে ঠেকাতেই প্যারাগুয়ে রক্ষণের নাভিশ্বাস উঠে যাওয়ার কথা। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ছয় গোল করে ফেলেছেন ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড, মনে করিয়ে দিচ্ছেন ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপের সেই দুর্দান্ত এমবাপ্পেকে। প্রতিটি গোলে রেকর্ডবুকে লিখছেন নতুন কিছু, আর এই বিশ্বকাপে এমবাপ্পে আবার জোড়া গোল ছাড়া করছেন না!

শুধু এমবাপ্পেতেই শেষ হয়ে গেলে কথা ছিল। আছেন উসমান দেম্বেলে; ব্যালন ডি’অরজয়ী ফ্রেঞ্চ ফরোয়ার্ড। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে একমাত্র হ্যাটট্রিক তাঁর, গোল করে ফেলেছেন চারটি। নিজের দিনে দেম্বেলে একাই গড়ে দিতে পারেন ব্যবধান।

.

এই দুজনকে যদি কোনোভাবে সামলানো যায়, এরপর আসবেন আরেকজন—এই বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার মাইকেল ওলিসে। গোল করার চেয়ে করানোতেই বেশি মনোযোগ তাঁর, এখন পর্যন্ত অ্যাসিস্ট হয়ে গেছে পাঁচটি। আর একটি করলেই ছুঁয়ে ফেলবেন এক বিশ্বকাপে পেলের ছয় অ্যাসিস্টের রেকর্ড।

এমবাপ্পে-দেম্বেলে-ওলিসের ত্রয়ী যেন মনে করিয়ে দেয় আঠারো শতকের সেই বিখ্যাত তিন ফরাসি চিত্রকর পল সেজান-ক্লদিও মোনে আর এদুয়ার্দ মানেকে। কাকে ছেড়ে কার শিল্পকর্ম দেখবেন, সেটা ঠিক করাই মুশকিল!

.

প্যারাগুয়ের তো এই ফ্রান্সের বিপক্ষে উড়েই যাওয়ার কথা। এই বিশ্বকাপে ফ্রান্স যাদের হারিয়েছে, সেনেগাল-নরওয়ে-সুইডেনের চেয়ে নিশ্চয়ই তারা বড় দল নয়। কিন্তু প্যারাগুয়ে শেষ ১৬তে যেভাবে এসেছে সেটিই তাদের ওপর আলাদা চোখ রাখতে বাধ্য করছে।

জার্মানির মতো চারবারের বিশ্ব চাম্পিয়নকে তারা পুরো ১২০ মিনিট রুখে দিয়ে জিতেছে টাইব্রেকার নামের স্নায়ুর পরীক্ষায়; যে পরীক্ষায় অজেয় বলে জার্মানদের একটা অহম ছিল। এই জয় প্যারাগুয়ের জন্য এতটাই বড় ছিল যে ম্যাচ জয়ের পর দেশে সরকারি ছুটিই ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে।

.

ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম তাই জানেন, প্যারাগুয়ের এই দল কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, ‘ওরা এই পর্যন্ত ভাগ্যের জোরে আসেনি। জার্মানির মতো শক্তিশালী একটা দলকে তারা হারিয়েছে। ওদের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ডিএনএ আছে। যেটার অর্থ হচ্ছে তাদের হারানো কঠিন হবে।’

প্যারাগুয়ের পরিচয়ই এটা। আগে রক্ষণ সামলে পরে আক্রমণ করা, আর হারার আগে না হারা। যে কারণে দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে তাদের চেয়ে কম গোল খেয়েছে শুধু ইকুয়েডর। যে কারণে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উড়ে গিয়েও তারা ফিরে এসেছে দারুণভাবে।

দেশম তাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘ওদের অনেক ভালো খেলোয়াড় আছে। আর ভালো দল না হলে আপনি শেষ ১৬ পর্যন্ত আসতে পারবেন না।’ ফ্রান্সের আক্রমণের আরেক ভরসা ব্রাডলি বারকোলা যেমন বলেছেন, ‘ওরা শেষ পর্যন্ত রক্ষণ করে যাবে। শারীরিকভাবেও ওরা আমাদের পরীক্ষা নেবে। ফ্রেঞ্চ লিগে অবশ্য এ ধরনের দলের সঙ্গে আমাদের খেলতে হয়। ওরা যে ফুটবল খেলতে পারে, জার্মানির বিপক্ষেই তা দেখিয়েছে।’

.কেপ ভার্দে ম্যাচে মেসির ১১ রেকর্ড জেনে নিন.

ফ্রেঞ্চ লিগে খেলার সুবাদে প্যারাগুয়ের আক্রমণের অন্যতম ভরসা হুলিও এনসিসো এবারের ফ্রান্স দলের অনেকের বিপক্ষেই খেলেছেন। আর নিজেদের শক্তিমত্তার জায়গাটা তো জানাই, ‘আমাদের নিজেদের খেলার একটা ধরন আছে। যে কারও জন্য আমরা কাজটা কঠিন করে ফেলতে পারি।’

প্যারাগুয়ে কতটা কঠিন পরীক্ষা নেয়, সেটা ফ্রান্সের ভালোই জানা। বিশ্বকাপে দুই দেশের সর্বশেষ দেখা ১৯৯৮ বিশ্বকাপের এই শেষ ১৬তেই। সেই ম্যাচেও প্যারাগুয়ের বজ্র আঁটুনি ভাঙতে ফ্রান্সের ভুগতে হয়েছিল অনেক।

.

নির্ধারিত সময়ে গোল করতে না পারার পর শেষ পর্যন্ত লরা ব্লাঁর অতিরিক্ত সময়ের গোল্ডেন গোলে জিতে যায় ফ্রান্স। সেই দলের অধিনায়ক ছিলেন এই ফ্রান্স দলের কোচ দেশম। প্যারাগুয়ে কতটা অনমনীয়, তাঁর চেয়ে ভালো আর কারও জানার কথা নয়।

ফ্রান্সের কাজটা আজ আরও কঠিন করে ফেলতে পারে বৈরী আবহাওয়া। ফিলাডেলফিয়ায় ৩৭ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারা তাপমাত্রা। বোঝাই যাচ্ছে, ফ্রান্সকে আজ ঘাম ঝরাতে হবে অনেক।  

.আত্মঘাতী গোলের নতুন রেকর্ড, কেন এই বিশ্বকাপে এত বেশি হচ্ছে