মৌসুমে টমেটো, কাঁচা মরিচ কিংবা গাজরের দাম এত কমে যায় যে অনেক কৃষক খেত থেকেই ফসল তোলেন না। আবার কয়েক মাস পর একই পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই মূল্য অস্থিরতা কমাতে ইউনিয়নভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ–চালিত ছোট আকারের হিমাগার (মিনি কোল্ডস্টোরেজ) নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য চালু হচ্ছে কৃষি কার্ড, যার মাধ্যমে সরকারি প্রণোদনা ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হবে।

আজ শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে মৎস্য ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শুরুর আগে সাংবাদিকদের কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ এ কথা বলেন।

কৃষিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের অভাবেই মৌসুমে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পান না। অনেক সময় টমেটো, গাজর বা কাঁচা মরিচের দাম এত কমে যায় যে খেত থেকে ফসল তুলেও লাভ হয় না। কিন্তু কয়েক মাস পর একই পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই সমস্যার সমাধানে ইউনিয়নভিত্তিক ‘মিনি কোল্ডস্টোরেজ’ নির্মাণ করা হবে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, এসব কোল্ডস্টোরেজ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। স্থানীয় সমবায় বা কৃষক সংগঠন এগুলো পরিচালনা করবে। শুধু জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ থাকবে। ফলে পরিচালন ব্যয় কম হবে। কৃষকেরা মৌসুমে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করে সুবিধাজনক সময়ে বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, আবার মৌসুম চলে গেলেও বাজারে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়বে না।

মন্ত্রী আরও বলেন, উৎপাদন ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সমন্বয় করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও কমে আসবে। কৃষকেরা সংগঠিতভাবে বাজারে অংশ নিতে পারবেন এবং বাজার ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।

কৃষিমন্ত্রী জানান, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালুর কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। বর্তমানে এর পাইলট কার্যক্রম চলছে। এই কার্ডের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত কৃষকদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা হবে। কে কোন এলাকায় কী ফসল উৎপাদন করেন, কত জমিতে চাষ করেন এবং কোন ধরনের কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত—এসব তথ্য সংরক্ষণ করা হবে।

কৃষি বলতে শুধু ধান, পাট বা গমের চাষ বোঝানো হবে না। লবণচাষি থেকে শুরু করে সুপারি, নারকেল, পান, মাছচাষি ও পশুপালকেরাও কৃষি কার্ডের আওতায় আসবেন বলে জানান কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ। তিনি বলেন, এর ফলে সরকার প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে কৃষি উৎপাদনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাবে।

মন্ত্রী বলেন, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের কাছে সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও অন্যান্য সহায়তা সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে কোন এলাকায় কোন ফসলের চাহিদা কত, কোথায় উদ্বৃত্ত উৎপাদন হচ্ছে, সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে উৎপাদন পরিকল্পনা করা যাবে। এতে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে কৃষকের ক্ষতির ঝুঁকি কমবে।

ধান সংগ্রহের বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, সরকার ইউনিয়নভিত্তিক নির্দিষ্ট স্থানে ধান কেনার ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে। আগে থেকেই কৃষকদের জানিয়ে দেওয়া হবে কোথায়, কবে ও কী দামে সরকার ধান কিনবে। এতে কৃষকেরা সহজেই সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারবেন।

খাদ্য আমদানির প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশে ধানের উৎপাদন বাড়লেও জনসংখ্যার তুলনায় চাহিদা বেশি। এ ছাড়া হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে প্রতিবছর কিছু ফসলের ক্ষতি হয়। তাই খাদ্য আমদানির প্রয়োজন হয়। এই ক্ষতি কমাতে আগাম পাকে, এমন ধানের জাত উদ্ভাবন ও নতুন ধরনের হারভেস্টিং প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে সরকার।

কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার ইতিমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করেছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে সেই অর্থ পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খাল পুনঃখননের মাধ্যমে সেচব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মৎস্য খাত নিয়ে মন্ত্রী বলেন, জাটকা সংরক্ষণ মৌসুমে জেলেদের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে, যাতে দাদন নির্ভরতা কমে এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়ে। সমুদ্রে লাইসেন্সবিহীন মাছ ধরার অভিযোগ নিয়েও সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।

সভায় মৎস্য, প্রাণী ও কৃষি বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মতবিনিময় সভা আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা দিয়েছে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন।