বিকেলের নরম আলো জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকছে। চার বছরের শিশু রুদ্র ও তার বোন মীনাক্ষী (ছদ্মনাম) নতুন কেনা লাল রঙের একটি প্লাস্টিকের গাড়ি নিয়ে মেঝেতে বসে খেলছে। মা–বাবা তখন নিজেদের কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ খেলতে খেলতে গাড়িটির একটি ছোট চাকা খুলে গেল। শিশুটি স্বভাবসুলভ কৌতূহলে সেটি মুখে দিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘরের আনন্দ বদলে গেল আতঙ্কে—শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সবাই ছুটল হাসপাতালে।

এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। শিশু বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতায় প্রায়ই দেখা যায় খেলনার ছোট অংশ গিলে ফেলা, ধারালো প্রান্তে আঘাত পাওয়া কিংবা নিম্নমানের রং ও রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসার ঘটনা। অথচ খেলনা কেনার সময় আমরা সাধারণত রং, আকৃতি বা দাম দেখি; খুব কমই ভাবি—এটি নিরাপদ কি না।

.

গত ২৭ জুন মুক্তকণ্ঠয় প্রকাশিত ‘মানহীন শিশুখেলনা উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রি করা যাবে না’ শিরোনামে চোখ আটকে গেল। বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো শিশুদের খেলনার জন্য বাধ্যতামূলক বাংলাদেশ মান (বিডিএস) নির্ধারণ করেছে।

এখন থেকে নির্ধারিত নিরাপত্তা মান পূরণ ছাড়া কোনো খেলনা উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করা যাবে না। শিশু নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এটি নিঃসন্দেহে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ। সংবাদটি হয়তো অনেকের চোখে পড়েনি বা বড় আলোচনায় খুব বেশি আসেনি, কিন্তু শিশু সুরক্ষার দিক থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

.

শিশুরা খেলতে খেলতেই পৃথিবীকে চেনে—এটাই সহজাত প্রবৃত্তি। খেলাধুলার মাধ্যমে তারা অতিরিক্ত প্রাণশক্তি ব্যয় করে এবং ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। খেলনা তাদের কল্পনা, ভাষা ও সামাজিক বিকাশের প্রথম মাধ্যম। কিন্তু সেই খেলনাই যদি বিষাক্ত রং, সিসা বা সহজে খুলে যাওয়া ক্ষুদ্র অংশের কারণে ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে আনন্দ মুহূর্তেই ভয়াবহ বিপদে পরিণত হতে পারে।

.

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিভিন্ন সময় শিশুদের খেলনায় সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ভারী ধাতুর উপস্থিতির খবর পাওয়া যায়। এসব উপাদান দীর্ঘ মেয়াদে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই খেলনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু শিল্পনীতির বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও শিশুর অধিকার রক্ষারও বিষয়, বিশেষ করে সুস্থ, সবল ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে।

.

চোখ বন্ধ করলে এখনো মনে পড়ে, আমাদের শৈশব মানেই ছিল উঠানের মাটি, নদীর পাড় আর গ্রামের মেলা। কোনো চকচকে দোকান নয়; বরং কাঠ, বাঁশ, মাটি ও কাপড়ে তৈরি খেলনার মধ্যেই ছিল সেই শৈশবের প্রকৃত আনন্দ।

আমার মতো আশি ও নব্বইয়ের দশকে শৈশব পেরিয়ে আসা সবাই জানে—একটি কাঠের ঘোড়া, বাঁশের বাঁশি কিংবা মাটির পুতুল শুধু খেলনা ছিল না; এগুলো ছিল পরিবারের ভালোবাসা, গ্রামের কারিগরের হাতের ছোঁয়া এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কের জীবন্ত প্রতীকের মতো। বর্ষার কাগজের নৌকা, লাটিম ঘোরানো কিংবা ঘুড়ি ওড়ানো ছিল কল্পনা ও আনন্দের এক সহজ জগৎ। এভাবেই পাড়া-মহল্লায় সারা দিন কেটে যেত।

.

প্রতিবেশী বন্ধুর বাসায় ঝোল ঝোল করে রান্না করা ইলিশ মাছ আর বেগুনভাজা দিয়ে ভাত খেয়ে আবার ফিরে যেতাম খেলার জগতে। কখনো মনে হয়নি, দূরে আছি; কারণ, বন্ধুর বাড়িটিও নিজের বাড়ির মতোই মনে হতো। এসবই ছিল সামাজিকীকরণ এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার এক অনানুষ্ঠানিক শিশুশিক্ষা।

.

মোবাইল স্ক্রিনে কাটানো সময় বাদ দিলে আজ সেই জায়গা অনেকটাই দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিক ও ইলেকট্রনিক খেলনা। খেলনা এখন প্যাকেটবন্দী, নির্দেশনাসহ; কিন্তু সেখানে নেই সেই গল্প, নেই হাতের উষ্ণতা, নেই শিকড়ের গন্ধ।

প্রশ্নটি তাই শুধু নস্টালজিয়ার নয়; এটি ভবিষ্যতের শৈশব কেমন হবে, সেই প্রশ্নও। ঝুঁকিপূর্ণ ও বাণিজ্যনির্ভর শৈশব, নাকি নিরাপদ, মানবিক এবং প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ত শৈশব?

লোকখেলনার কথা তাই নতুন করে ভাবতে হয়। মাটি, কাঠ, বাঁশ ও কাপড়ের সহজ উপকরণে ফিরে যাওয়া মানে শুধু অতীতে ফেরা নয়; বরং শৈশবকে আবার নিরাপদ ও প্রাণবন্ত করে তোলা।
এটি সত্য যে সময় বদলেছে, কিন্তু নিরাপদ ও মানবিক শৈশবের প্রয়োজন বদলায়নি।

.

প্রায় ১০ বছর আগে জাপানের কোবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উন্নয়ন অর্থনীতি ও পলিসি স্টাডিজ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরেছি। ফেরার সময় আমার ছেলে তার খেলনাগুলো সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। আশ্চর্যের বিষয়, এত বছর পরও সেসব খেলনার রং, কারুকাজ, কার্যকারিতা—কোনোটিই নষ্ট হয়নি।

.

তাই আমার মনে হয়, খেলনার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে জাপান একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। সেখানে বহু বছর ধরে Japan Toy Safety Standard (ST Standard) অনুসরণ করা হচ্ছে। খেলনার যান্ত্রিক নিরাপত্তা, রাসায়নিক উপাদান, দাহ্যতা এবং বয়সভিত্তিক ব্যবহারযোগ্যতা পরীক্ষা করে খেলনায় ‘ST Mark’ দেওয়া হয়, যা অভিভাবকদের কাছে আস্থার প্রতীক।

জাপানের সাফল্যের মূল শক্তি শুধু মান নির্ধারণ নয়; তারা খেলনাশিল্পকে গবেষণা, নকশা, উদ্ভাবন এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশও যদি সেই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে দেশীয় খেলনা শিল্প নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে সক্ষম হবে।

.

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার স্বার্থে এখন সময় এসেছে খেলনা-সংক্রান্ত কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। খেলনা কখনো শুধু খেলনা নয়। এটি শিশুর স্বপ্ন, শেখার প্রথম মাধ্যম এবং ভবিষ্যৎ গঠনের নীরব সঙ্গী।
তাই প্রয়োজন রাষ্ট্র, উদ্যোক্তা, গবেষক ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, যাতে বাংলাদেশের শিশুরা নিরাপদ খেলনার সঙ্গে বড় হয়ে ওঠে এবং সেই খেলনার মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে আমাদের টেকসই ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

* লেখক: অধ্যাপক, ফোকলোর অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
E-mail: mamun@ru.ac.bd