আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন করে তিন বছর মেয়াদি ঋণের আবেদন করেছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে ৯ জুন আইএমএফকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রীর চিঠিতে ঋণের পরিমাণ উল্লেখ নেই। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য পরিমাণ হতে পারে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ।

কোনো দেশ অর্থনৈতিকভাবে চাপে পড়লে আইএমএফের কাছে ঋণের জন্য যায়। সংস্থাটির ঋণের সুদহার কম। তবে শর্ত কঠিন। আইএমএফের শর্ত মেনে সরকারকে নানা সংস্কার করতে হয়। সংস্কারে ব্যর্থ হলে ঋণের কিস্তি দেওয়া বন্ধ করে দেয় আইএমএফ।

দেশে আইএমএফের শর্তের কারণেই জ্বালানি তেলে সরকারি ভর্তুকি প্রায় তুলে নিয়ে মাসে মাসে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি চালু হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের পতনের পর ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের ঋণের চুক্তি করেছিল। ২০২৫ সালের জুনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই ঋণের আকার বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। অনুমোদিত ওই ঋণ কর্মসূচির আওতায় পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ মোট ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে ষষ্ঠ কিস্তির অর্থছাড় নিয়ে প্রায় এক বছর ধরে আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। কারণ, শর্ত পূরণ হয়নি।

.
অর্থমন্ত্রীর চিঠিতে ঋণের পরিমাণ উল্লেখ নেই। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য পরিমাণ হতে পারে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি ডলার। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আইএমএফের নির্বাহী পর্ষদ।
.

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে গত বছরের অক্টোবরে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে অংশ বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ কিস্তি ছাড়ে আইএমএফকে রাজি করাতে পারেননি।

নতুন বিএনপি সরকার এমন একটা সময়ে আইএমএফের কাছে নতুন ঋণের জন্য গেল, যখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত মোটামুটি ভালো। কিন্তু তা বেড়েছে মূলত আমদানি কমে যাওয়ায়। আমদানি বাড়লে মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। অন্যদিকে বড় বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের বাড়তি টাকাও দরকার।

আইএমএফকে দেওয়া চিঠিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগের কর্মসূচি গ্রহণের সময়কার অর্থনৈতিক ও নীতিগত বাস্তবতা এখন আর নেই। দেশীয় রাজনৈতিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন চ্যালেঞ্জের কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে সরকার সংস্কার কর্মসূচি থেকে সরে আসতে চায় না; বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়ন করতে চায়।

এ আবেদনের বিষয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর কাছে জানতে চাইলে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য আইএমএফকে চিঠি পাঠানো হয়েছে এবং আগামী মাসে সংস্থাটির একটি দল ঢাকা সফরে আসবে।

.

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিরূপ

দেশের রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি ভালো নয়। রাজস্ব-জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) হার ৮ শতাংশের ঘরে। চলতি অর্থবছর শেষে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের নিম্ন রাজস্ব-জিডিপি অনুপাতকে বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের সময় দেশের ঘাড়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। গত মাসে প্রকাশিত ডেট (ঋণ) বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশি-বিদেশি মোট ঋণের স্থিতি বেড়ে দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় দেড় বছরের কম সময়ে সরকারি ঋণ বেড়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এদিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে গেলে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ আর পাওয়া যাবে না।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে জানান, এ বছরের মার্চ শেষে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ৭৮ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৬১ দশমিক ৯৭ শতাংশ স্বল্পসুদে বা রেয়াতি ঋণ। তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোয় সরকারের আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়বে।

.

এদিকে ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাতে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যার মধ্যে সুদ বাবদ বরাদ্দ ৪৬ হাজার কোটি টাকার সমান বৈদেশিক মুদ্রা।

সরকারের মোট ঋণের ৫৭ শতাংশই দেশি ঋণ। অর্থাৎ সরকার ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ব্যাপক ঋণ নিচ্ছে, যখন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৫ শতাংশের নিচে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে। উচ্চ সুদহার, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, বিনিয়োগে অনীহা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তার কারণে ঋণ প্রবৃদ্ধি দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমুখী রয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান কম তৈরি হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে (১১ মাস) রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ কম। একমাত্র ইতিবাচক সূচক প্রবাসী আয়। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত দেশে ৩৪ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার প্রবাসী আয় এসেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময় থেকে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি।

নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ মোকাবিলায় অর্থায়ন পেতে চায়, অন্যদিকে আগের কর্মসূচিতে আটকে থাকা সংস্কারগুলো নতুন সময়সূচি ও বাস্তবতার আলোকে পুনর্গঠনের সুযোগ খুঁজছে।

.
আগের কর্মসূচি কেন থেমে গেল, তার একটি ব্যবচ্ছেদ থাকা প্রয়োজন। জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, রাজস্ব খাতের সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং ব্যাংক খাত সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়াই হয়তো মূল বাধা ছিল।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন
.

আসছে আইএমএফের প্রাক্‌–মিশন

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, গত ২১ মে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে তিন বছর মেয়াদি নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর ৩ জুন আইএমএফের বাংলাদেশ–বিষয়ক মিশনপ্রধান আইভো ক্রিজনার এক বিবৃতিতে বলেন, ২০২৩ সালে কর্মসূচি অনুমোদনের পর বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে গেছে। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, নিম্ন রাজস্ব আহরণ এবং নতুন সংস্কার উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্ট। ফলে বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও নতুন সরকারের অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করে একটি নতুন কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ওই বিবৃতির ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই আগামী মাসের মাঝামাঝি আইএমএফের একটি প্রাক্‌–মিশন ঢাকা সফরে আসছে বলে জানান অর্থ বিভাগের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা। প্রায় এক সপ্তাহ অবস্থান করে দলটি সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করবে। ওই সফরে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নীতিগত অগ্রাধিকার, সংস্কার কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মূল্যায়ন করা হবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার নিয়ে আলোচনা হবে।

.
সরকার ইতিমধ্যে আইএমএফকে জানিয়েছে, সংস্কার কর্মসূচি ধাপে ধাপে এবং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়।
.

সংস্কার প্রশ্ন ও জনগণের ওপর চাপ

নতুন কর্মসূচির আলোচনায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ভ্যাট সংস্কার, করছাড় কমানো এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়। একই সঙ্গে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা, ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং খেলাপি ঋণ কমানোর অগ্রগতিও খতিয়ে দেখবে আইএমএফ। আগামী মাসে ঢাকায় আসা প্রাক্‌–মিশন এসব বিষয়ে সরকারের প্রস্তুতি ও অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে।

তবে নতুন ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হলে এর সঙ্গে যুক্ত কিছু সংস্কারের চাপ সাধারণ মানুষের ওপরও পড়তে পারে। কর ও ভ্যাটের আওতা বৃদ্ধি, করছাড় কমানো, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হ্রাস এবং আরও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর ফলে পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে আইএমএফকে জানিয়েছে, সংস্কার কর্মসূচি ধাপে ধাপে এবং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবায়ন করা হবে, যাতে জনগণের ওপর হঠাৎ অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়।

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আগের কর্মসূচি কেন থেমে গেল, তার একটি ব্যবচ্ছেদ থাকা প্রয়োজন। জ্বালানি মূল্যের স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়, রাজস্ব খাতের সংস্কার, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার এবং ব্যাংক খাত সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়াই হয়তো মূল বাধা ছিল।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, নতুন কর্মসূচিতেও পুরোনো বিষয়গুলো ঘুরেফিরে আসবে। বাংলাদেশকে রাজস্ব, ব্যাংক খাত, বিনিময় হার ও জ্বালানি মূল্য নির্ধারণের মতো কঠিন সংস্কার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। আইএমএফ হয়তো সময় দিতে পারে, কিন্তু সংস্কার এড়ানোর সুযোগ খুব বেশি নেই।