পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলার বান্দাপ্রতি ভালোবাসার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তবে কোনো বান্দা এই ভালোবাসা পেয়েছেন কি না, তা বোঝার কয়েকটি নির্দিষ্ট নিদর্শন রয়েছে।

যাঁদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা যায়, তাঁরাই সত্যিই পরম করুণাময়ের প্রিয়। এখানে আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার মূল তিনটি আলামত তুলে ধরা হলো।

আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাঁর জন্য পৃথিবীতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা সৃষ্টি করেন। নেককার বান্দাদের প্রতি অন্তরে আল্লাহ বিশেষ স্থান করে দেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে এবং নেক আমল করে, পরম করুণাময় আল্লাহ তাদের জন্য ভালোবাসা নির্ধারণ করে দেবেন।’ (সুরা মারইয়াম, আয়াত: ৯৬)

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আব্দুর রহমান সাদি (রহ.) বলেন, যাদের মধ্যে ইমান ও নেক আমলের সমন্বয় ঘটে, আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীবাসীর অন্তরে তাদের প্রতি মমতা তৈরি করে দেন। এর ফলে সমাজে তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থা বাড়ে, যা ইসলামের প্রচার ও প্রসারে সহায়ক হয়। (তাফসিরে সাদি, সংশ্লিষ্ট আয়াতের তাফসির)

হাদিসে বলা হয়েছে, বান্দা যখন নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টির সন্ধানে লিপ্ত থাকে, তখন আল্লাহ তখন ফেরেশতা জিবরাইলকে ডেকে তাঁর প্রতি সন্তুষ্টির কথা জানান। এরপর আকাশ ও পৃথিবীবাসীর মধ্যে তাঁর জন্য রহমত ও কবুলিয়ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৪০১)

পার্থিব ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। কারণ, প্রাচুর্য পেয়ে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।

আবু হাজেম সালামা ইবনে দিনার (রহ.)

আল্লাহ যে বান্দাকে ভালোবাসেন, তাঁকে দুনিয়াবি মোহ ও ফেতনা থেকে নিজ গুণে মুক্ত রাখেন। রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি তাকে দুনিয়া (অসংযত ভোগবিলাস) থেকে বাঁচিয়ে রাখেন; যেমন তোমরা তোমাদের রোগীকে পানি থেকে বাঁচিয়ে রাখো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০৩৬)

আমাদের পূর্বসূরিরা এই সত্য উপলব্ধি করেছিলেন। আবু হাজেম সালামা ইবনে দিনার (রহ.) বলতেন, পার্থিব ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। কারণ, প্রাচুর্য পেয়ে অনেক জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। (কাইফা তানালু মুহাব্বাতুল্লাহ, পৃষ্ঠা: ১২)

দুনিয়ার মোহে অন্ধ ব্যক্তি কখনো জ্ঞান-বিজ্ঞান বা ধর্মের কঠিন পথে সাধনা করতে পারে না। তাই আল্লাহ যাকে বরকত দিতে চান, তাকে অহেতুক বিলাসিতা থেকে রক্ষা করেন।

মসিবত যত বড় হবে, প্রতিদানও তত বড় হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষা করেন। যে এতে সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন।

সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০৩১

আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের আরেকটি আলামত হলো পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়া। বিপদ-আপদ কেবল কষ্ট নয়, বরং মুমিনের মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘মসিবত যত বড় হবে, প্রতিদানও তত বড় হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন, তখন তাদের পরীক্ষা করেন। যে এতে সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০৩১)

মানুষের জীবনে নানা ভুল ও পাপ হয়ে থাকে। আল্লাহ যখন কোনো বান্দার মঙ্গল চান, তখন দুনিয়াতেই তাকে বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে পবিত্র হওয়ার সুযোগ দেন। অন্য হাদিসে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ যখন তাঁর বান্দার মঙ্গল চান, তখন দুনিয়ায় তাকে তাড়াতাড়ি বিপদ-আপদের সম্মুখীন করেন (যাতে আখেরাতে সে পাপমুক্ত থাকে)।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৬)

সুতরাং বিপদে হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করাই প্রকৃত মুমিনের পরিচয়।

  • মাহমুদ হাসান ফাহিম : শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদরাসা কমপ্লেক্স, টঙ্গী