অফিসের মিটিংয়ে বস হঠাৎ আপনার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই রিপোর্ট কে বানিয়েছে? এত গাফিলতি কীভাবে হয়?’ সবাই চেয়ে আছে। আপনি জানেন ভুল আপনার নয়, কিন্তু কীভাবে বলবেন?

মনে তখন দ্বন্দ্ব। একদিকে চুপ থাকার পরামর্শ, কারণ বললে ঝামেলা বাড়বে। অন্যদিকে, চুপ থাকলে সবাই দোষী ভাববে। এই দ্বিধা শুধু অফিসেই নয়, পরিবার থেকে সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের তাড়া করে।

যারা সব সময় অন্যায়ের সামনে চুপ থাকেন, তাঁরা ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার কথা বলার কোনো মূল্য নেই। এটি দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতার কারণ হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সব সময় অন্যায়ের সামনে চুপ থাকেন, তাঁরা ধীরে ধীরে ‘লার্নড হেল্পলেসনেস’-এ আক্রান্ত হন। এটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তার কথা বলার কোনো মূল্য নেই। এটি দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতার কারণ হতে পারে।

অন্যদিকে, যারা সব পরিস্থিতিতে সব কথা বলে ফেলেন, তাঁরাও মানসিক চাপ ও সম্পর্কের টানাপোড়েনে ভুগতে থাকেন। (সেগলিমান, এম. ই. পি., ১৯৭৫, হেল্পলেসনেস: অন ডিপ্রেশন, ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডেথ, ফ্রিম্যান, সান ফ্রান্সিসকো)

পবিত্র কোরআন এই ভারসাম্য রক্ষার পথ দেখিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা সুরা নিসায় বলেন, ‘আল্লাহ মন্দ কথা প্রকাশ করা পছন্দ করেন না; তবে যার প্রতি জুলুম করা হয়েছে সে ছাড়া। আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৮)

এই আয়াতে জীবনযাপনের গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। প্রথমত, ‘হারাম’ না বলে ‘পছন্দ করেন না’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণভাবে কাউকে ছোট করা বা দোষ প্রকাশ করা আল্লাহর অপ্রিয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। এক বেদুইন মসজিদে প্রস্রাব করলে সাহাবিরা তাকে শাসন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নবীজি (সা.) তাদের থামিয়ে কাজ শেষে আলাদা করে বুঝিয়ে বললেন, সবার সামনে অপমান করলেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২০)

যে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে ভালো কথা বলুক অথবা চুপ থাকুক।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮

দ্বিতীয়ত, আপনার ওপর অন্যায় হলে কথা বলা অধিকার। মুসা (আ.) ফেরাউনের দরবারে সত্য বলেছিলেন জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে। ভয় বা পরিণাম না ভেবে জুলুম থামানোর দায়িত্ব থেকে কথা বলতে হয়।

তৃতীয়ত, আপনার কথা বা নীরবতা—সব তিনি শোনেন, নিয়ত জানেন। ইউসুফ (আ.) মিথ্যা অভিযোগে জেলে চুপ ছিলেন, কারণ জানতেন আল্লাহ দেখছেন। শেষে আল্লাহই নির্দোষিতা প্রকাশ করেছিলেন।

কখন চুপ থাকবেন: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে ভালো কথা বলুক অথবা চুপ থাকুক।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)

কথা বললে ফিতনা বাড়বে বা প্রতিশোধের স্পৃহা জাগলে চুপ থাকাই প্রজ্ঞা।

কখন কথা বলবেন: নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ অন্যায় দেখলে সে যেন হাত দিয়ে প্রতিরোধ করে। না পারলে মুখ দিয়ে...’ (ইমাম মুসলিম, সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৯)। সত্য চাপা পড়লে ক্ষতির আশঙ্কা বা সংশোধনের উদ্দেশ্যে কথা বলা দায়িত্ব।

কীভাবে বলবেন: লোকমান (আ.) ছেলেকে বলেছিলেন, ‘তোমার চলায় মধ্যপন্থা অবলম্বন করো এবং তোমার স্বর নিচু করো।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৯)

স্বর নিচু করা মানে কণ্ঠ সংযত রাখা। ক্রোধাকুল কণ্ঠ সত্য পৌঁছায় না, বরং দেয়াল তৈরি করে।

সঠিক সময়ে, সঠিক নিয়তে ও সঠিক ভাষায় কথা বলাটাই আসল শক্তি। আবার সঠিক মুহূর্তে চুপ থাকার সাহসটাও কম বড় নয়।

পরবর্তী দ্বন্দ্বে তিন প্রশ্ন করুন নিজেকে।

এক. এটি কি সত্যিকারের জুলুম, নাকি আমার অহংকারে আঘাত লেগেছে?

দুই. কথা বললে কি সমস্যার সমাধান হবে, নাকি বাড়বে?

তিন. আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বলছি, নাকি নিজেকে বড় দেখাতে?

সঠিক সময়ে, সঠিক নিয়তে ও সঠিক ভাষায় কথা বলাটাই আসল শক্তি। আবার সঠিক মুহূর্তে চুপ থাকার সাহসটাও কম বড় নয়। সত্য বলা কাপুরুষতা নয়, চুপ থাকা দুর্বলতা নয়।

[email protected]

  • মুহাম্মাদ মুহসিন মাশকুর: খণ্ডকালীন শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।