দেশের পণ্য পরিবহন, সরবরাহ, জোগানসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক (লজিস্টিকস) খরচ ২৫ শতাংশ কমাতে পারলে সার্বিক রপ্তানি ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া সম্ভব। বন্দরে পণ্যের কনটেইনার অবস্থানকাল এক দিন কমালে রপ্তানি ৭ শতাংশেরও বেশি বাড়বে। এছাড়া জাতীয় সড়কে পণ্য পরিবহনকারী গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটার নিশ্চিত করলে রপ্তানি প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হবে।

আজ শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে এক গোলটেবিল আলোচনার মূল প্রবন্ধে এ কথা বলেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। ‘বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের জন্য সমন্বিত বন্দর এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন’ শীর্ষক এই গোলটেবিল আয়োজন করে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই)।

প্রবন্ধ উপস্থাপনায় এম মাসরুর রিয়াজ রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনা, রপ্তানিতে পোশাকনির্ভরতা, দুর্বল লজিস্টিকস, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি দেশের রপ্তানি ও লজিস্টিকস খাতে প্রতিযোগী দেশ ভারত এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনাও করেন।

আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাকা চেম্বারের সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (বিআইএম) মহাপরিচালক মো. সলিম উল্লাহ।

প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মো.হাবিবুর রহমান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক মো. শামসুল হক, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফেসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান, শাহরিয়ার স্টিল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস কে মাসাদুল আলম, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা (পরিবহন) হুমায়ুন কবির ও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের পরিবহনবিশেষজ্ঞ নুসরাত নাহিদ বাবী।

ভিয়েতনাম এগিয়ে কেন

মূল প্রবন্ধে এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। যেখানে ভিয়েতনাম ৪৩তম এবং ভারত ৩৮তম। কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্সে চট্টগ্রাম বন্দর ভিয়েতনামের হাইফং বা ভারতের মুন্দ্রা ও জওহরলাল নেহরু বন্দরের তুলনায় প্রায় ২০০-২৫০ ধাপ পিছিয়ে।

তিনি ভিয়েতনামের উদাহরণ দিয়ে বলেন, কয়েক বছর আগে ভিয়েতনাম শুল্কব্যবস্থা সহজীকরণ, ঝুঁকিব্যবস্থাপনা, বহুমাত্রিক (সড়ক, রেল, নৌ ও বিমান) পরিবহনব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় সংস্কার করে। ফলে দেশটির রপ্তানি এখন প্রায় ৩৭০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি এখন ৫৫ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অথচ নব্বইয়ের দশকের শেষে দুই দেশের রপ্তানি প্রায় সমান ছিল।

এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ২০৩০ সালে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষ্য বর্তমান লজিস্টিকস ব্যবস্থায় অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য বন্দরগুলোর অবকাঠামো সংস্কার জরুরি।

‘লজিস্টিকস খরচ কিছু পণ্যের বিক্রির ৪৮ শতাংশ’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রাজীব এইচ চৌধুরী বলেন, লজিস্টিকস খাতে অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতায় রপ্তানি বাধাগ্রস্ত। দেশের লজিস্টিকস ব্যয় কিছু পণ্যের মোট বিক্রির ৪৮ শতাংশেরও বেশি, যা প্রতিবেশী দেশের তুলনায় অনেক বেশি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান বলেন, আশির দশকে বাংলাদেশ রেলওয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রায় ৪০ শতাংশ পণ্য পরিবহন করলেও এখন তা ২ শতাংশের নিচে নেমেছে। চট্টগ্রাম বন্দর ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে রেল ও নৌপথের সঙ্গে সংযুক্ত না করলে কেবল বন্দর সক্ষমতা বাড়ালে লাভ হবে না।

এডিবির জ্যেষ্ঠ প্রকল্প কর্মকর্তা (পরিবহন) হুমায়ুন কবির বলেন, বর্তমান কাঠামোয় বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা ও চুক্তিগত স্বচ্ছতার ঘাটতিতে বেসরকারি খাত আকৃষ্ট হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও বিনিয়োগে তাদের অনীহা তৈরি হচ্ছে।