ঘুম মানুষের জীবনের একটি অপরিহার্য নেয়ামত। ইসলাম এই ঘুমকে কয়েকটি সহজ আমলের মাধ্যমে ইবাদতে রূপান্তরিত করেছে। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ঘুমানোর আগে অজু করা।
এতে শুধু শারীরিক পরিচ্ছন্নতা ও প্রশান্তি নয়, বরং অসংখ্য ফজিলত ও আধ্যাত্মিক উপকারও জড়িত।
রাসুল (সা.) ঘুমানোর আগে অজু করার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি নিজে এই আমল অনুসরণ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তুমি যখন ঘুমাতে যাবে, তখন নামাজের মতো করে ওজু করবে এবং ডানপাশে কাত হয়ে শুয়ে পড়বে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১১)
অজু অবস্থায় ঘুমলে শরীরের পবিত্রতার সাথে আত্মাও প্রশান্ত থাকে।
ঘুমানোর আগে অজু করার একটি বড় ফজিলত হলো ফেরেশতাদের সঙ্গ লাভ। নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র (অজু) অবস্থায় ঘুমায়, তার সঙ্গে একজন ফেরেশতা রাতভর অবস্থান করেন এবং সে জাগ্রত হলে তার জন্য এই দোয়া করেন, ‘হে আল্লাহ! আপনার এই বান্দাকে ক্ষমা করে দিন, কারণ সে পবিত্র (অজু) অবস্থায় রাত কাটিয়েছে।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ১০৫১)
অন্য এক হাদিসে তিনি বলেন, ‘তোমরা তোমাদের দেহগুলো পবিত্র রাখো, আল্লাহ তোমাদের পবিত্র করবেন। যে বান্দা পবিত্র (অজু) অবস্থায় রাত কাটায়, বিছানায় তার সঙ্গে একজন ফেরেশতা অবস্থান করেন। সে রাতে যখনই পাশ ফিরে বা নড়াচড়া করে, তখনই সেই ফেরেশতা বলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনার এই বান্দাকে ক্ষমা করে দিন, কারণ সে পবিত্র অবস্থায় ঘুমিয়েছে।’ (সহিহ আত–তারগিব, হাদিস: ৫৯৯)
ফেরেশতাদের এই দোয়া লাভ একজন মুমিনের জন্য অপার সৌভাগ্যের বিষয়।
অজু অবস্থায় ঘুমালে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপত্তা পাওয়া যায়। অজু মানুষকে পবিত্র রাখে এবং শয়তান অপবিত্রতা ও অবহেলার সুযোগ নেয়। ফলে অজু করে ঘুমালে মানসিক প্রশান্তি আসে এবং দুঃস্বপ্ন থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাওয়া যায়।
অজু করে ঘুমানোর আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি মৃত্যুর প্রস্তুতির মতো। ইসলামে ঘুমকে ছোট মৃত্যু বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ মানুষের প্রাণ হরণ করেন তার মৃত্যুর সময়, আর যার এখনো মৃত্যু আসেনি, তার নিদ্রাকালে।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৪২)
রাসুল (সা.) ঘুম থেকে উঠে দোয়া পাঠ করতেন, ‘আলহামদুলিল্লাহিল্লাজি আহয়ানা বাদা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর।’ অর্থ: ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি মৃত্যুর পর আমাদের পুনরায় জীবন দান করেছেন এবং তাঁর কাছেই (সবাইকে) ফিরে যেতে হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩১২)
এখানে ‘আমাতানা’ (আমাদের মৃত্যু দিয়েছেন) শব্দের মাধ্যমে ঘুমকে মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। অজু অবস্থায় ঘুমালে একজন মুমিন যেন পবিত্র অবস্থায় আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে। যদি ঘুমের মধ্যে মৃত্যু আসে, তবে সে পবিত্র অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করবে, যা অসীম সৌভাগ্য।
অজু শরীরের জন্যও উপকারী। এটি ক্লান্তি দূর করে দেহমনে শান্তি ও সতেজতা আনে। শরীর পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন থাকে, ফলে ঘুম হয় আরামদায়ক। অনিদ্রা বা মানসিক অস্থিরতায় ভুগতে হলে এটি কার্যকর প্রতিকার।
ঘুমানোর আগে অজু করা সহজ কিন্তু বরকতময় সুন্নাহ। এটিকে অভ্যাস করলে প্রতিটি রাত ইবাদতের আলোয় উদ্ভাসিত হবে।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা






