ইসলামি রাষ্ট্রে অমুসলিম নাগরিকদের (জিম্মি) অধিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা আধুনিককালে বেশ আলোচিত হয়। এখানে তাদের জান-মাল ও সম্মানের সুরক্ষা শুধু রাজনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং ধর্মীয় ও আইনি বাধ্যবাধকতা।

আল্লাহ–তাআলা ও তাঁর রাসুল এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করেছেন। ইসলামি রাষ্ট্রে কোনো অমুসলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা বা তার সম্পদ লুণ্ঠন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মহানবী (সা.) এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমকে (মুআহিদ) হত্যা করবে, সে জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না; অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ চল্লিশ বছরের দূরত্বের পথ থেকেও পাওয়া যায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৬৬)

ফকিহরা এ বিষয়ে একমত যে, চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের জান ও মালের নিরাপত্তা একজন মুসলমানের জান ও মালের নিরাপত্তার মতোই সমান ও অলঙ্ঘনীয়।

তাদের সম্পদের নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাদের সম্পত্তিতে অন্যায় হস্তক্ষেপ বা জবরদস্তি ছিনিয়ে নেওয়া মুসলিমদের জন্য হারাম।

ফকিহরা এ বিষয়ে একমত যে, চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমের জান ও মালের নিরাপত্তা একজন মুসলমানের জান ও মালের নিরাপত্তার মতোই সমান ও অলঙ্ঘনীয়। (ইমাম কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, ৭/১১০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৯৮৬)

যদি কোনো মুসলিম ভুলবশত অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করে, তবে শরিয়ত অনুযায়ী তাকে পূর্ণ রক্তপণ দিতে হয়। চতুর্থ খলিফা আলি (রা.) এই নীতি জোরালোভাবে ব্যক্ত করেছেন।

তিনি বলেছিলেন, “তারা আমাদের নিরাপত্তা (জিম্মা) গ্রহণ করেছে কেবল এই উদ্দেশ্যে যে, তাদের জান ও মাল আমাদের জান ও মালের মতোই সুরক্ষিত থাকবে।” (ইমাম তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, ৯/১৮, মাকতাবাতু ইবনে তাইমিয়্যাহ, কায়রো: ১৯৯৪)

অমুসলিমদের সম্পত্তিতে আঘাত বা ব্যবসায় ক্ষতি করা ইসলামি আইন অনুমোদন করে না। তাদের অর্থনৈতিক লেনদেনের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। (ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, ১/১২৫, দারুল মারিফাহ, বৈরুত: ১৯৭৯)

তাদের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো কাজ যদি ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধও হয়, তবুও তাদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে বা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত না করে সে কাজ করার অনুমতি রয়েছে।

ইসলাম অমুসলিমদের পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা দেয়। তাদের উপাসনালয় ভাঙা বা ধর্মীয় আচারে বাধা দেওয়া অবৈধ। আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৫৬)

নাজরান চুক্তিতে মহানবী (সা.) লিখেছিলেন, তাদের গির্জা বা উপাসনালয় পরিবর্তন হবে না এবং ধর্মীয় প্রধানদের (পাদরি) পদ থেকে সরানো হবে না। (ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, ১/৭২, দারুল মারিফাহ, বৈরুত: ১৯৭৯)

ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ কাজ যেমন মদ্যপান বা শুকরের মাংস খাওয়া হলেও, তাদের নিজস্ব পরিমণ্ডলে বা জননিরাপত্তা না ব্যাহত করে করার অনুমতি আছে। ফকিহদের মতে, তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যে হস্তক্ষেপ জায়েজ নয়। (ইমাম কাসানি, বাদায়েউস সানায়ে, ৭/১১১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত: ১৯৮৬)

অমুসলিমরা বার্ধক্য, অসুস্থতা বা দারিদ্র্যে অক্ষম হলে রাষ্ট্র তাদের ভরণপোষণ করবে। প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) হিরাবাসীদের সঙ্গে চুক্তিতে লিখেছিলেন, অমুসলিম বৃদ্ধ, অক্ষম বা অভাবগ্রস্ত হলে বায়তুল মাল থেকে ভরণপোষণ দেওয়া হবে। (ইমাম আবু ইউসুফ, কিতাবুল খারাজ, ১/১৪৪, দারুল মারিফাহ, বৈরুত: ১৯৭৯)

“তোমার যৌবনে আমরা জিজিয়া (নিরাপত্তা কর) নিয়েছি, আর তোমার বার্ধক্যে তোমাকে অসহায় ছেড়ে দিচ্ছি—এটা হতে পারে না।”