অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এক কারখানায় সর্বোচ্চ পাঁচটি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সরকার এখন তা কমিয়ে তিনটিতে নামিয়ে এনেছে। এছাড়া শ্রমিকের সংজ্ঞায় পরিবর্তন এবং ভবিষ্য তহবিলের ক্ষেত্রে মালিকদের জটিলতা হ্রাস করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিলটি পাস হয়েছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ–২০২৫-এ কিছু পরিবর্তন এনে এই বিল পাস করা হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিলে সই করলে তা আইন হয়ে যাবে।
একাধিক শ্রমিকনেতা বলছেন, মালিকপক্ষ যেভাবে চাচ্ছিল, সেভাবেই শ্রম অধ্যাদেশটি সংশোধন করা হয়েছে। মালিক, শ্রমিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) সভায় এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। অন্যদিকে মালিকপক্ষের প্রতিনিধিরা বলেছেন, সংশোধনের পরও কিছু জায়গায় বিভ্রান্তি রয়ে গেছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। ভবিষ্যতে আবারও শ্রম আইন সংশোধন করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মালিকপক্ষ যেসব বিষয়ে আপত্তি করেছিল, সেগুলো সবই পরিবর্তন করেছে সরকার। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠন যেসব আপত্তি করেছিল, সেগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। তিন বছরের বেশি সময় ধরে টিসিসির সভার মাধ্যমে কী কী সংশোধন হবে, সেগুলো চূড়ান্ত করা হয়েছিল। তবে কোনো আলোচনা ছাড়াই রাতারাতি সেখানে পরিবর্তন আনা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইনানুগ প্রক্রিয়াকে অবজ্ঞা করা। আমরা এটি প্রত্যাখ্যান করছি।’
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার গত নভেম্বরে শ্রম আইন (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করে। তার আগে ২৩ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই আইন সংশোধনের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়। এতে ‘মহিলা’ শব্দের পরিবর্তে ‘নারী’ শব্দ প্রতিস্থাপন, ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান, তিন বছর অন্তর মজুরি বোর্ড গঠন, প্রতিষ্ঠানে ১০০ জন শ্রমিক থাকলে ভবিষ্য তহবিল বাধ্যতামূলক, মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন, বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ১৩ দিন করাসহ বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়। এসব বিষয় পাস হওয়া বিলে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশে কোনো একটি প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানপুঞ্জে শ্রমিক বা কর্মকর্তাদের পাঁচটির বেশি ট্রেড ইউনিয়ন করা যেত না। পাস হওয়া বিলে সুযোগটি কমিয়ে তিনটি করা হয়েছে। আগেও সর্বোচ্চ তিনটি ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ ছিল। একটি প্রতিষ্ঠানে একাধিক ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে গোপন ব্যালটে ভোটের মাধ্যমে যৌথ দর–কষাকষিতে প্রতিনিধি (সিবিএ) নির্বাচন করতে হবে। আর যদি একটি ট্রেড ইউনিয়ন থাকে, তাহলে সেটি সিবিএ হিসেবে গণ্য হবে।
এ ছাড়া অধ্যাদেশে শ্রমিকের সংজ্ঞার মধ্যে কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের কথাও উল্লেখ ছিল। তবে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলে শ্রমিকের সংজ্ঞা থেকে কর্মকর্তা ও কর্মচারী শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
পাস হওয়া বিলে ভবিষ্য তহবিল বিষয়েও সংশোধন এনেছে সরকার। অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, যেসব প্রতিষ্ঠানে ন্যূনতম ১০০ স্থায়ী শ্রমিক থাকবেন, সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে ভবিষ্য তহবিল করতে হবে। তবে যেসব কর্মী লিখিতভাবে আবেদন করবেন, তাঁদের জন্য জাতীয় পেনশন স্কিম ‘প্রগতি’ চালুর উদ্যোগ নিতে হবে মালিকপক্ষকে। তবে পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, দুই–তৃতীয়াংশ কর্মী প্রগতি স্কিমে যুক্ত হওয়ার আবেদন করলে ভবিষ্য তহবিল করা থেকে অব্যাহতি পাবে প্রতিষ্ঠান। উভয় ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ চাঁদা মালিকপক্ষ ও বাকি চাঁদা শ্রমিক দেবেন।
নিট পোশাকশিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘শ্রম আইনে কী পরিবর্তন হবে, তা নিয়ে টিসিসির সভায় ঐকমত্য হওয়ার কথা। তবে সেটিকে এড়িয়ে খসড়ায় বেশ কিছু সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। আমরা বর্তমান সরকারকে টিসিসির সভায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংশোধন করার অনুরোধ করেছিলাম। যদিও সব কটির সংশোধন হয়নি। এখনো কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। শ্রম বিধিমালায় সেগুলো পরিষ্কার করতে হবে। ভবিষ্যতে আবার আইন সংশোধন হলে অস্পষ্টতা দূর করতে হবে।’
টিসিসি ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা না করেই অধ্যাদেশে সংশোধন এনেছে সরকার। এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৪৪ ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জাতীয় সংসদে বিলটি নিয়ে বিরোধী দল এক মিনিটও আলোচনা করেনি, এমনটি উল্লেখ করে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শ্রমিকনেতা বাবুল আখতার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শ্রম আইনের সংশোধনের পর সেটি বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। না হলে শ্রমিকেরা কোনো সুফল পাবেন না।






