সচিবালয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অফিসের জন্য জায়গা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১ নম্বর ভবন ভেঙে ২১ তলা উঁচু নতুন ভবন তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে ২ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুট স্থান সংকুলিত হবে, প্রতি বর্গমিটারে খরচ ৫২ হাজার ৭০৪ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কমিশনের সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি সরকারের প্রথম জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা হচ্ছে এ মাসের ৬ তারিখ সোমবার। সেখানে এ প্রকল্পসহ মোট ১৭টি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উত্থাপিত হবে। ভবনটির নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ২০২৯ সালের জুন মাস, মোট ব্যয় ৬৪৯ কোটি টাকা।

স্থাপত্যবিশেষজ্ঞরা এ খরচকে অত্যধিক ও অপচয়মূলক বলে সমালোচনা করছেন। সচিবালয়ে ইতিমধ্যে অনেক ভবন থাকায় আশপাশের রাস্তায় গাড়ি পার্ক করতে হয়। তাঁরা মনে করেন, নতুন ভবনের আগে পার্কিংয়ের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। স্থপতি ইকবাল হাবিব মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সচিবালয়ের চারপাশের রাস্তায় গাড়ি পার্ক করা হচ্ছে। তাই ভবন নির্মাণ না করে বরং বিদ্যমানগুলো ভাঙা উচিত। মাস্টারপ্ল্যান ছাড়া এমন অ্যাডহক (সাময়িক) ভিত্তিতে ভবন নির্মাণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় থেকে বের হয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।”

প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সচিবালয়ে বর্তমানে ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৭২ বর্গফুট অফিস স্পেস রয়েছে, কিন্তু অতিরিক্ত চাহিদা আরও ৬ লাখ ৮০ হাজার বর্গফুটের। নতুন ভবন তৈরি হলে চাহিদার প্রায় ৪২ শতাংশ পূরণ হবে। এতে সচিবালয়ের বাইরে অবস্থিত বিভিন্ন অফিসকে স্থান দেওয়া হবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম শাকিল আখতার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সচিবালয়ের ভবনগুলোর পাকিস্তান আমলের। তিন-চারটি ভবনের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে এগুলো ধসে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই নতুন ভবন করা হচ্ছে।’ পরবর্তী সময়ে আরও দুটি ভবন করলে পুরোনো সব ভবন বাদ দেওয়া যাবে বলেন তিনি। পার্কিং নিয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, নতুন ভবনে প্রায় ২০০ গাড়ি পার্ক করা যাবে। এখনকার নতুন ভবনটিতেও পার্কিং আছে।

অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

২১ তলা ভবন ও ৪ তলা বেজমেন্টসহ মোট ২৫ তলার এ নির্মাণে ৩৬১ কোটি টাকা ব্যয় হবে, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি বর্গমিটারে ৫২ হাজার ৭০৪ টাকা খরচ। স্থাপত্য কৌশলীরা এর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সরকারি হারের তুলনায় এটি বেশি বলছেন তাঁরা। স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ‘এটা অনেক উচ্চমূল্য ও অপচয়।’

ভবনে ২৪০০ টনের শীতাতপ ব্যবস্থায় ৬০ কোটি টাকা এবং ১৪টি লিফটে ৩১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা বরাদ্দ, অর্থাৎ প্রতি লিফটের গড় দাম ২ কোটি টাকার বেশি। লিফটের দাম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দেশের প্রাণ-আরএফএল কোম্পানির ‘প্রোপার্টি’ ব্র্যান্ডের লিফট ১৫ লাখ থেকে ১ কোটি টাকায় পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান প্রকৌশলী অনুপ কুমার বলেন, দেশের বিলাসবহুল হোটেল কিংবা শৌখিন বাসায় কোটি টাকার লিফট ব্যবহৃত হয়। এসব লিফটে বিভিন্ন ধরনের ডেকোরেশেন এবং ফিচার যুক্ত থাকে। ‘বিডি স্টল’-এর তথ্যমতে, এলজি-ফুজির ১৪ জনের লিফট সাড়ে ২২ লাখ টাকায় পাওয়া যায়।

* প্রতি লিফটের গড় দাম ২ কোটি টাকার বেশি।
* মোট ১৪টি লিফটের দাম ৩১ কোটি।
* এসির দাম ৬০ কোটি টাকা।
* ২.৮৭ লাখ বর্গফুটের ভবন।
* সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যাবে।

স্বয়ংক্রিয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় ১৩ কোটি ৩২ লাখ, সৌরবিদ্যুতে ৪ কোটি ৩৫ লাখ, ৫টি জেনারেটরে ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়। পানি বিশুদ্ধকরণে ৩ কোটি, আসবাবে ১৫ কোটি, ২টি বৈদেশিক প্রশিক্ষণে ৮০ লাখ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা রাখা হয়েছে। অতিরিক্ত ব্যয় স্বীকার করে সচিব এস এম শাকিল আখতার বলেন, ‘ব্যয় অনেক বেশি ধরা হয়েছে। ৪৫ শতাংশ ব্যয় ধরা হয়েছে বিভিন্ন বৈদ্যুতিক প্রযুক্তি স্থাপনে। যেমন ধরুন, মুখে বললে লিফট চলে আসবে।’ তবে প্রকল্পটি নিয়ে একনেকে আলোচনা হবে, মন্ত্রীরা না চাইলে হবে না।

ভবনে কী কী থাকবে

ভবনে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, অগ্নিনিরাপত্তা সহ আধুনিক সুবিধা যুক্ত হবে। ৬ যাত্রীবাহী, ৬টি ফায়ার লিফট, ২টি বেড লিফটসহ ১৪টি লিফট, ২৪০০ টন কেন্দ্রীয় শীতাতপ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ফায়ার ডিটেকশন, ২০টি মাল্টিমিডিয়া কনফারেন্স রুম এবং ৪টি বেজমেন্ট পার্কিং থাকবে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। তাদের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু নাসের চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের লিড সনদের আদলে সবুজ ভবন তৈরি হবে। অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্পসহ আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত থাকবে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় ও সবুজ স্পেস থাকবে। পার্কিং পর্যাপ্ত রাখা হয়েছে, গ্লাস ব্যবহার করে আলোর ব্যবস্থা এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

ভবনে ভূগর্ভস্থ জলাধারে দেড় লাখ গ্যালন পানি সংরক্ষণ, ১০ হাজার গ্যালন বৃষ্টির পানি, ২টি সাবস্টেশন, ৫টি জেনারেটর, ১২টি পাম্প মোটর, পার্কিংয়ে আধুনিক সফটওয়্যার এবং ৩২০ কিলোওয়াট সৌরবিদ্যুৎ থাকবে। প্রয়োজনীয় কম্পিউটার-যন্ত্রপাতি ও আসবাবের ব্যবস্থা রয়েছে।

১ নম্বর ভবনে আগে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অফিস ছিল, এখন নতুন ভবনে স্থানান্তরিত। কিছু অংশ এখনো রয়েছে। সচিবালয়ে মোট ১১টি ভবন রয়েছে। প্রকল্পটি গত বছরের আগস্টে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়, দুই মাসে যাচাই করে একনেকের জন্য প্রস্তুত।

একনেকে আরও প্রকল্প

প্রথম একনেক সভায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ১৮ প্রকল্প উত্থাপিত হবে। ১৭টির সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের একটি প্রকল্প। এর মধ্যে ৮টি নতুন, ১০টি সংশোধিত ও সময়বৃদ্ধির।