আল্লাহ মানুষকে অসংখ্য নেয়ামত দিয়েছেন, যার মধ্যে নিরাপত্তা বা আমান একটি অমূল্য সম্পদ। এর মূল্য তা হারিয়ে গেলে প্রকৃতভাবে বোঝা যায়।

ইসলাম শুধু পরকালের মুক্তির পথ দেখায় না, পৃথিবীতে মানুষের জান-মাল ও সম্মান রক্ষার উপরও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

শরয়তে নিরাপত্তার পরিভাষা ‘আমান’। এর অর্থ ভয়হীনতা, প্রশান্তি ও স্থিরতা। পারিভাষায় এটি ভবিষ্যতে অনিষ্টের আশঙ্কা না থাকা। ইমাম মানাভি (র.)-এর মতে, ‘আমান’ হলো অন্তরের সেই প্রশান্তি যা ভয়ের অনুপস্থিতিতে তৈরি হয়। (মানাভি, আত-তাওকিফ, পৃষ্ঠা: ৬৩)

আল্লাহ একটি ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত রাখেন যদিও তা অমুসলিম হয়, কিন্তু জুলুমবাজ রাষ্ট্রকে রক্ষা করেন না যদিও তা মুসলিমদের হয়।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.)

সামাজিক নিরাপত্তা রক্ষায় ইসলামের পাঁচটি মূল নীতি রয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা কুরাইশ বংশের প্রতি অনুগ্রহ উল্লেখ করে বলেছেন, ‘(আল্লাহ) যিনি তাদের ক্ষুধা থেকে বাঁচিয়ে অন্ন দিয়েছেন এবং ভয় থেকে বাঁচিয়ে নিরাপত্তা দিয়েছেন।’ (সুরা কুরাইশ, আয়াত: ৪)

অর্থাৎ, খাদ্য ও নিরাপত্তাই এক জাতির স্থায়িত্বের মূল ভিত্তি। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন,

‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরিবার-পরিজনসহ নিরাপদে সকালে ঘুম থেকে উঠল, যার শরীর সুস্থ এবং তার কাছে সেই দিনের খাবার আছে—তাকে যেন পুরো পৃথিবীটাই দিয়ে দেওয়া হলো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৬)

কোনো সমাজে নিরাপত্তা হারিয়ে গেলে বিশৃঙ্খলা, দারিদ্র্য ও অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়ে। কোরআনে এমন এক জনপদের উদাহরণ আছে, যারা নিরাপদ ছিল কিন্তু আল্লাহর নেয়ামতের অকৃতজ্ঞতা করায় দুর্ভিক্ষ ও ভয়ের মুখে পড়ে। (সুরা নাহল, আয়াত: ১১২)

নিরাপত্তা ছাড়া শিক্ষা, অর্থনীতি ও ইবাদত সব ব্যাহত হয়। ইসলামের পাঁচ মৌলিক উদ্দেশ্য—দীন, জীবন, মেধা, বংশ ও সম্পদ রক্ষা—কেবল নিরাপদ পরিবেশেই পালনযোগ্য।

এই নেয়ামত সংরক্ষণের জন্য ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের উপর জোর দিয়েছে:

১. আল্লাহর দীনকে আঁকড়ে ধরা: কোরআন ও সুন্নাহর বিধান মেনে চলাই নিরাপত্তার প্রথম শর্ত।

২. ফরজ ইবাদত পালন: যারা আল্লাহর উপর ইমান আনে এবং সৎকাজ করে, আল্লাহ তাদের পৃথিবীতে নিরাপত্তা ও খেলাফত দানের ওয়াদা করেছেন। (সুরা নুর, আয়াত: ৫৫)

৩. জুলুম পরিহার করা: শিরক সবচেয়ে বড় জুলুম। অন্যের অধিকার লঙ্ঘন বা জুলুম নিরাপত্তার পথে বড় বাধা।

৪. ঐক্যবদ্ধ থাকা: বিশৃঙ্খলা ও বিভেদ এড়িয়ে মুসলিম জামাত ও নেতৃত্বের অনুগত থাকা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি। (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৯)

৫. ফিতনা থেকে দূরে থাকা: সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতায় অহেতুক জড়িয়ে না পড়ে সংযম দেখানো মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেছেন, ‘আল্লাহ একটি ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠিত রাখেন যদিও তা অমুসলিম হয়, কিন্তু জুলুমবাজ রাষ্ট্রকে রক্ষা করেন না যদিও তা মুসলিমদের হয়।’ (ইবনে তাইমিয়া, মাজমু আল-ফাতাওয়া, ২৮/১৪৬)

অর্থাৎ ন্যায়বিচারই নিরাপত্তার মূল উৎস। ইমাম মাওয়ার্দি (রহ.) বলেছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে মানুষ নিশ্চিন্তে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে, যা সমাজকে সমৃদ্ধ করে।

নিরাপত্তা কোনো বিলাস নয়, এটি জীবনের অপরিহার্য অংশ। এটি শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, প্রত্যেক নাগরিকের নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য। কৃতজ্ঞতা ও সৎকর্মের মাধ্যমে এই নেয়ামত স্থায়ী হয়। অকৃতজ্ঞতা করলে সমাজ থেকে শান্তি ও স্থিতি চলে যায়।